॥ সাতক্ষীরা এক্সেপ্রেস খ্যাত মুস্তাফিজ ॥ পাঁচ এর পরে ছয় উইকেট নিয়ে বিশ্ব রেকর্ড করার বাঁধভাঙ্গা আনন্দে ভাসছে গোটা সাতক্ষীরাবাসী


595 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
॥ সাতক্ষীরা এক্সেপ্রেস খ্যাত মুস্তাফিজ ॥  পাঁচ এর পরে ছয় উইকেট নিয়ে বিশ্ব রেকর্ড  করার বাঁধভাঙ্গা আনন্দে ভাসছে গোটা সাতক্ষীরাবাসী
জুন ২৪, ২০১৫ কালিগঞ্জ খেলা
Print Friendly, PDF & Email

Mostafizur familyআব্দুর রহমান মিন্টু : তখনও মুস্তফিজের এক বল বাকি। তারা বলছিল মুস্তাফিজ হয়তো শেষ বলে উইকেট পেতে পারে। খেলা শুরু হওয়া মাত্র তাদের কথা সত্যিই রাখলো মুস্তাফিজ। নিয়ে নিলেন ভারতীয় খেলোয়াড় জাদেজার উইকেট।
সাতক্ষীরা শহরের একটি চায়ের দোকানে বসে বাংলাদেশ বনাম ভারতের মধ্যকার ক্রিকেট ম্যাচ দেখছিল আলি হোসেন, জুয়েল, সোনা, শহিদুল, হাবিবুল্লাহ কয়েকজন যুবকসহ মাঝ বয়সী কয়েকজন ক্রিকেট প্রেমী। বৃষ্টির বাধায় খেলা বন্ধ থাকায় তখন সেই ফাকে চলছিল এসব আলাপচারিতা।
তারা বলছিল, সাতক্ষীরা মুস্তফিজ এই কী খেলা দেখাচ্ছে! ভারতের বিপক্ষে প্রথম ওডিআই ম্যাচে ৫ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় মাচেও ৬ উইকেট নিয়ে সে যেন তার নাম ইতিহাসে স্বর্ণ অক্ষরে নিজের নাম লিখালেন সাতক্ষীরার কৃতি সস্তান মুস্তাফিজুর রহমান। সত্যি অসাধারণ বল করছে মুস্তফিজ। গত ম্যচে ধোনির ধাক্কার প্রতিশোধও নিলেন মুস্তফিজ।
এটি বলছি সাতক্ষীরা শহরের একটি চায়ের দোকানের খন্ডচিত্র মাত্র। গতকালের ম্যাচে মুস্তফিজের ছয় উইকেট পাওয়ায় আনন্দে ভাসছে গোটা সাতক্ষীরা বাসী। তার এই বিশ্ব রেকার্ড অভিভূত গোটা জেলাবাসী। খেলা শেষ হওয়ার আগেই অনেক জায়গায় আনন্দ মিছিল বের করেছে মুস্তফিজের ভক্তরা।
অভিষেকে ম্যাচে ৫ উইকেটে নেওয়ার পর পরেই ম্যাচে ছয় উইকেট নেওয়া দ্বিতীয় ও দশম বোলার এই সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস। প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে ৫০ রানে ৫ উইকেট নেবার পর এবার ৪৩ রানে ৬ উইকেট তুলে নেন এই পেসার।
তার এই বিশ্বরেকর্ড ঘিরে তার গ্রামের ক্রিকেটার বাড়ি সাতক্ষীরা কালিগঞ্জ উপজেলার তারালি ইউনিয়নের তেতুলিয়া গ্রামে বইছে বাঁধভাঙ্গা আনন্দ। তার বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছে নানা শ্রেণির মানুষ। তার বাবা মাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। মুস্তফিজের এই অর্জনে বিভিন্ন স্থানে চলছে মিষ্টি বিতরণ। বাঁহাতি পেসার, ইন সুয়িং এবং অফ কাটার দিয়ে ১ম ম্যাচের মত ২য় ওডিআই ম্যাচেও ভারতের বাঘা বাঘা নাজেহাল করে দিলেন এক তরুণ বোলার। তার এই বিশ্ব রেকর্ড (প্রথম ম্যাচে ৫ ও দ্বিতীয় ম্যাচে ৬ উইকেট) ঘিরে মুস্তফিজের গ্রাম সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়ায় শুরু হয়েছে যেন ঈদের আনন্দ। চলছে মিষ্টি বিতরণ। বাবা-মাকে অভিনন্দন জানাতে বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন নানা শ্রেণির মানুষ। বড় পর্দায় খেলা দেখতে তেঁতুলিয়া ফুটবল মাঠে প্যান্ডেল সাজানো হয়েছে। এ ছাড়া বাজারের দোকানে দোকানে খেলা দেখা নিয়ে সর্বত্র যেন চলছে উৎসব।
মোস্তফিজের ক্রিকেট গুরু আলতাফ হোসেন ও মুফাস্সিনুল ইসলাম তপু জানালে তাদের ছাত্রের এই অর্জনে তাদের অনুভূতির কথা, পাঁচউইকেট পাওয়া প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার মুস্তফিজ গত ম্যাচের পর এই ম্যাচেও ছয় উইকেট পেলে তার কোচ হিসেবে সত্যিই গর্বের বিষয়। তার এই অর্জনে কোচ হিসেবে গর্বিত এবং আনন্দিত তারা।
মুস্তফিজের বড় ভাই মোখলেসুর রহমান জানান, আমার ভাইয়ের এই অর্জনে আমরা খুবই খুশি। পরিবারের সবাই মিলে একসাথে তার খেলা দেখেছি তার সাথে কথা হয়েছে। আমরা সবাই আনন্দিত।
মুস্তফিজের বাবা আলহাজ্ব আবুল কাশেম গাজী জানালেন তার অনুভূতি, আমার ছেলের এই অর্জনে সত্যি আমি আনন্দিত যা ভাষায় প্রকাশ করার মত না।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে মুস্তফিজকে নিয়ে লিখছে নানা স্ট্যাটার্স। রোববার ভারতের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে শুরু থেকেই দুর্দান্ত বল করে আসছেন সাতক্ষীরার এই তরুণ। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই দেখার তার ভেলকি ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান অর্জনকারী ব্যাটিং রোহিতকে। এরপর একে একে তুলে নেন ধোনি, রায়না, অক্ষর, আশ্বিন এবং জাদেজাকে। এর আগে হারারেতে জিম্বাবুয়ের ব্রায়ান ভিটোরি বাংলাদেশের বিপক্ষেই অভিষেকে টানা দুই ম্যাচে পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন।
গ্রামের স্কুল ফাঁকি দিয়ে মোস্তাফিজের সাতক্ষীরা এক্য্রপ্রেস হয়ে উঠার গল্প :
—————————————————————–
সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার তারালি ইউনিয়নের তেতুলিয়া গ্রামের ছেলে মুস্তাফিজ। বরেয়া জিলানী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র সে। অনুর্দ্ধ ১৬, ১৮ ও ১৯ সাতক্ষীরা জেলা দলের খেলোয়াড় সে।
ব্যবসায়ী বাবা আলহাজ্ব আবুল কাশেম গাজী, মা মাহমুদা খাতুনের শেষ ছেলে হিসেবে তাদের কোল আলোকিত করে ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫ সালে জন্ম নেয় মুস্তাফিজ সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার তারালি ইউনিয়নের তেতুলিয়া গ্রামে। চার ভাই ও দুই বোনের সংসারে বেড়ে উঠা মুস্তাফিজের। তার বড় ভাই মাহফুজার রহমান মিঠু খুলনায় গ্রামীনফোনের টেরিটরি অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন, মেজ ও সেজ ভাই ঘের ব্যবসায়ী।
তার ক্রিকেট খেলায় আসার পিছনে সেজ ভাই মোখলেসুর রহমানের অবদান অনেক। ক্রিকেট পরিবারে জন্ম নেওয়া মোস্তাফিজকে তাকাতে হয়নি পিছনে ফিরে। তার বড় ভাই এক সময় ক্রিকেট খেরতেন, মেজ ভাইও কম যান না, আর সেজ ভাই এখনও ক্রিকেট খেলেন।
তার সেজ ভাই মোখলেছুর রহমান পল্টু জানালেন, তার উঠে আসার ইতিহাস, এই তো বছর পাঁচেক আগের কথা। সাতক্ষীরায় অনুর্ধ-১৪ ক্রিকেটে বাছাই পর্বে নজর কাড়ে সবার। তারপর তিন দিনের ছোট কোচ করানো হয়।
এরপর জেলা পর্যায়ে অনূর্দ্ধ-১৬ ক্রিকেট খেলায় সাতক্ষীরার হয়ে প্রথম মাঠে নেমেছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। পড়াশোনায় অতটা মন তাঁর কখনোই ছিল না। স্কুল ফাকি দিয়ে সে ক্রিকেট খেলতে যেত। বাসায় তো বলেই দিয়েছিলো, আমার দ্বারা ওসব হবে না। তোমরা আর জোর করো না। এরপর থেকে ক্রিকেটই তাঁর ধ্যানজ্ঞান। কালিগঞ্জের বরেয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নেট প্যাকটিস করতেন মুস্তাফিজ।
সাতক্ষীরা গণমুখী সংঘের কোর্চ আলতাফই প্রথম ধরতে পেরেছিলেন মুস্তাফিজের ভেতরের ‘ধারটা’। হিরে চিনে নিয়ে ঘষামাজার কাজটি তিনি শুরু করে দেন। জেলা পর্যায়ে এসে মুস্তাফিজকে আরও পরিণত করে তুলতে পরিশ্রম করেন সাতক্ষীরার জেলা কোচ মুফাসিনুল ইসলাম তপু। সকলের পরিশ্রমের প্রতিদান দিতে পেরেছেন মুস্তাফিজ। পাকিস্তারে বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্সই বলছে সে কথা। জেলা পর্যায়ের পর খুব বেশি দিন তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়নি। ডাক পেয়ে যান খুলনার বিভাগীয় দলে খেলার। বছর তিনেক আগে শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ফাস্ট বোলিং ক্যাম্পে ট্রায়াল দিতে এসে কোচরা আর ছাড়েননি এই প্রতিভাকে। নিয়মিতই অনূর্দ্ধ-১৯দলে খেলেছেন। বল করতেন জাতীয় দলের নেটেও। তবে সম্ভবনার দ্রুতি ছড়িয়েছেন গত বছর অনূর্দ্ধ-১৯ বিশ্বকাপে। তার ঝুলিতে ভরেছিলেন ৯ উইকেট। হয়েছিলেন দ্বিতীয় সবোচ্চ উইকেট শিকারী।
গত বছরের মে মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলেও স্থান পেয়েছিলেন মুস্তাফিজ। রীতিমতো চমক ছিলেন তিনি। মুস্তাফিজ প্রথম শ্রেণিতে খেলা শুরু করেন গত বছর এপ্রিলে। এই তো ছয় মাস আগে অভিষেক হয়েছে ঘরোযা এক দিনের ম্যাচে।
অভিষেক ম্যাচের চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্স তাই ‘নতুন দিনের বাংলাদেশ’ দলে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করবে বলেই পূর্বাভাস দিচ্ছে। সব মিলিয়ে বলা যায় নতুন বিস্ময় হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবির্ভুত হলেন এই তরুণ পেসার।
ছোট্ট এ ক্যারিয়ারে উজ্জ্বল পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে মুস্তাফিজ কতটা প্রতিভাধর। এখন সে প্রতিভার বিকাশ দেখার অপেক্ষায় বাংলাদেশ। ১৯বছর বয়সী সেই আশার গানই শোনালেন অভিষেকে। বাঁহাতি পেসারের যে ঘাটতি অনুভব করছিলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তা হয়তো পুরণ করতে সক্ষম হবে এই সাতক্ষীরা এক্সেপ্রেস। তাছাড়া মোস্তাফিজের স্বপ্ন পূরণে আনন্দে আত্মহারা হয়েছেন তার বাবা মাসহ গোটা জেলাবাসী।
মোস্তাফিজের সাথে ফোনে কথা বললে তিনি বলেন, দলে টিকে থাকতে হলে ভালো পারফমেন্স করতে হবে। না হলে দলে থাকা যাবে না। তিনি আরো বলেন, পরের ম্যাচ গুলোতে খেলার সুযোগ পেলে তিনি আরো ভালো কিছু দেবেন। তনি সাতক্ষীরা বাসিরকাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন।
মোস্তাফির রহমানের ক্রিকেট কোর্চ আলতাফ হোসেন বলেন, সৌম্য এবং মুস্তাফিজ দুজনই আমারই ছাত্র। দুজনই যে এক সাথে জাতীয় দলে খেলছে একজন বোলার আরেকজন ব্যাটসম্যান এর চেয়ে আনন্দের কিছু হতে পারে না।
মোস্তাফিজের আরেক কোচ মুফাস্সিনুল ইসলাম তপু, তার সেজ ভাই অনুর্দ্ধ ক্যাম্পে নিয়ে আছে প্রথমে তার বোলিং দেখি বুঝেছিলাম সে ভালো করবে। সে তো প্রথমে ব্যাটিং হতে চেয়েছিল আমি তাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম বোলিং হওয়ার জন্য। আমার ছাত্র জাতীয় দলে খেলছে এতে আমি গর্বিত। তাকে দলে টিকে থাকতে হলে
মোস্তাফিজের বাবা আলহাজ্ব আবুল কাশেম আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে যে জাতীয় টিমে খেলছে এটি গর্বের বিষয়। তিনি আরো বলেন, মোস্তাফিজ আজকে আমার একার ছেলে নয় গোটা জাতির হয়ে ২২ গজের রণাঙ্গনে লড়বে। তিনি সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন।