অভূতপূর্ব, ঐতিহাসিক


406 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
অভূতপূর্ব, ঐতিহাসিক
জুলাই ১৬, ২০১৫ খেলা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকম ডেস্ক :
বাঘ আর সিংহের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বিজয়ীর হুঙ্কারটা দিল বাঘ! প্রকৃতিতে এমনটা ঘটে না। ক্রিকেটেও ঘটেনি না বহুকাল। তবে সাগরপাড়ে কিন্তু অপ্রতিরোধ্য ঢেউয়ের মতো শোনা গেল বাঘেরই গর্জন। আর সেই গর্জনে কুপোকাত আফ্রিকার সিংহরা! বিশ্ব ক্রিকেটের অবিসংবাদিত পরাশক্তি দক্ষিণ আফ্রিকাও বাঘের ডেরায় নতজানু হলো। ধনুর্ভঙ্গপণ আর আধিপত্যের আতিশয্যে, মেঘ-বৃষ্টির চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে ডাকওয়ার্থ-লুইস নিয়মে ৯ উইকেটের জয়ে লেখা হলো আরও একটি মহাকাব্যিক সিরিজ বিজয়। ক্রিকেটমঞ্চের নতুন বাংলাদেশ আরও একবার উড়াল অহঙ্কারের রঙিন ফানুস। অমিয় সুধায় স্নাত হলো বাংলাদেশের ক্রিকেট। নিজের ঘরে টানা চতুর্থবার রাজমুকুট অক্ষুণ্ন রাখল বাংলাদেশ। ঘরে টানা চার সিরিজ অপরাজিত। ভাবা যায়!

গোটা দেশে ঈদ আনন্দ ছড়িয়ে দিয়েছে টাইগারদের এই জয়। গোটা দেশ বুঁদ হয়ে কাল উপভোগ করেছে মুস্তাফিজদের বোলিং আর সৌম্যদের ব্যাটিং। ক্রিকেটপ্রেমী প্রধানমন্ত্রী নিজেও টেলিভিশনের সামনে বসে ছিলেন সারাটা সময়। ম্যাচ শেষে এই ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ের জন্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শুভেচ্ছা জানিয়েছেন টাইগারদের। জিম্বাবুয়ের পর স্বপ্নরাঙা বিশ্বকাপ গেছে। এরপর পাকিস্তান ও ভারত এখানে এসে দেখেছে দর্পচূর্ণ হওয়ার আখ্যান। এবার দক্ষিণ আফ্রিকাও দেখল ইতিহাসের নতুন নির্মাণ। বিশ্ব ক্রিকেটের তিন মহারথী দলের বিপক্ষে এমন অভাবনীয় সাফল্য তো শুধু সাফল্যের নিক্তিতেই বিচার্য নয়। তাতে লেখা আছে, দাপট আর চোখে চোখ রেখে আক্রমণাত্মক হওয়ার সাহস। যার অমূল্য এক নজির এদিন সাগরিকায় লিখলেন তামিম ইকবাল ও সৌম্য সরকার।

সৌম্যর ব্যাটে সেই শুরুর দিন থেকেই আগুনের স্টম্ফুলিঙ্গ হয়ে জ্বলা বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। কাল সেই দাপটটা কি আরও চওড়া হলো না? দক্ষিণ আফ্রিকা বৃষ্টিবিঘি্নত ম্যাচে ৪০ ওভার শেষে করল ৯ উইকেটে ১৬৮ রান। ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে বাংলাদেশের জন্য লক্ষ্য ১৭০। তামিমকে নিয়ে সৌম্য প্রোটিয়া বোলারদের একদমই অলিগলির বোলার বানিয়ে ফেললেন! ১৮ ওভারের পঞ্চম বলে মিড উইকেট দিয়ে মরনে মরকেলকে যে ছয়টা মারলেন সৌম্য, সেটাই তো এই বাংলাদেশের প্রতীকী চিত্র! শততম ম্যাচ খেলতে নামা মরকেল এমন দাপুটে ছয় ক্যারিয়ারে কতবার খেয়েছেন, ধীরলয়ে হেঁটে আসার সময় বোধহয় এটাই ভাবছিলেন! সৌম্য আগের ম্যাচে ৮৮ রানে অপরাজিত ছিলেন। আফসোস ছিল, দক্ষিণ আফ্রিকা আরও কিছু রান করতে পারলে হয়তো ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরিটাও করে ফেলতে পারতেন। ব্যাটিং যখন করেন তখন ‘নাভার্সনেস’ বলে কিছু আছে মনে হয় না। তবে ৭৫ বলে ১৩ চার ১ ছয়ে ৯০ রান করার পর ইমরান তাহিরের বলে সৌম্য শর্ট কাভারে আমলার হাতে নিরীহ দর্শন ক্যাচ দিলেন। জয় থেকে বাংলাদেশ তখন মাত্র ১৬ রান দূরে! সৌম্য এদিন সেঞ্চুরিটা বোধহয় ফেলেই এলেন! তামিম ইকবাল কয়েক ম্যাচ ধরেই রানে নেই। ‘লোকাল হিরো’ ঘরের মাঠেই খেলতে নামলেন ১৫০তম ওয়ানডে। মাইলফলকের ম্যাচে তামিম করলেন ৭৭ বলে ৭ চারে অপরাজিত ৬১ রান। তবে যে তামিমকে দেখে দেখে অভ্যস্ত চট্টগ্রাম, এদিন সেই তামিমের রূপে দেখা দিলেন সৌম্য। তামিম শুধু সঙ্গীর ভূমিকাই পালন করে গেলেন। ভাবা যায়! হ্যাঁ, যায় বৈকি! টি২০র দুটি ম্যাচ ও প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে পারেনি বলে ‘হায় হায়’ রব উঠে গিয়েছিল। এমনও তো বলা হয়েছিল, দক্ষিণ আফ্রিকার মানটা এতই ‘ভিনগ্রহে’র যে, বাংলাদেশ এখনও সে স্তরে যায়নি। হ্যাঁ, হয়তো যায়নি। তবে প্রোটিয়ারাও কি বুঝল না, টি২০ আর ওয়ানডের বাংলাদেশ এমনই আলাদা যে, এখানে প্রতিপক্ষকে প্রতিটি বলেই পরীক্ষা দিতে হবে সমানে সমান? দক্ষিণ আফ্রিকা পরীক্ষা দিল এবং সেই পরীক্ষায় তারা বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো অকৃতকার্য! বাংলাদেশ গৌরব তিলক আঁকল, প্রোটিয়ারা পেল সম্মান হারানোর গ্গ্নানি। ক্রিকেট খেলাটাকে এজন্যই বোধহয় বলা হয়_ ‘এ গেম অব গ্রেট লেভেলার’! মাশরাফি বিন মর্তুজার টসভাগ্য ভালো নয়। তবে ম্যাচভাগ্য যে অমলিন, সেটা আরও একবার প্রমাণিত হলো! হাশিম আমলা টস জিতে ব্যাট নিলেন। ফ্ল্যাট উইকেট। ব্যাটিং সহায়ক। তার চেয়েও বড় কথা, ইতিহাস বলে, এখানে আগে ব্যাট করে ২৫০ রানের আশপাশে স্কোর রাখতে পারলেই জয়টা অসম্ভব নয়। তা বাংলাদেশ সেটা হতে দিল কই! বুধবার মেঘাচ্ছন্ন আকাশ সকাল থেকেই চোখ রাঙিয়েছে। দিনের আলোর আরও গভীরে তারকারাজি তাই লুকিয়েই থাকল। রাতেও চট্টগ্রামের আকাশে তারা দেখা গেল না।

বিকেল গড়াতে না গড়াতেই ঝুম বৃষ্টি। চট্টগ্রামের আকাশ তখন সারা বাংলার সঙ্গে ঐকতান ধরেছে। সারাটা দিন বাংলাদেশের আকাশে মেঘ আর বৃষ্টির আধিপত্য। চট্টগ্রাম বাদ যাবে কেন! সেই বৃষ্টি আসার আগেই দক্ষিণ আফ্রিকার ৪ উইকেট ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশ। খেলার তখন মাত্র ২৩ ওভার শেষ হয়েছে। স্কোরবোর্ডে মাত্র ৭৪ রান। শুরুটা আবারও করেছিলেন মুস্তাফিজ। তৃতীয় ওভারের দ্বিতীয় বলে দুর্দান্ত এক ইনার বলে বোল্ড করেছেন ডি কককে। ৭.১ ওভারের মাথায় সাকিব ফেরালেন এই সিরিজে টানা ভালো খেলতে থাকা ডু প্লেসিসকে। স্লগ সুইপ করতে গিয়ে উপরে উঠে যাওয়া বল ধরলেন মুশফিক। দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক হাশিম আমলা যে শুধু টসভাগ্য নিয়ে এসেছিলেন, তা-ই নয়। ব্যাটিং ভাগ্যটাও সঙ্গে ছিল তার। নইলে সাকিবের বলে কাভারে ক্যাচ উঠিয়েও সাবি্বরের হাতে বাঁচবেন কেন! রুবেলের বলে লিটনের ক্যাচ হয়েও বা ফ্রি হিটের বদান্যে বাঁচবেনই বা কেন! উইকেটকিপারের হাতে ক্যাচ দিয়েও আপিল না হওয়ায় রক্ষা পাবেন কেন! সেই আমলাও পারলেন না। সাকিবের দুইশ’তম ওয়ানডে উইকেটের শিকার হয়ে ক্যাচ দিলেন মুশফিককে।

মাহমুদুল্লাহকে ১৬তম ওভারে আনলেন মাশরাফি। প্রথম বলেই রুশো বিদায়! দক্ষিণ আফ্রিকা তো ভয়াবহ চাপে। সেই চাপ থেকে মুক্তি দিল বৃষ্টি। বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে নামল। বৃষ্টির কারণে তিন ঘণ্টা পর খেলা শুরু হলো। ৪০ ওভারে খেলে নেমে যাওয়ায় সুবিধাটা বরং সফরকারীদের হাতেই গেল। উইকেটে তখন মিলার ও ডুমিনির মতো ব্যাটসম্যান। সেই জুটিটা পঞ্চম উইকেটে ৬৩ রান তুলে ফেলল ঠাণ্ডা মাথায়। কিছুটা দ্রুত গতিতেও। ‘কিলার’ মিলার ধ্বংসাত্মক হওয়ার আভাস দিতেই ত্রাতা হয়ে এলেন মাশরাফি। সাবি্বর পয়েন্টে দুর্দান্ত এক ক্যাচ নিয়ে ৫১ বলে ৪৪ রান করা মিলারকে ফেরালেন। এর পর সাকিব ও মুস্তাফিজ ভাগ করে নিলেন আরও দুটি উইকেট। উইকেট পাবেন না মনে হলেও রুবেল হোসেন পেলেন শেষের দুটি উইকেট। ডুমিনি চেষ্টা করেছিলেন। ৭০ বলে ৫১ রান করে রুবেলের দ্বিতীয় শিকার তিনি। ১৭০ রান তেমন কিছু নয়। সেটা সৌম্য-তামিম আরও ‘ছোট’ বানিয়ে ফেললেন। ২৬.১ ওভারেই ৮৪ বল হাতে থাকতে খেলা শেষ! ইমরান তাহিরকে চার মেরে যখন খেলা শেষ করলেন ৫ বলে ৫ রান করা লিটন দাশ, বাংলাদেশের রান রেট তখন ৬.৪৯! যেন দাম্ভিকতার চূড়ান্ত প্রদর্শনী! ২০০৮ সালে এ মাঠেই ৯ উইকেটে প্রোটিয়াদের কাছে হেরেছিল বাংলাদেশ। কী আশ্চর্য, সে সংখ্যাটাই দারুণ দাপটে ফিরিয়ে দিল বাংলাদেশ! নতুন বাংলাদেশ!