আছে শুধু প্রিয় পুতুল


310 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
আছে শুধু প্রিয় পুতুল
সেপ্টেম্বর ১, ২০১৮ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

ছোট্ট আকিফা একাই মাতিয়ে রাখত পুরো পরিবার। কেউ হাত বাড়ালেই তার কোলে উঠে পড়ত। মুখে হাসি থাকত সবসময়। তার খেলার সাথী ছিল দুই ভাইবোন। ছিল একটি পুতুলও, তা ছিল আকিফার খুব প্রিয়। সেটি চোখের আড়াল হতে দিত না। সেই পুতুলটি এখন পড়ে আছে খাটের এক কোনায়। অন্যান্য খেলনাও রয়েছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। কিন্তু নেই আকিফা। আর কখনও সে পুতুল খেলবে না। কারণ বাস তার প্রাণপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে একটি পরিবারে নেমে এসেছে অন্ধকার। শোকে কাতর তার বাবা-মা ও ভাইবোনসহ স্বজনরা। কুষ্টিয়ার চৌড়হাসে তাদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। আকিফার মৃত্যুর ঘটনা সারাদেশ নাড়িয়ে দিলেও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিবিদদের কেউই তার পরিবারের পাশে দাঁড়াননি।
এদিকে ওই বাসটির চালককে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। জব্দ করা হয়নি বাসটিও। বৃহস্পতিবার রাতে নিহত আকিফার বাবা হারুন অর রশিদ চালক খোকন, সুপারভাইজর ইউনুছ মাস্টার ও বাসটির মালিক জয়নাল আবেদীনকে আসামি করে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা করেন। খোকন ও জয়নালের বাড়ি ফরিদপুরে দেখানো হলেও তাদের আর কোনো পরিচয় সেখানে নেই। এমনকি মামলায় গ্রামের নাম-ঠিকানাও উল্লেখ নেই। মামলায় ৩০৪ ধারা ছাড়াও ২৭৯, ৩৩৮ ধারা রয়েছে।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি নাসির উদ্দিন বলেন, বাসের মালিকের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে। গাড়িসহ চালক ও সুপারভাইজরকে নিয়ে তাকে হাজির হতে বলা হয়েছে। অন্যথায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও বাস মালিককে জানানো হয়েছে।
হারুন অর রশিদের বাড়ি কুষ্টিয়ার চৌড়হাসে। তিনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। গরু-ছাগলের খাদ্য বিক্রি করেন। তার দুই মেয়ে এক ছেলে। আট মাসের আকিফা খাতুন ছিল সবার ছোট। বড় ছেলে রুহুল আমিন সিদ্দিক নবম শ্রেণি এবং আরেক মেয়ে সুরাইয়া খাতুন রানী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে তার স্ত্রী রীনা খাতুন মেয়ে আকিফাকে কোলে নিয়ে পোড়াদহে যাওয়ার উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন। রাস্তার একপাশে ফয়সাল গঞ্জেরাজ পরিবহনের একটি বাস থামিয়ে যাত্রী তুলছিল। এ সময় তিনি রাস্তা পার হচ্ছিলেন। রাস্তার অর্ধেক পার হয়ে বাসটির সামনে দিয়ে ফুটপাতে উঠার আগেই, দাঁড়িয়ে থাকা বাসটি চালাতে শুরু করেন চালক। বাসটির ধাক্কায় রীনার কোল থেকে আকিফা ছিটকে পড়ে রাস্তার ওপর। রানীও পড়ে যান। তাদের উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য ওইদিনই আকিফাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
গতকাল শুক্রবার সকালে আকিফাদের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িতে নীরবতা। ঘরের ভেতরে শুধু কান্নার শব্দ। বাইরে আকিফার কয়েকজন চাচা দাঁড়িয়ে আছেন। বাইরে খেলছে শিশুরা। পারিবারিক সূত্র জানায়, হারুন অর রশিদরা পাঁচ ভাই। ভাইয়ের মধ্যে হারুন সবার ছোট। বছরখানেক আগে তার মা-বাবা মারা যান। মা-বাবাকে হারিয়ে সবাই যখন শোকে কাতর তখনই জন্ম নেয় আকিফা। পরিবারের ছোট এই সদস্যকে পেয়ে সব শোক কাটিয়ে সবাই খুশিতে মেঠে ওঠেন।
আকিফার এক চাচা জানান, মেয়েটি সবে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে শিখেছিল। অনেক দিন পরে আমাদের পরিবারে নতুন সদস্য আসায় সে সবার কাছ থেকে একটু বাড়তি স্নেহ ও ভালোবাসা পেত। তবে একটি সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের সবার ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছে। শোক নেমে এসেছে বাড়িটিতে।
আকিফাদের ঘরে ঢুকে দেখা যায়, বাইরের ঘরে রীনা খাতুন বসে আছেন। তাকে ঘিরে বসে আছেন স্বজনসহ প্রতিবেশীরা। অঝোরে কাঁদছেন। গত কয়েকদিন দানা-পানিও মুখে দেননি। ঘরের ভেতর সব কিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ভেতরে যে কক্ষে আকিফাকে নিয়ে মা-বাবা থাকতেন সেখানে গিয়ে দেখা যায়, যে পুতুলটি পাশে বসিয়ে ছবি তুলেছে আকিফা তা চিত হয়ে খাটের এক কোনায় পড়ে আছে। তার পোশাকও পড়ে আছে খাটের ওপর। আকিফার বড় বোন সুরাইয়া খাতুন রানী বলে, আমার দাদা-দাদি মারা গেছেন কিছুদিন আগে। দাদা-দাদিকে হারানোর পর আকিফার জন্ম হয়। সে আমাদের সবার প্রিয় ছিল। সবাই তাকে ভালোবাসত। আমাদের মতো বোনহারা যেন কেউ না হয়। সুরাইয়া যখন কথা বলছিল তখন রীনা খাতুন খাটে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি ঘাতকদের বিচার চাই, কঠোর বিচার।’
আকিফার বাবা হারুন বলেন, মেয়েকে হারিয়েছি, আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই আবেদন- ঘাতকদের যেন কঠোর বিচার হয়। তিনজনের নামে মামলা করেছি। পুলিশ এখনও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। আশা করছি, তারা দ্রুত গ্রেফতার হবে।
চৌড়হাস মোড়ে যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেখান থেকে হারুনের বাড়ি আনুমানিক ১০০ গজ দূরে। একটি জুয়েলারি দোকানের সামনে গাছে দুটি সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। বাসটি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তার ঠিক সামনের গাছে এ ক্যামেরা বসানো ছিল। এই ক্যামেরায় ধরা পড়ে দুর্ঘটনার দৃশ্য। সেই দৃশ্য ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। দেশজুড়ে চালকসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি ওঠে।
সরেজমিন দেখা যায়, আকিফাদের বাড়ির সামনেই একটি আন্তঃজেলা বাসের কাউন্টার রয়েছে। এখানে এসে বিভিন্ন জেলার বাস দাঁড়ায়। তবে কাউন্টারের উল্টো দিকে সড়কের পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখে ফয়সাল গঞ্জেরাজ নামের একটি বাস। যেটি রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসে। গন্তব্য ছিল ফরিদপুর। কাউন্টারের কর্মী রাজীব জানান, গঞ্জেরাজ পরিবহনটি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেটি বাস দাঁড়ানোর জায়গা নয়। অবৈধভাবেই গাড়িটি পার্ক করা ছিল। ঘটনার দিন তিনি কাউন্টারে ছিলেন। দাঁড়িয়ে থাকা বাসটি হর্ন না দিয়েই চালানো শুরু করে চালক। আর বাসটির ধাক্কায় কোল থেকে রাস্তার ওপর ছিটকে পড়ে শিশুটি। রীনাও ছিটকে পড়েন রাস্তার পাশে। রাজীব বলেন, গাড়ি ছাড়ার আগে চারপাশ দেখার কথা চালকের। এ ছাড়া হেলপারও থাকে সামনে-পেছনে দেখার জন্য। কিন্তু কোনো কিছু খেয়াল না করেই বাসটি ছাড়া হয়।
অবৈধ বাসস্ট্যান্ড ও গঞ্জেরাজ পরিবহনে নানা অনিয়ম :গঞ্জেরাজ পরিবহনের প্রথম মালিক ছিলেন ফরিদপুরের মামুন নামের এক ব্যক্তি। ১৫ থেকে ২০ দিন আগে রাজশাহীর এক ব্যক্তি তার কাছ থেকে রুট পারমিট ও বাস কিনে নেয়। এরপর গঞ্জেরাজ নামে আরও কয়েকটি বাস রাস্তায় নামান পৃথক মালিক। মামুন বলেন, আগে গঞ্জেরাজ নামে পরিবহন ব্যবসা করতাম। তা বিক্রি করে দিয়েছি। এখন তিন-চার ব্যক্তি এ নামে বাস চালায়।
এ ছাড়া গতকাল মজমপুর গেটে ট্রাফিক পুলিশ মিম গঞ্জেরাজ নামে একটি বাস আটক করে। সেটির রুট পারমিট ফরিদপুর থেকে পাবনা পর্যন্ত, অথচ সেটি চলছিল রাজশাহী পর্যন্ত। রুট পারমিট না থাকায় এ পরিবহনকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করে ট্রাফিক পুলিশ।
ট্রাফিক পরিদর্শক ফখরুল ইসলাম বলেন, গঞ্জেরাজ নাম দিয়ে বিভিন্ন মালিক বাস চালাচ্ছে। এ রুটে তাদের বেশ কয়েকটি বাস চলছে। একটি বাসের রুট পারমিট ঠিক না থাকায় জরিমানা করা হয়েছে। অন্য বাসগুলোও আটক করে কাগজপত্র ঠিক আছে কি-না দেখা হবে। তবে গত কয়েকদিন এ পবিহনের বাস ভয়ে কুষ্টিয়া আসছে না।
কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী রুটের যাত্রীদের তোলার জন্য চৌড়হাস এলাকায় বাস টার্মিনাল আছে। তবে টার্মিনাল থেকে যাত্রী না উঠিয়ে চৌড়হাস মোড়ে রাস্তার ওপর বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা হয়। অবৈধভাবে পার্ক করে যাত্রী তোলা হলেও ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ এ বিষয়ে নিশ্চুপ রয়েছে। এ কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।
আকিফার পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি কেউ : আকিফার চাচা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, এত বড় ঘটনার পর সারাদেশের মানুষ যেখানে সমবেদনা জানাচ্ছে, সেখানে জেলার যারা কর্ণধার তারা একটিবারও আমাদের বাড়িতে আসেনি। বিষয়টিতে আমরা হতাশ।
এদিকে বৃহস্পতিবার রাতেই স্থানীয় কবরস্থানে আকিফার লাশ দাফন করা হয়। গতকাল বাদ জুমা চৌড়হাস জামে মসজিদে জুমার নামাজ শেষে মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পরিবার।