‘অস্ট্রেলিয়া সিরিজেই টেস্ট খেলা সম্ভব’


421 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
‘অস্ট্রেলিয়া সিরিজেই টেস্ট খেলা সম্ভব’
আগস্ট ১৩, ২০১৫ খেলা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকম ডেস্ক :
তাসকিন আহমেদ২০১২ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের আগে চোট পেয়েছিলেন বাঁ হাঁটুতে। প্রায় আড়াই বছর সেই চোটে ভুগে সুস্থ হতেই ডান হাঁটুতে একই চোট পেলেন ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকের এক সপ্তাহ আগে। সেই চোটও কাটিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটারের তালিকায় সাফল্যের সঙ্গেই নাম লিখিয়েছেন। কিন্তু দুই হাঁটুতেই এখনো ফিরে ফিরে আসে পুরোনো ব্যথা। টেস্ট খেলার ছাড়পত্রও তাই মেলেনি এতদিন। তবে পেসার তাসকিন আহমেদ আশাবাদী, ব্যথাটা এখনকার মতো স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকলে টেস্ট খেলা সম্ভব আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সিরিজেই—

*বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা এখন ছুটিতে। তবু প্রায় প্রতিদিনই আপনি মাঠে আসছেন। জিম করছেন, বল করছেন। বিরক্ত লাগে না?
তাসকিন আহমেদ: দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার কিছু বড় চোট আছে, যেটা সবার নেই। চোট যেহেতু আছে, মেনে নিতেই হবে। আমার লক্ষ্য এখন একটাই, নিজেকে ফিট করে তোলা। মাঝেমধ্যে খারাপ লাগে, যখন দেখি সবাই ছুটি কাটাচ্ছে। ঘুরছে। আর আমার ট্রেনিং করতে হচ্ছে। আমিও অবশ্য কয় দিন আগে দেশের বাইরে থেকে ঘুরে এসেছি।
*শুধু ফিটনেস ট্রেনিংই করছেন, নাকি বোলিং-টোলিংও করছেন?
তাসকিন: এই সপ্তাহ থেকে সেটিও শুরু করেছি। তবে আমাকে ফিটনেসেই বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। ধরুন, আজকে মন চাইল আমি ১৫ ওভার বল করব, সেটা সম্ভব না। আমার বোলিংটা নির্দিষ্ট করা থাকে। আজকে ১০ ওভার করলে কালকে হয়তো ৬ ওভার, পরের দিন বিশ্রাম। এ জন্যই আমি টেস্ট খেলার অনুমতি পাচ্ছি না। টেস্টে তো দলের প্রয়োজনে দিনে ২৫ ওভারও বল করতে হতে পারে। টানা তিন দিন ফিল্ডিং করতে হতে পারে। আমার দুই হাঁটুতেই সমস্যা। চাইলেও তাই অনেক সময় অনেক কিছু হয় না।
*এ বয়সে আপনার তো মনের আনন্দে খেলার কথা। অথচ ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই কিনা এমন শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে খেলতে হচ্ছে! নিজেকে দুর্ভাগা মনে হয় না?
তাসকিন: আসলেই…মাঝেমধ্যে মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। টেস্ট খেলা হচ্ছে, কিন্তু আমি খেলতে পারছি না। আমি সবার চেয়ে ব্যতিক্রম…সবাই যা ইচ্ছে করতে পারছে, কিন্তু আমি পারছি না। অনেক সময় হয়তো দুই হাঁটুই ব্যথা করছে, কিন্তু ওই ব্যথা নিয়েই আমাকে দৌড়াতে হচ্ছে। কিছু করার নেই। এটা আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। ফাস্ট বোলারদের সবারই কিছু না-কিছু বড় চোট থাকে। আমি সে রকম পরিস্থিতিতে একটু আগেই পড়ে গেছি। তারপরও আমার লক্ষ্য অনেক বড় একজন ফাস্ট বোলার হওয়া। কাজেই এসব মেনে নিয়েই খেলতে হবে।
*পর পর তিনটা ওয়ানডে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ দল। কিন্তু টেস্ট সিরিজ শুরু হলেই আপনি দর্শক। মাঠের বাইরে থেকে টেস্ট দেখতে কেমন লাগে?
তাসকিন: ভালোই লাগে। আবার আফসোসও হয়। আমি তো টেস্ট খেলতে পারছি না! কবে খেলব? ফিজিওর কাছ থেকে এখনো অনুমতি পাইনি। কিন্তু আমার জন্য এটা একটা নতুন লক্ষ্যই বলতে পারেন যে, আমি সব ফরম্যাটের ক্রিকেটে খেলতে চাই। এক দিক দিয়ে অবশ্য আমি ভাগ্যবান। বিসিবি আমার অনেক যত্ন নিচ্ছে। জাতীয় দলে এত কম সময় খেলেও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি। জাতীয় দলে আসার আগেই আমাকে চিকিৎসার জন্য অস্ট্রেলিয়া পাঠিয়েছিল বোর্ড। এটা সবার ক্ষেত্রে হয় না।
*কিন্তু আপনিই বললেন, দুই হাঁটু মাঝে মাঝে প্রচণ্ড ব্যথা করে। তো আপনার কী মনে হয়, টেস্ট খেলা কি আদৌ সম্ভব হবে আপনার পক্ষে? ফিজিও, ট্রেনাররাই বা কী বলেন?
তাসকিন: তাঁরা তো আশাবাদী। ওনারা এমনকি এটাও বলেছেন যে, এখন যে ট্রেনিংগুলো করছি সেগুলো বড় কোনো সমস্যা তৈরি না করলে আমার পক্ষে অস্ট্রেলিয়া সিরিজেই টেস্ট খেলা সম্ভব। আসলে ফাস্ট বোলারদের শরীরে ব্যথা থাকবেই। যত বড় বড় ফাস্ট বোলার দেখেছি বা মাশরাফি ভাইয়ের সঙ্গেও মাঝেমধ্যে কথা বলে জেনেছি, সবারই ব্যথা আছে। এগুলো আমাকে প্রেরণা দেয়। জনসনের অনেক ব্যথা ছিল, ম্যাকগ্রা-ব্রেট লির ব্যথা ছিল। লির নাকি ছয়বার অস্ত্রোপচার হয়েছে, মাশরাফি ভাইয়ের সাতবার হয়েছে। ওনারা এত কিছুর পরও যেহেতু বড় কিছু হতে পেরেছেন, আমি পারব না কেন? অসম্ভব কিছুই না।
*আপনিও তাহলে মনে করছেন এবারের অস্ট্রেলিয়া সিরিজেই আপনার পক্ষে টেস্ট খেলা সম্ভব?
তাসকিন: হ্যাঁ, সম্ভব হতে পারে। কিছু ব্যথা সহ্য করে তো সব সময়ই খেলছি। এটা সবারই খেলতে হয়। ব্যথা যদি অতিরিক্ত না বেড়ে যায়, তাহলে টেস্ট খেলতে সমস্যা নেই। কিন্তু স্বাভাবিক যে ব্যথা, সেটা থাকলে সম্ভব। অস্ট্রেলিয়া সিরিজেই টেস্ট খেলা সম্ভব।
*কিন্তু আপনাকে নাকি একটা ওয়ানডে খেলেই পরদিন বিশ্রাম নিতে হয়…
তাসকিন: টানা খেলার মধ্যে থাকলে অনেক সময় এটা লাগে। ধরুন, এক দিন বিরতি দিয়ে পর পর দুটি ওয়ানডে খেললাম। আবার তিন দিন পর খেলা। তখন হয়তো একদিন বল না করে সুইমিং, জিম এসব করি। এ রকম সবার ক্ষেত্রেই হয়। তবে আমার বেলায় একটু বেশি বিধিনিষেধ থাকে। অন্যরা ম্যাচের আগের দিন ৬ ওভার বল করলে আমি করি ৪ ওভার।
*এ রকম পরিস্থিতিতে টেস্ট খেলার স্বপ্ন ধরে রাখা কতটা সহজ?
তাসকিন: এটা আসলেই কঠিন। তবে কঠিন হলেও কিছু করার নেই। দুনিয়ায় তো অনেক অসম্ভবই সম্ভব হয়েছে। আমি টেস্ট খেলতে পারব, এটাও অসম্ভব কিছু না। আমার মাত্র ২০ বছর বয়স। আল্লাহ যদি চান, অনেক দিন খেলার আশা রাখি। খেলতে খেলতে একসময় দেখবেন ঠিকই ফিট হয়ে যাব। এমনও তো হতে পারে আমি ৩০০ উইকেট নিয়েছি টেস্টে! স্বপ্ন তো দেখতেই পারি।
*টেস্টে বাংলাদেশ দলে পেসার-সংকট চলছে। আপনার কি মনে হয় আপনি আর মাশরাফি থাকলে টেস্টে পেস আক্রমণের ধার আরও বাড়ত?
তাসকিন: যারা খেলছে, তারাও ভালো খেলছে। তবে হ্যাঁ, খেলা দেখার সময় মাঝেমধ্যে মনে হয়, ইশ্! আমি যদি খেলতে পারতাম, হয়তো এই স্পেলটা ভালো করতাম। এই সময় একটা বাউন্সার মারলে ভালো হতো। আমার বিশ্বাস, যদি কোনো দিন সুযোগ পাই, আমি ভালো কিছু করবই। কারণ টেস্টে মন খুলে বোলিং করতে পারব। ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টিতে নানা চাপ থাকে। টেস্ট সে রকম না। আমি যেহেতু ফাস্ট বোলার, টেস্ট খেলাটা আমার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
*এখন পর্যন্ত ১৪টি ওয়ানডে খেলে ২১ উইকেট। এর মধ্যে অভিষেক ম্যাচেই নিয়েছিলেন ৫টি। বাকি ১৩ ম্যাচে ১৬ উইকেট কি একটু কম হয়ে গেল না?
তাসকিন: আরেকটু তো ভালো হতে পারতই। তিন-চারটা ম্যাচে কোনো উইকেট পাইনি। উইকেট পাওয়া আসলে ভাগ্যেরও ব্যাপার। অনেক সময় ভালো বল করলেও ব্যাটের কানায় লেগে চার হয়ে যায়, ক্যাচ পড়ে। আমার বলে এমন অনেকবারই হয়েছে। তবে এগুলো বলে লাভ নেই। এসব খেলারই অংশ। সামনের দিনগুলো আরও চ্যালেঞ্জিং। সে জন্য নিজের দক্ষতা বাড়ানোর কাজ করছি। পেস বাড়ানো, সুইংয়ে উন্নতি আনা, বৈচিত্র্য, ফিটনেস বাড়ানো—সব মিলিয়েই উন্নতি করতে হবে।
*জোরে বল করার ব্যাপারে কোনো আপস না করার প্রতিজ্ঞায় কি আপনি এখনো অবিচল?
তাসকিন: অবশ্যই। আমি তো ফাস্ট বোলার। দলে আমার ভূমিকা ফাস্ট বোলার হিসেবে। আমার কাজই জোরে বল করা। এখন আমি যদি গিয়ে ১৩০-১৩২ কিলোমিটার গতিতে বল করি, সেটা আমার সঙ্গে মানাবে না। আমার বলে আহামরি সুইং নেই, কিন্তু আমি থ্রেট বোলার। বাংলাদেশ দলে দুজন থ্রেট বোলার—রুবেল ভাই আর আমি। আমাদের কাজই জোরে বল করা।
*সর্বোচ্চ কত কিলোমিটার গতিতে বল করতে চান? নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য আছে?
তাসিকন: তা তো আছেই। ব্রেট লি, শোয়েব আখতারকে আগে দেখেছি। এখন জনসনকে করতে দেখি। সব ভেঙেচুরে ফেলার মতো স্পেল। ৫-৬-৭ উইকেট নিয়ে একাই ম্যাচ জিতিয়ে দিচ্ছে। এ রকম কিছু করতে চাই। আমি ১৫০-এ বল করার স্বপ্ন দেখি। কঠোর পরিশ্রম করছি। ১৪৬ পর্যন্ত তো তুলেছি গতি। তবে জোরে বল করাই কিন্তু সব না। যত দিন যাচ্ছে, ততই শিখছি এটা। জোরে বলের সঙ্গে লাইন, লেংথ, সুইং, বৈচিত্র্য থাকতেই হবে।
*মুস্তাফিজুর রহমান রীতিমতো বিস্ময় হয়েই এসেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটে। তাঁর সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন?
তাসকিন: অসাধারণ বোলার। যখন দেখি, বাংলাদেশের একজন ফাস্ট বোলার বিশ্ব কাঁপিয়ে দিচ্ছে, খুব ভালো লাগে। নিজেদের কেউ ভালো করলে আসলে নিজের মধ্যেও উৎসাহ আসে। এর আগে দেখেছি অন্য দেশগুলো থেকে এ রকম ব্যতিক্রমী কোনো বোলার এসেছে। এখন বাংলাদেশ থেকেও কেউ এল। যদি আমি সুস্থ থাকি, সে-ও সুস্থ থাকে, ভবিষ্যতে হয়তো দুজনের মধ্যে ভালো একটা জুটি দাঁড়াবে। ভাবতেই ভালো লাগে, আমরা বাংলাদেশ দলকে একের পর এক ম্যাচ জেতাচ্ছি। আমি আমার গতি দিয়ে ব্যাটসম্যানদের ভয় দেখাচ্ছি। মুস্তাফিজও ওর সুইং, কাটার দিয়ে তাদের বিপদে ফেলছে।
*ক্যারিয়ার নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?
তাসকিন: অনেক স্বপ্ন দেখি। ২০০টি ওয়ানডে খেলব। ওয়ানডেতে ৪০০ উইকেট পাব, টেস্টে ৩০০ উইকেট হবে…এ রকম অনেক স্বপ্ন। আসলে বড় স্বপ্ন না দেখলে বড় খেলোয়াড়ও হতে পারব না।
*মাশরাফির সঙ্গে চেস্ট বাম্পের আইডিয়াটা কোত্থেকে এল?
তাসকিন: বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে একদিন ড্রেসিংরুমে আমি আর মাশরাফি ভাই গল্প করছিলাম। হঠাৎ মাশরাফি ভাই বললেন, উইকেট পেলে এ রকম একটা কিছু করব। পরে কীভাবে কীভাবে যেন মাঠে সেটা করেও ফেললাম। এর আগে এটা আমি কোনো দিন দেখিনি। এটা আমাদের আবিষ্কৃত। কয় দিন আগে ফেসবুকে একটা ছবি দেখলাম। এ-প্লাস পাওয়ার পর দুজন ছেলে চেস্ট বাম্প দিয়ে আনন্দ উদ্যাপন করছে। টেলিভিশনে কিছু বাচ্চাকে দেখেছি এটা করতে। আরও অনেককেই দেখি। এক দিন এক দাওয়াতে এক মুরুব্বি এসে বললেন, ‘তোমার সঙ্গে লাফ দিয়ে আমি ওটা করতে চাই…।’ আমাদের চেস্ট বাম্প এত জনপ্রিয় হয়ে যাবে ভাবিনি। যাঁকে আদর্শ হিসেবে দেখি, তাঁর সঙ্গে এ রকম একটা কিছু করা আমার জন্যও অনেক বড় পাওয়া। এগুলো টিম স্পিরিটও বাড়ায়।
*মাশরাফি আপনার আদর্শ বললেন। বিশ্ব ক্রিকেটে আর কেউ কি আছেন যাঁর বোলিং ভালো লাগে বা লাগত?
তাসকিন: মরনে মরকেল। এ ছাড়া কার্টলি অ্যামব্রোস, অ্যালান ডোনাল্ড এদের কিছু ফুটেজ দেখে মাঝেমধ্যে অবাক হই। কী রকম খতরনাক বোলিং করতেন তাঁরা!