অপসারণ হতে পারেন দুই উপাচার্য : তদন্ত প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে


266 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
অপসারণ হতে পারেন দুই উপাচার্য : তদন্ত প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে
এপ্রিল ২৭, ২০১৬ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অন লাইন ডেস্ক :
সরকারি দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই উপাচার্যের অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) জমা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। সেখান থেকে গত সপ্তাহে প্রতিবেদন দুটি পাঠানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। অভিযুক্ত উপাচার্য কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ড. আবদুল হাকিম সরকার এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) মো. শাদাত উল্লাকে অচিরেই অপসারণ করা হচ্ছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছে ক্যাম্পাসগুলোতে। দুই উপাচার্যের একজনের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয়েছে দু’বার। তদন্ত প্রতিবেদনে তাদের ‘স্বপদে বহাল রেখে সুষ্ঠুভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা সম্ভব নয়’ বলে মন্তব্য করেছে ইউজিসি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রও জানাচ্ছে, তাদের আর পদে বহাল রাখা ঠিক হবে না।

ইবি উপাচার্যের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আবদুল হাকিম সরকার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) উপাচার্য হিসেবে যোগ দেন ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর। চলতি বছরের ডিসেম্বরে তার চার বছরের কার্যমেয়াদ পূর্ণ হবে। কাজে যোগ দিয়েই তিনি ইবি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী লাইব্রেরিয়ান পদে তার স্ত্রী সুমি সরকারকে নিয়োগ দেন। কিন্তু প্রতিবাদ-আন্দোলনের মুখে সে নিয়োগ বাতিল করেন তিনি। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় নিয়োগ বাণিজ্য করে, ঠিকাদারদের কাছ থেকে উন্নয়নমূলক কাজে উৎকোচ-বখরা নিয়ে ও নিয়মবহির্ভূতভাবে সারাদেশের অসংখ্য মানহীন ফাজিল-কামিল মাদ্রাসাকে অধিভুক্তির অনুমোদন দিয়ে বিভিন্ন সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের তদন্ত করে ইউজিসির তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি থেকে জানা গেছে, তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন কমিশনের সাবেক সদস্য অধ্যাপক আবুল হাশেম। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন দিল আফরোজা বেগম ও অতিরিক্ত পরিচালক (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়) ফেরদৌস জামান। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, উপাচার্য একই সময়ে একাধিক বাড়ি ভাড়া নিয়েছেন। তিনি কুষ্টিয়া থেকে প্রতি মাসে ১৪ হাজার টাকা করে বাড়ি ভাড়া তোলেন; আবার ঢাকার বাসার জন্যও প্রতি মাসে ৫২ হাজার টাকা করে ভাড়া তোলেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের চার রুমের একটি বাংলোতে মাত্র ১০ টাকা পরিশোধ করে বসবাস করেন তিনি!

তদন্ত কমিটি সূত্র জানায়, উপাচার্য ড. আবদুল হাকিম যোগদানের পর থেকেই সারাদেশের ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসার অধিভুক্তি, নবায়ন, পরীক্ষার কেন্দ্র নির্ধারণ ও শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির আশ্রয় নিতে থাকেন। মাদ্রাসার ঘুষের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে উপ-উপাচার্য ড. শাহিনুর রহমানের সঙ্গে তার মনস্তাত্তি্বক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ দ্বন্দ্বের জের হিসেবে উপ-উপাচার্য কিছুদিন আগে পদত্যাগ করেছিলেন। যদিও সরকার সে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেনি।

সৌদি বাদশার আমন্ত্রণে আবদুল হাকিম সরকার ২০১৪ সালে হজে যান। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে তার সব খরচ সৌদি সরকার বহন করলেও সেখান থেকে ফিরে এসে এ ভ্রমণের জন্য উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে ৬৫ হাজার টাকা তুলে নেন। এ নিয়ে আলাপকালে উপাচার্য আবদুল হাকিম সমকালকে বলেন, “হজে যাওয়ার সময় আমি ‘পকেট মানি’ হিসেবে কিছু টাকা নিয়েছিলেন। পরে এ নিয়ে বিতর্ক উঠলে সে টাকা ফেরত দিয়েছি।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘সৌদি সরকার হজে যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়া ও তাদের ভ্রমণসূচি অনুযায়ী নির্ধারিত স্থানে যাতায়াতের ব্যবস্থা করেছে। এর বাইরে কি একজন উপাচার্যের অন্য কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে না?’

তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায়, ‘ইবি উপাচার্য অত্যন্ত দুর্বল প্রশাসন পরিচালনা করছেন। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রলম্বিত সেশন জট দেখা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় দিনের পর দিন বন্ধও থেকেছে।’

শেকৃবির উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ :গত বছর শেকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক শাদাত উল্লার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ইউজিসি প্রতিবেদন জমা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু এ প্রতিবেদন সম্পর্কে আপত্তি জানিয়ে পুনঃতদন্তের আবেদন করেন উপাচার্য। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে খোদ ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নানের নেতৃত্বে পুনঃতদন্ত হয়। গত ২৩ মার্চ এ প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটির সদস্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) বেলায়েত হোসেন তালুকদার বলেন, ‘তদন্তে সামগ্রিকভাবে উপাচার্য দোষী প্রমাণিত হয়েছেন।’ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রতিবেদনে উপাচার্যকে সরিয়ে দেওয়া ও পদত্যাগের সুযোগ দেওয়াসহ একাধিক সুপারিশ করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘শেকৃবি উপাচার্যের বিষয়ে ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি। নিয়ম অনুযায়ী তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছি। এরপর তা রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনটি সেকশন অফিসার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে ২৪ জনকে নিয়োগ দেন শেকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক শাদাত উল্লা। পাঁচজন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন ২৯ জনকে। এ পর্যন্ত তিনি ৫৩ জন শিক্ষকের নিয়োগ দিয়েছেন, যেগুলোর প্রতিটি নিয়েই বিতর্ক রয়েছে। ভুয়া অভিজ্ঞতাপত্রের মাধ্যমে নিজের শ্যালক সাইফুল ইসলাম চৌধুরীকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে চাকরি দিয়েছেন তিনি। এ জন্য নূর ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ১৫ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা দেখানো হয়েছে। ৯ মাসের চাকরির অভিজ্ঞতা দেখানো হয়েছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর মধ্যে নূর ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি নামে দেশে কোনো অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় নেই; আর জাল সনদ বিক্রির অভিযোগে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়কে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন সুপারিশ করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়ে নিজের ভাতিজিসহ একাধিক আত্মীয়-স্বজনকে উপাচার্য শাদাত উল্লা শেকৃবিতে বিভিন্ন পদে চাকরি দিয়েছেন। উপাচার্যের ভাতিজি শরাবান তহুরা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় রেজিস্ট্রার অফিসের সেকশন অফিসার পদে, ভাতিজা আরিফ বিল্লাহ মোয়াজ্জিন পদে এবং অপর ভাতিজা রেজাউল ট্রেজারারের কার্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগ পেয়েছেন। সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ বছর হলেও উপাচার্য তার ৪৫ বছর বয়সী শ্যালকের স্ত্রী কামরুন নাহার রেবাকে ছাত্র পরামর্শ ও উপদেষ্টা কার্যালয়ে এ পদে নিয়োগ দিয়েছেন। তদন্ত কমিটি প্রমাণ পেয়েছে, উপাচার্য ঈদুল ফিতর, পহেলা বৈশাখ ও ঈদুল আজহার সময় আপ্যায়ন ব্যয় বাবদ দুই লাখ টাকা করে মোট নয়বার বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে টাকা তুলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকায় কিনেছেন নিজের বাসার ক্রোকারিজ। উপাচার্যের বাসভবন প্রায় নতুন হলেও তা সংস্কারের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। একাডেমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই আবেদন নিয়ে ইন্টারভিউ কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। তদন্ত প্রতিবেদনের এসব বিষয় সম্পর্কে আলোচনার জন্য বারবার চেষ্টা করা হলেও উপাচার্যের কাছ থেকে সাড়া মেলেনি।