অবহেলায় নষ্ট হতে বসেছে রাবির ‘গোল্ডেন জুবিলি টাওয়ার’


1542 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
অবহেলায় নষ্ট হতে বসেছে রাবির ‘গোল্ডেন জুবিলি টাওয়ার’
ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৬ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

DSC03519

এ আর আশিক, রাবি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনলেই উঠে আসে গোল্ডেন জুবিলি টাওয়ারের কথা। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের যখন পঞ্চাশ বছর পূর্তি হয়েছিল ঠিক সে সময়কে স্মৃতির মণিকোঠায় ধরে রাখার জন্যই এই টাওয়ারটি নির্মাণ করা হয়। যখন এটি তৈরি করা হয়েছিল সে সময় রাবির অবস্থা ছিল লোকে লোকারণ্য। শুধু মানুষ আর মানুষ যেদিকে তাকাই শুধুই মানুষ। আর এসব মানুষ এসেছিল সেই আর্কষণীয় গোল্ডেন জুবিলি টাওয়ারটি এক নজর দেখতে।

কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে কর্তৃপক্ষের অযতœ, অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে ক্রমেই নষ্ট হতে বসেছে বিশ^বিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী এ ‘গোল্ডেন জুবিলি’ টাওয়ারটি। টাওয়ারটিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের যেন কোনো মাথাব্যাথাই নেই। ফলে নির্মাণের মাত্র কয়েক বছরের মাথায় টাওয়ারটি তার সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। এ নিয়ে আগত দর্শনার্থী ও ক্যাম্পাসের সর্বমহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই স্বল্প সংখক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ নামে খ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের। এরপর নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে এটি অতিক্রম করেছে দীর্ঘ পথ। এ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে গেছে বিভিন্ন ঘটনা। তৈরি হয়েছে অনেক উজ্জ্বল ইতিহাস। জন্ম দিয়েছে অনেক জ্ঞানপিপাসু প-িত। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দীর্ঘ সময়ের উজ্জ্বল ইতিহাসকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ২০০৩ সালের ২১ থেকে ২৩ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় এক অনাড়ম্বর ‘গোল্ডেন জুবিলি’ অনুষ্ঠান। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দীর্ঘদিনের ইতিহাসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তস্বরূপ নির্মাণ করা হয় ‘গোল্ডেন জুবিলি টাওয়ার’। বিশ্ববিদ্যালয় মেইন গেটের পাশে অবস্থিত এই টাওয়ারটি নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজশাহীর কৃতী সন্তান উপমহাদেশের প্রখ্যাত স্থপতি শিল্পী মৃণাল হক। কয়েক মাস কঠোর পরিশ্রম করে এর মডেল তৈরি করেন তিনি।

বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন ও গোল্ডেন জুবিলি টাওয়ার নির্মাণ কমিটি সূত্রে জানা যায়, পৃথিবীর অন্যতম অত্যাধুনিক এই ভাস্কর্যটি নির্মাণ এবং তার পাশে একটি মুরাল তৈরি করতে ব্যয় হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা। তৎকালীন রাজশাহী সিটি করপরেশনের মেয়র মিজানুর রহমান মিনু এ ১৫ লাখ টাকার মধ্যে ১২ লাখ টাকার জোগান দেন বলে প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানান। আর বাকি ৩ লাখ টাকা দেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
সূত্রে আরোজানা যায়, এটি নির্মাণ করতে মোট ব্যয় হয় ১৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে মিনুর ১২, প্রশাসনের ৩ লাখ ছাড়াও বাকি ৩ লাখ টাকার জোগান দেন শিল্পী মৃণাল হক নিজেই।

সূত্র জানায়, গোল্ডেন জুবিলি টাওয়ার নির্মাণের পর থেকেই প্রতিদিন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সেখানে এবং ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো থেকে প্রায় হাজারো লোকের ঢল নামত। নানা বয়সী দর্শনার্থীর উপচেপড়া ভিড়ে চত্বরটি সারাক্ষণ মুখরিত হয়ে থাকত। সেখানে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীরা শিল্পী মৃণাল হকের কারুকার্য দেখে মুগ্ধ হতো এবং টাওয়ার ও মুরালের চারপাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে ছবিটিকে ফ্রেমে বন্দি করে রাখতে দেখা যেত অনেককে। টাওয়ারের সঙ্গে লাগানো ইস্পাতের একটি দেয়াল আছে। দেয়ালটির নাম ‘ইস্পাতের কান্না’। সেই দেয়ালে মালবাহী ভ্যান, ঘোড়ার গাড়ি, মানুষ, সাইকেল, সূর্যমুখী ফুল, শহীদ মিনারের কারুকাজ করা রয়েছে। সেই কারুকাজগুলো শিকল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। খুবই অসাধারণ দেখতে এসব কাজ। টাওয়ারটির চারপাশ ঘিরে দেওয়ায় সেখানে বসার সুন্দর জায়গা আছে।

কিন্তু এই টাওয়ার নির্মাণের দীর্ঘদিন পার হওয়ার পরও সেটি সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যাপারে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন কোনো উদ্যোগ না থাকায় এটি প্রায় নষ্ট হতে বসেছে। রোদ-বৃষ্টির কারণে টাওয়ার ও ম্যুরালে মরিচা ধরে গেছে। এরমূল আকৃতিটি আর অবিকল নেই। আগের মতো আর সেই চাকচিক্য রঙ নেই। তার কোনো সৌন্দর্যও নেই। ফলে আর দর্শনার্থীরাও সেখানে আগের মতো ভিড় জমায় না। আর সেখানে তেমন কাউকে ছবিও তুলতে দেখা যায় না। অনেকে সেটি দেখতে এসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চলে যান।

এমন একজন দর্শনার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শুধু প্রশাসনের অবহেলা ও সংরক্ষণের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ না থাকার কারণে সুন্দর এই টাওয়ারটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে টাওয়ার নির্মাণ কমিটির সভাপতি রাবি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ও ইবির সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গোল্ডেন জুবিলি টাওয়ার আমাদের সকলের সম্পদ। এটা রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। তবে এব্যাপারে সবার আগে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সহ আমাদের জাতীয় চেতনা লক্ষনীয়। আমরা টাওয়ারটি সংস্কারের জন্য ইতঃপূর্বে প্রশাসনকে অনেকবার অবহিত করেছি। কিন্তু প্রশাসন সেটি আমলে না নেওয়ায় সুন্দর এই টাওয়ারটি আজ নষ্ট হতে বসেছে। তিনি এব্যাপারে প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা করার আহবানও জানান।

তবে অবহেলার কথা অস্বীকার করে রাবি ছাত্র উপদেষ্টা প্রফেসর ছাদেকুল আরেফিন মাতিন বলেন, শুধু গোল্ডেন জুবিলি টাওয়ার নয় আমরা বিশ^বিদ্যালয়ের সকল স্থাপনা সংরক্ষনে বদ্ধ পরিকর। আর যদিও এই স্থাপনার কোনো ত্রুটি হয়ে থাকে আমরা বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন অতি দ্রুত এটি সংরক্ষণের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।