আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জিয়া জড়িত : প্রধানমন্ত্রী


129 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জিয়া জড়িত : প্রধানমন্ত্রী
আগস্ট ১৬, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান জড়িত ছিলেন বলে আবারও অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জিয়াউর রহমান খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে শুধু পৃষ্ঠপোষকতাই করেননি, ইনডেমনিটি বিল জারি করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ বন্ধ করেছিলেন। খুনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেই জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর গঠিত আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান টমাস উইলিয়ামকে বাংলাদেশে আসার ভিসা দেননি।

বিচারবর্হিভূত হত্যা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেছেন, এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংয়ের (বিচারবর্হিভূত হত্যা) কথা আজ সবাই বলেন। কিন্তু সবাই ভুলে গেছেন যে, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর অপারেশন ক্লিন হার্টের নামে বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার স্বামী জিয়াউর রহমান দিয়ে গেছেন জাতির পিতার হত্যাকারীদের ইনডেমনিটি, আর খালেদা জিয়া এসে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে তাদের ইনডেমনিটি দিয়ে গেছেন।

রোববার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৫তম শাহাদতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অংশ নেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করে দেয় খুনিরা। এই হত্যাকাণ্ডে সেদিন কর্নেল ফারুক, কর্নেল রশিদ, মেজর হুদা, মেজর ডালিম, মেজর শাহারিয়ার, মেজর পাশা, মাজেদ, মহিউদ্দিন, মোসলেউদ্দিন, রাশেদ ও খায়রুজ্জামানসহ সবাই জড়িত ছিল। কিন্তু এই সামরিক অফিসারদের কারা ও কে মদদ দিয়েছিল, তাদের পেছনে কারা ছিল? বঙ্গবন্ধুর কেবিনেটের একজন মন্ত্রী তার উচ্চাভিলাস আর সহযোগী জিয়াউর রহমান, যিনি একজন মেজর ছিলেন।

তিনি বলেন, জাতির পিতা জিয়াকে প্রমোশন দিয়ে মেজর জেনারেল বানিয়েছিলেন। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে জড়িত ছিলেন। সেটার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়- এই হত্যাকাণ্ডের পর বিবিসিতে কর্নেল ফারম্নক এবং কর্নেল রশিদ তারা একটি ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে। যেখানে তারা স্পষ্ট বলেন যে, তাদের সঙ্গে জিয়াউর রহমান সম্পূর্ণভাবে জড়িত ছিলেন। তার মদদেই তারা এই ঘটনা ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল। সেটা আরও প্রমাণ হয় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেখানে সংবিধান মানা হয়নি। ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। কিন্তু সেখানে তিনি রাষ্ট্রপতি হননি, রাষ্ট্রপতি ঘোষিত হলো খন্দকার মোশতাক। আর খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হয়েই জেনারেল জিয়াকে বানালেন সেনাবাহিনীর প্রধান। জেনারেল জিয়া যদি এই ষড়যন্ত্রে মোশতাকের সঙ্গে সম্পৃক্ত নাই থাকবেন- তাহলে কেন মোশতাক তাকেই বেছে নেবেন সেনাপ্রধান হিসেবে?

শেখ হাসিনা বলেন, তারপর খুনিদের সব ধরনের মদদ দেওয়া, এটাতো জিয়াউর রহমানই দিয়েছেন। এখানেই তাদের শেষ নয়। মোশতাক, বেঈমানরা কখনো ক্ষমতায় থাকতে পারে না। মীর জাফর পারেনি। মীর জাফরকে যারা ব্যবহার করেছে সিরাজ উদ্দৌলাকে হত্যা করতে, সেই মীর জাফরও দুই মাসের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। ঠিক মোশতাকও পারেননি। মোশতাককে হটিয়ে জিয়াউর রহমান নিজেকে নিজেই ঘোষণা দিয়েছিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে।

তিনি বলেন, এই খুনিরা যারা শুধু ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডই ঘটায়নি, ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার নেতার হত্যাকাণ্ড ঘটায়- তাদের বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া, রাজনৈতিক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা এবং বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে জিয়াউর রহমান খুনিদের পুরস্কৃত করেন। ১৫ আগস্টের খুনিদের হত্যার বিচার হবে না- সেই ইনডেমনিটি অর্ডিনেন্সও জারি করা হয়। তাদের বিচারের পথ বন্ধ করা হয়। আমরা যারা আপনজন হারিয়েছি আমাদের মামলা করার অধিকার ছিল না, বিচার করারও অধিকার ছিল না।

তিনি বলেন, খুনিদের বিচার বন্ধ করা, তাদের ব্যাংকক হয়ে লিবিয়া পাঠানোসহ সব কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে জিয়াউর রহমান এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় ছিলেন। আর কর্নেল বেগ জিয়াউর রহমানকে চিঠি দিয়ে তাকে নতুন কাজ দেয়ার কথা বলেছিলেন। এটা ১৫ আগস্টের এই হত্যাকাণ্ডের অ্যাসাইনমেন্ট কি-না?

এ প্রসঙ্গে জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জিয়া মুক্তিযাদ্ধা ছিলেন। তবে তার সঙ্গে পাকিস্তানের যোগাযোগ ছিলো। তাই জিয়া ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার আইন করে বন্ধ রেখেছেন এবং পাকিস্তানি মদদদাতা আলবদর-রাজাকার আলশামসদের মন্ত্রী-উপদেষ্টা করে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, উচ্চআদালত সামরিক শাসনামলের অর্ডিনেন্স বাতিল করে দেশকে অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করেছেন। দেশের মানুষের মধ্যে আবারও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরে এসেছে।

১৫ আগষ্টের নৃশংস হত্যাযজ্ঞে তার বাবা বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের সদস্যদের হারানোর বেদনাময় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘৭৫ এর পর আমি আর রেহানা বিদেশে ছিলাম। ঘাতকের নির্মম বুলেটে যারা আপনজন হারিয়েছিল অনেকে দেশে থাকতে পারেননি। এই হত্যার পর ওই পরশ তাপসকে খুঁজে বেড়ানো হয়েছে। কারা কারা বেঁচে আছে তাদের খুঁজে বেড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সকলেই গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতের মাটিতে। রিফিউজি হিসেবে আমাদের থাকতে হয়েছিল। এমনকি আমরা আমাদের নিজেদের নামটাও ব্যবহার করতে পারিনি। একদিকে আপনজন সব হারিয়েছি, একদিনের মধ্যে সব শেষ। আরেকদিকে রিফিউজি হিসেবে আমাদের থাকতে হয়েছে। আমরা যখন রিফিউজি হিসেবে থেকেছি বিদেশের মাটিতে অবস্থান করে আর ঘাতকের দল তখন বিভিন্ন দূতাবাসে রাষ্ট্রদূতের চাকরি পেয়ে বা দূতাবাসে বিভিন্ন সরকারি চাকরি পেয়ে তারা আরাম আয়েশে জীবন যাপন করেন। সেটাও আমাদের দেখতে হয়েছে। অথচ এই দেশ স্বাধীন করে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৮০ সালে আমি লন্ডনে যাই। রেহানা তার আগেই লন্ডনে গিয়েছিল। ৮০ সালের ১৬ আগস্ট আমরা লন্ডনে এই হত্যার প্রতিবাদে সভা করি। তখন সেখানে স্যার টমাস ইউলিয়াম কিউসি এমপি এবং নভেল লরেট শন ম্যাক ব্রাইট তাদেরকে নিয়ে একটা আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। সেদিনই সেই তদন্ত কমিশনের ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রবাসী বাংলাদেশীদের সহযোগিতায় সেই তদন্ত কমিশনের প্রতিনিধি হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার তদন্তেরর জন্য পাঠানো হয়। বৃটিশ এমপি অনেকে তখন আমাদের সহযোগিতা করেন। কিন্তু টমাস উইলিয়াম যখন ভিসা চান, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তখন কিন্তু তাকে ভিসা দেননি। জিয়াউর রহমান কেন ভিসা দিলেন না? কেন তদন্ত করতে দিলেন না? এই প্রশ্নটা থেকে যায়। কারণ খুনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে জিয়া ভয়ে ভীত ছিলেন। সেই কারণে তদন্ত করতে দেননি তিনি।’

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পাঁচ বছরে অত্যাচার-নির্যাতন ও হত্যা এবং দুঃশাসনের বিবরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবরের নির্বাচন ছিল একটা প্রহসনের নির্বাচন। সেই নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে বিএনপি মানুষ হত্যা শুরু করে। খুলনায় যুবলীগের মাসুম, যিনি শেখ হেলালের আপন মামাতো ভাই ছিলেন- তাকে যেভাবে অত্যাচার-নির্যাতন করেছিল! তাতে শেষে তার মৃত্যু হয়। এরকম শত শত লোককে হত্যা করে তারা।

তিনি বলেন, বলেন, ‘আওয়ামী লীগের রিসার্স সেন্টার দখল করে নেয় তারা। ১৫টি কম্পিউটার, বই, তিনশ’ ফাইল, নগদ টাকা- সব কিছু লুট করে সিল করে দেয়। যেন আমরা সেখানে বসে কাজ করতে না পারি। একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর পথ পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে।’

খালেদা জিয়া অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইনডেমনিটি দিয়েছিলেন- এমন অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অপারেশন ক্লিন হার্টের নামে যত্রতত্র যেখানে সেখানে মানুষকে ধরে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে যুবলীগের কর্মী যাকে যেখানে পেয়েছে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। আর সেই হত্যার বিচার হবে না। কারণ সেই ইনডেমনিটিও খালেদা জিয়া দিয়ে গেছেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ত্যাগের আদর্শে দেশের জন্য কাজ করার জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করা জাতির পিতার কাছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অঙ্গিকার।

সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আরও বক্তব্য দেনআওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, কেন্দ্রীয় নেতা আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী প্রমুখ। পরিচালনা করেন দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ।