আজ বিশ্ব বাঘ দিবস । “আসুন সকলে মিলে আমরা বাঘ বাঁচাই, প্রকৃতি বাঁচাই।”


740 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
আজ বিশ্ব বাঘ দিবস । “আসুন সকলে মিলে আমরা বাঘ বাঁচাই, প্রকৃতি বাঁচাই।”
জুলাই ২৯, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি শ্যামনগর
Print Friendly, PDF & Email

এম কামরুজ্জামান :
আজ ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস। প্রতিবারের ন্যায় ঘটা করেই দিবসটি পালন করা হবে। পশ্চিম সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের আয়োজনে মুন্সিগঞ্জ টাইগার পয়েন্টে বন বিভাগের বড় কর্তাদের মধ্যে উপস্থিত থাকবেন বন্য প্রাণী ও জীব বৈচিত্র সংরক্ষণ কর্মকর্তা জনাব জাহিদুল ইসলাম, বন সংরক্ষণ খুলনা অঞ্চলের ড. সুনীল কুমার কুন্ডু সহ বন বিভাগের কর্মকর্তারা এবং এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতি ঘটবে। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জগলুল হায়দার।
এবছর বাঘ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হল “বাঘ বাঁচলে, বাঁচবে বন, রক্ষা হবে সুন্দরবন” এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ উদযাপিত হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‌্যালী ও আলোচনা সভার আয়োজন ও থাকবে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বনরক্ষক এস এম শোয়াইব খানের সভাপতিত্বে প্রতিপাদ্য বিষয়ের উপরে আলোচনায় অংশ নেবেন বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম। যাকে উদ্দেশ্য করে এত ঘটা করে দিবসটি উদযাপন করা হবে তার বর্তমান সার্বিক অবস্থা নিয়ে একটু বলা যাক- পৃথিবীর অনেক দেশে যেমন- বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, রাশিয়া, মালয়েশিয়া, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া ও চীনে বাঘ পাওয়া যায়। তবে এসব দেশে ৪-৫ প্রজাতির বাঘ পাওয়া গেলেও সুন্দরবনের মত এত হিংস্র, বলবান দৃশ্যধারী বিশালকার, শক্তিশালী ভয়ংকর মুর্তির বন্য জন্তু আর কোথাও দেখাযায় কিনা সন্দেহ। এজন্য সুন্দরবনের বাঘকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার নামে অবিহিত করা হয়েছে। সুন্দরবনের অতন্ত্র প্রহরী এবং সুন্দবনে স্থলচর জন্তুর মধ্যে বাঘই সর্ব প্রধান। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য যে, সুন্দরবনের এ অমুল্য সম্পদ বিশ্বসেরা প্রাণী আজ বিপন্ন হতে চলেছে। নানান প্রতিকুলতায় এ প্রাণীটির আর নিরাপদ আশ্রয় বাংলাদেশের সুন্দরবনে নেই। আর একারনেই বাংলাদেশের সুন্দরবন হারাতে বসেছে বিশ্ব ঐতিহ্যের ম্যানগ্রোভের সুনামটি।  বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা নিরূপনে বিভিন্ন সময়ে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইউএনডিপি এর অর্থায়নে ইং-২০০৪ সালে বাঘ সুমারি করা হয়। যা বাঘের পায়ের ছাপ গননা করে বিশেষ উপায়ে বাঘের সংখ্যা নিরূপন করা হয়েছে। এ পদ্ধতি টি ছিল নিছক সনাতন পদ্ধতি। এ শুমারীতে সুন্দরবনের সব কয়টি বিভাগ মিলে ৪৪০টি বাঘের হিসাব দেওয়া হয়। এর মধ্যে পুরুষ বাঘ ১২১টি স্ত্রী বাঘ-২৯৮টি, বাচ্চা বাঘ ২১টি। দীর্ঘ ১০ বছর পর ক্যামেরা পদ্ধতিতে বন বিভাগ পরিচালিত জরিপে ১০৬টি বাঘের অস্তিত্ব মিলেছে। ২০০৪ সালের জরিপ কারও কারও মতে সোনাতন পদ্ধতি হলেও এ হিসাবটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নির্বিচারে বাঘ নিধনের কারণে ১০ বছরের পর এসে বাঘের সংখ্যা কমতে কমতে আজ এখানে এসে পৌছিয়েছে। যদিও বন বিভাগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বর্তমান বাঘ শুমারীর কথা প্রকাশ করা হয়নি তবুও বন বিভাগের একাধিক তথ্য থেকে  ১০৬ টি বাঘের হিসাব আপাতত দৃষ্টিতে সঠিক বলে জানাগেছে। বিশেজ্ঞদের মতে বাঘ গননায় এবার যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে তা পূর্বের পদ্ধতির চাইতে আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য এবং এ তথ্যের বাস্তবতা আছে। ভারতের বন্যপ্রাণী গবেষনা ইনিষ্টিটিউটের প্রফেসার ও ওয়াইভি ঝালা ক্যামেরা পদ্ধতিতে বাঘ জরিপের হিসাবটি গ্রহণ যোগ্যবলে মন্তব্য করেছেন। বন বিভাগ সূত্রে জানাযায়, ইং ২০১৩ সাল থেকে ২দফা বিরতীতে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রায় ১২মাস এ ক্যামেরা পদ্ধতিতে জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে পুরুষ, স্ত্রী ও বাচ্চা বাঘ মিলে ১০৬টি বাঘের হিসাব পাওয়া গেছে। সুন্দরবনের মোট আয়তনের ৬৭ শতাংশ বাংলাদেশ অংশে এবং বাকী ৩৩শতাংশ ভারতের অংশে। বাংলাদেশ অংশে এত বেশী আয়তন থাকা সত্ত্বেও বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকল। এবং এতেই প্রতীয়মান হয় যে, কি পরিমাণ নির্যাতন ও অত্যাচার আমরা সুন্দরবনের বন্য প্রাণীর উপর করে চলেছি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ বিশেষ্ণ মনিরুল খান ভয়েস অব স্তকাষীরা ডটকমকে জানান, যেটাই আশংকা করা হয়েছিল ক্যামেরা পদ্ধতিতে বর্তমান জরিপে তারই প্রতিফলন ঘটল। তিনি আরও জানান, নির্বিচারে বাঘ নিধন চলছে সুন্দরবনে। এক শ্রেণীর অসাধু চক্র এ বাঘ নিধনযজ্ঞে মত্ত হয়ে পড়েছে। যার ফলে এ প্রাণীটি আজ বিলুপ্তির পথে। যাকে নিয়ে আজকের এত আড়ম্বর তাকে রক্ষায় নেই কোন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষ্ণরা মন্তব্য করেন, বন্য প্রাণী রক্ষায় যদি সরকারের পক্ষ থেকে উপযুক্ত পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তবে সেদিন বেশী দুরে নয় বাঘ সুন্দরবন থেকে বিলুপ্ত হবে।  আর বাঘ দিবস উদযাপন হবে শুধু মাত্র লোক দেখানোর জন্য।
বাংলাদেশেরে সুন্দরবনে মাত্র ১০৬টি বাঘ রয়েছে বলে সম্প্রতি তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, যা এক দশক আগের সংখ্যার চার ভাগের একভাগ।
খাবার সংকট রোধে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত টহলের মাধ্যমে বাঘ ও হরিণসহ অন্যান্য প্রাণী হত্যা ও পাচার বন্ধে কোন বিকল্প নেই বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
বাঘ-মানুষ দ্বন্দের বিষয়ে বন অধিদপ্তরের বন সংক্ষক (বণ্যপ্রাণী অঞ্চল) তপন কুমার দে জানান, প্রতি বছর গড়ে ৩০ থেকে ৫০ জন মানুষ বাঘের আক্রমণে মারা যায়। আর গড়ে দু’তিনটি বাঘ লোকালয়ে এসে মানুষের হাতে মারা পড়ে।
গত ১৫ বছরে বাঘের আক্রমণে মানুষ মারা গেছে ৩২৮ জন। এসময় মানুষের হাতে বাঘ মারা পড়েছে ৩০টি। আরও ১৩টি বাঘ বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছে বলে জানান এ বন কর্মকর্তা।
তবে গত তিন বছরে বাঘ-মানুষের এ দ্বন্দ্ব কমেছে বলে দাবি করছে বন অধিদপ্তর।
“বিশেষ করে ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে লোকালয়ে চলে আসা কোনো বাঘ মারা যায়নি। বাঘের আক্রমণে কমেছে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনাও। তবে চোরা শিকারীর উৎপাত বেড়েছে,” বলেন তপন দে।
তিনি জানান, বন্যপ্রাণীর আক্রমণে ক্ষতিপূরণ নীতিমালার আলোকে এ পর্যন্ত নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং আহত ব্যক্তির পরিবারকে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
মানুষের মধ্যে সচেতনতাও তৈরি হয়েছে বলেও স্বস্তি প্রকাশ করেন তিনি।
বেসরকারি সংস্থা ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম ভয়েস অব স্তকাষীরা ডটকমকে জানান, সুন্দরবনে চোরা শিকারির অন্যতম টার্গেট বাঘ-হরিণ দুটোই।
“বাঘের খাবার হরিণের সংখ্যাও কমছে, আবাস ছেড়ে বাঘ লোকালয়ে আসছে। বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টিও এর একটি কারণ।”
বেসরকারি হিসাব মতে, সুন্দরবনে মায়া হরিণ দুই হাজারের বেশি, বন্য শুকর ২৮ হাজার ও অর্ধ লক্ষাধিক বানর রয়েছে।
আনোয়ারুল বলেন, “সাম্প্রতিক কয়েক বছরে বাঘ কম মারা পড়ছে মানুষের হাতে। তার মানে বাঘ কম আসছে লোকালয়ে। বাঘ কমে যাওয়ার বিষয়টিও একটি কারণ হতে পারে। আবার লোকালয়ে এলেও মানুষ তাদের পাঠিয়ে দিতে পারে। কোনো কিছু নিয়ে সন্দেহ না রেখেই এখন কথাটি দাঁড়াচ্ছে-বাঘ বাঁচলেই সুন্দরবন বাঁচবে।”
১৯৭৫ সালের জরিপে (বুবার্ট হ্যান্ড্রিস) সুন্দরবনে ৩৫০টি বাঘের সংখ্যা নিরূপণ করা হয়। ১৯৮৪ সালের জরিপে (গিটিন্স ও আকন্দ) ৪৩০টি থেকে ৪৫০টি, ১৯৯২ সালে বন বিভাগের জরিপে ৩৫৯টি, ১৯৯৩ সালের পদচিহ্ন জরিপে (তামাংগ ও দে) ৩৬২টি, ২০০৪ সালের পাগমার্ক পদ্ধতির শুমারিতে (বন বিভাগ, ইউএনডিপি ও ভারতীয় বিশেষজ্ঞ) ৪৪০টি (২১ বাচ্চাসহ) ও ২০০৯ সালে রেডিও টেলিমেট্রি জরিপে (বন বিভাগ ও ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ) ৪০০টি থেকে ৪৫০টি বাঘ রয়েছে বলে ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
সর্বশেষ ২০১৩-২০১৫ সালের ক্যামেরা ট্র্যাপিং মেথডে (বন বিভাগ ও ওয়াইল্ডলাইফ ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়া) সুন্দরবনে গড়ে ১০৬টি (৮৩টি থেকে ১৩০টির মধ্যে বাঘ রয়েছে বলে তথ্য প্রকাশ করা হয়।
বাঘ কমে যাওয়া মানেই প্রাণীটির আবাস এখন সংকটে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
গত সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় ‘বিশ্ব বাঘ স্টকটেকিং সম্মেলনে’ বাঘ হত্যা ও বাঘের আবাসস্থল সঙ্কোচনের ফলে এই প্রাণীটি এখন বিলুপ্তির পথে বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, “আসুন সকলে মিলে আমরা বাঘ বাঁচাই, প্রকৃতি বাঁচাই।”