আইলার আঘাতে স্থবির হয়েছিল সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চল


119 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
আইলার আঘাতে স্থবির হয়েছিল সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চল
মে ২৫, ২০১৯ দুুর্যোগ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

আজ সেই ভয়াল ২৫ মে

মিঠু বরকন্দাজ ::

বিগত ১০ বছরেও উপকূল অঞ্চলের মানুষ এখনও আইলার ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনাই। ২০০৯ সালের ২৫ মে সর্বনাশা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে লন্ডভন্ড হয়ে যায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদ। বিরানভূমিতে পরিণত হয় খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় বেশ কয়েকটি জেলার বিস্তীর্র্ণ এলাকা। এতে প্রায় ২শ মানুষের প্রাণহানিসহ মারা যায় হাজার হাজার গবাদি পশু ও জীবজন্তু। ধ্বংস হয় কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ। আইলায় আঘাত হানার ১০ বছর পরও উপকূলীয় জনপদ এখনও ধ্বংসের ঘোর কাটিয়ে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারেনি। এখনও হতদরিদ্র অনেক মানুষ আশ্রয়হীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। লাখ লাখ মানুষের জীবন এখনো স্বাভাবিক নয়, খাদ্য-পানি-আশ্রয় ও চিকিৎসার অভাবে মানুষ এখনো ধুকছে। সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে, আইলায় প্রায় ২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে প্রাণ হারান ১৯৩ জন মানুষ। ২ লাখ ৪৩ হাজার ঘরবাড়ি পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় এবং ৯৭ হাজার একর জমির আমন ফসল পুরোপুরি বিনষ্ট হয়। কাজ হারায় প্রায় ৭৩ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক। প্রাথমিকভাবে আইলার ক্ষয়ক্ষতি খুব কম হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব হয় ভয়ঙ্কর। ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে ধেয়ে আসা জলোচ্ছ্বাসে খুলনার দাকোপ ও কয়রা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার ৭১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ ও বিধ্বস্ত হয়। খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার ২৫ টি ইউনিয়নের ৩৩২ টি গ্রাম পুরোপুরি লবনাক্ত পানিতে তলিয়ে যায়। লবনাক্ত পানির প্রভাবে ৫০০ গরু, দেড় হাজার ছাগল মারা যায়। ঘরবাড়ি ও পেশা হারিয়ে উপদ্রুত এলাকা থেকে বাস্তুহারা হয়ে পড়ে ২ লাখ ৯৭ হাজার মানুষ। এখও খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার বেদকাশি, জোড়সিং, আংটিহারা, ঘড়িলাল; সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সীগঞ্জ; আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর আনুলিয়া ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ বাস্তুভিটায় পা রাখতে পারেনি। খুলনা শহর ও সাতক্ষীরা শহরের নানান স্থানে বাড়ি ভাড়া করে জীবন যাপন করছে। এক জরিপে দেখা যায়, আইলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় খুলনার দাকোপ উপজেলার কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়ন, কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী, দক্ষিণ বেদকাশী, কয়রা সদর ও মহারাজপুর ইউনিয়ন এবং সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সীগঞ্জ, আটুলিয়া, কাশিমাড়ী ইউনিয়ন। এখনো আকাশে মেঘ, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি আর কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া ও শাকবাড়ীয়া নদীর পানি একটু বাড়লেই আতকে ওঠেন উপকূলীয় কয়রা, শ্যামনগর উপজেলার উপকূলবর্তি মানুষ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইলার আঘাতের ১০ বছরেও বিধ্বস্থ খুলনার কয়রা, পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা, দাকোপ ও সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর আশাশুনি উপজেলায় নির্মিত হয়নি পর্যাপ্ত পরিমাণ সাইক্লোন শেল্টার। মেরামত হয়নি জরাজীর্ণ সাইক্লোন শেল্টারগুলো। বিস্তীর্ণ উপকূলের কিছু স্থানে ২/১টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মিত হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। আসন্ন বর্ষা মৌসুম আতংকিত করে তুলছে আইলা বিধ্বস্থ খুলনার চার ও সাতক্ষীরার দুই উপজেলার ৭০ লক্ষাধিক মানুষকে। দশ বছর পার হলেও খুলনার দাকোপ, কয়রা, বটিয়াঘাটা, পাইকগাছা ও সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর আশাশুনি উপজেলার ৩৩২টি গ্রামের পাঁচ সহস্রাধিক পরিবার এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকেরই ঠাঁই হয়েছে ওয়াপদার বেড়িবাঁধে। সরকারের পূর্নবাসন সহায়তা তাদের ভাগ্যে জোটেনি। এ মানুষগুলো মানবেতর জীবন যাপন করছেন। খেয়ে না খেয়ে তাদের দিন কাটছে ঝুঁপড়ি ঘরে।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামের মো. আব্দুল্লাহ বলেন, বিশ বছরের আয় রোজগারের অর্থ দিয়ে একটি বাড়ির মালিক হয়েছিলাম। আইলার তান্ডবলীলার দুই দিন পর পাওয়া যায় শুধু বাড়ির নিশানাটুকু। ঘরের ভিটের চি‎হ্ন ছাড়া সম্বল বলতে কিছু ছিল না। আইলার ১০ বছর পর এখনো সেই মাটির পোতা আঁকড়ে পড়ে আছি। এরপর আর ঘর তোলা সম্ভব হয়নি। আব্দুল্লাহর মতো অবস্থা গ্রামের অনেকেরই। এদের কেউ কেউ এখন বেড়িবাঁধের উপর ঝুপড়ি ঘর তুলে থাকছেন।খুলনা সাতক্ষীরার মানুষ ১৯৮৮/১৯৯১/২০০৭ সালের সিডরের ঝড় অনুভব করলেও জ্বলচ্ছাসে প্লাবিত হয় কিভাবে তা জানতেন না। আইলায় ১০টি বছর অতিবাহিত হলেও আইলার ক্ষতিগ্রস্থ পাউবোর কোন ভেড়ী বাঁধে কোন মাটি ভরাট বা পুনঃনির্মাণ করা হয়নি। উপকূলীয় প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষের এখনও আইলা আতঙ্ক বিরাজ করছে সামান্য দূর্যোগে ঘটে যেতে পারে উকূলীয় মানুষের মারাত্মক দূর্ঘটনা। আইলার ক্ষতিগ্রস্থ পাউবোর ভেড়ীবাঁধ পুনঃ নির্মাণের বিষয় জানতে চাইলে সাতক্ষীরা পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী জি,এম, আ. মমিন জানান, আইলায় ক্ষতিগ্রস্থ সমগ্র পাউবোর ভেড়ীবাঁধ পুনঃ নির্মাণের জন্য ভিডিওসহ প্রতিবেদন কয়েক দফায় মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধান মন্ত্রী নিজেও এব্যাপারে অবহিত আছেন। এটা বড় অংকের টাকার বিষয়ঠ। সরকার বিশ্বব্যাংকসহ নানা দাতা সংস্থ্যার সাথে যোগাযোগ অব্যহত রেখেছে। অতিদ্রুত দীর্ঘমেয়াদী টেকসই মজবুত একটা বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। সাতক্ষীরা -০৪ আসনের এম,পি, এস, এম, জগলুল হায়দার বলেন, আইলায় পর হতে আমার সংসদীয় সাতক্ষীরা-০৪ আসনে ব্যপক সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে আর এখনো দেওয়া হচ্ছে। অতীতেও জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার আইলাসহ সব ধরণের দূর্যোগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সকল ব্যবস্থা করবেন। ক্ষতিগ্রস্থ পাউবোর অরক্ষিত ভেড়ী বাঁধের কথা মহান জাতীয় সংসদের ৭১ বিধিতে একাধিকবার অবহিত করেছি। অতিদ্রুতই দীর্ঘমেয়াদী টেকসই মজবুত পাউবোর ভেড়ীবাঁধ নির্মাণের জন্য বর্তমান সরকার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

#