২৫মে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলার ৯বছর পূর্তি : প্রতাপ নগরের ৫শতাধিক পরিবার এখনও গৃহহীন


553 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
২৫মে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলার ৯বছর পূর্তি : প্রতাপ নগরের ৫শতাধিক পরিবার এখনও গৃহহীন
মে ২৪, ২০১৭ আশাশুনি ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

গোপাল কুমার, আশাশুনি ::

২৫ মে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলার ৯ বছর পূর্তি। ২০০৯ সালের এই দিনে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে লন্ডভন্ড হয়ে যায় দক্ষিণ জনপদের উপকূলীয় অঞ্চল। এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলাসহ সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকা। দেখতে দেখতে আইলার ৯ বছর পার হলেও এখনও ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আইলার ছোবলে ১১টি ইউনিয়নের মানুষ কমবেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অনেকে তাদের বাস গৃহে কোন রকমে জায়গা করে নিতে পারলেও প্রতাপনগর ইউনিয়নের ৫ শতাধিক পরিবার আজও গৃহহীন রয়ে গেছে।

প্রতাপনগরের ৫শ পরিবার এখনও সরকারি তহবিলের সহায়তা না পেয়ে বাঁধের ওপর বসবাস করছে। অভিশপ্ত এই দিনটির কথা মনে হলে আজও ভয়ে শিউরে ওঠেন উপকূলবাসী।

 

কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে আজও টিকে আছে এ অঞ্চলের অসহায় মানুষ। আইলার কারণে আশাশুনির উপজেলার অনেক এলাকা শ্রমজীবিরা হারিয়ে তাদের কর্মসংস্থা। কর্মসংস্থানের কোনও ব্যবস্থা না থাকায় মানুষের অভাব অনটন বেড়েই চলেছে।  শুধু ঘর-বাড়ি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা খাদ্য, সুপেয় পানি আর চিকিৎসা সেবাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত।

প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি শেখ জাকির হোসেন জানান, ৯ বছর কেটে গেলেও এখনও চাকলা, তেলেখালি, সুভন্দ্রকাটি গ্রামের প্রায় সাড়ে ৫শত এর অধিক পরিবার বেড়িবাঁধের ওপর বসবাস করছেন।

আইলায় তাদের ঘর-বাড়ি, জমি-জমা সব বিলীন হয়ে গেছে নদীতে। নিজস্ব কোনও জমি না থাকায় তারা সরকারের গৃহনির্মাণ তহবিলের সহায়তা পাননি।

এমনকি আজ পর্যন্ত তাদের কোনও খাস জমিও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। আইলার পর জরুরি ভিত্তিতে যেসব বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল, সেগুলো মানসম্মত না হওয়ায় জোয়ারের চাপ বা ভারী বর্ষণে বাঁধগুলো প্রতি বছরই ভেঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে নতুন করে মানুষ বাধভাঙ্গনের পড়ে জজরিত হচ্ছে।

এসকল এলাকা ঘুরে ও ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সাথে কথা বলেল জানান তাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া দীর্ঘ ৯টি বছরে দুঃখ দুর্দষার কথা। হাবিবুল্লার স্ত্রী শিল্পী খাতুন জানান তার ২ ছেলে ও ১ কন্যা দিয়ে অর্ধহারে অনাহারে দিন কাটছে তাদের।

কামরুল ইসলাম   ২ছেলে ২ মেয়ে তিনি জানান, কি আর কমু এইত বেচেঁ আছি সেই ভাল। মজিলা, খালেদা, মমতাজ বেগম, শফিকুল সরদার, আসাদুল ঢালী, সেলিম সরদার সহ আজও ৫শত এর অধিক পরিবার আশ্রয় হীন হয়ে নদীর বেড়ী বাধের উপর ২ চালা করে ঘরে বেধে বসবাস করে যাচ্ছে।

এসব এলাকার মানুষ দুর্যোগকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ঘুর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় গ্রহণ করে থাকেন। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর ধারণ ক্ষমতা অত্যন্ত কম। তিনি সরকারি প্রাথমিক ও মাদরাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি করে আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন।

চালকা এলাকার বেড়িবাঁধগুলো অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এর পক্ষ থেকে এ সকল বাঁধ সংস্কার করা হয়নি। হলেও সেটি দায়রা ভাবে সংস্কার করা হয়েছে। কর্মসূজন কমর্সসূচী ও স্বেচ্ছা শ্রমেএসব বাধ সংস্কার করা হচ্ছে।

তবে এসব বাঁধ ভেঙে আবারো প্রতানগর ইউনিয়ন সহ গোটা উপজেলার আশাশুনি সদর, শ্রীউলা, আনুলিয়া ইউনিয়ন লোনা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইলার জলোচ্ছ্বাসে খাবার পানির উৎস নষ্ট হয়ে যায়। গত ৯ বছরেও বিকল্প ব্যবস্থা না হওয়ায় বিশুদ্ধ পানির জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠী দারুণ কষ্টে রয়েছেন। তারা দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করছেন।

পরিকল্পনা মাফিক গভীর নলকূপ স্থাপন ও পুকুর সংস্কার করে পিএসএফ স্থাপন করা যায়নি এখনও। আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আজও সংস্কার হয়নি। দুর্যোগকালীন নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র নেই। উপজেলার অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলো এখনও পুরোপুরি সংস্কার সম্ভব হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ন প্রকল্প-২ সৃজনের মাধ্যমে বাস্তহারাদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া তিন বছর যাবত চালু হলেও তাদের ভাগ্যে অবহেলার ভূত চেপে বসেছে। আশ্রয়ন প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্য স্থান চরভরাটি ১৫ একর জমি দখলে রেখেছে এক ভূমিদস্যু।

আশ্রায়ন প্রল্পের আওতায় অবকাঠামো নির্মান সংক্রান্ত নকশা ও প্রাক্কলন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরন এবং অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের আদেশ হলেও কার্যকর না হওয়ায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশে নদীভাঙ্গনে ভূমিহীন পরিবারকে আশ্রয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পুনর্বাসনের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন।

বাস্তহারা মানুষ আবার আশায় বুক বাঁধতে শুরু করে। সে মোতাবেক ১৫৮নং চাকলা-তেলেখালি মৌজার এসএ- ১নং খাস খতিয়ানের ১১৬ ও ৯৩০ নং দাগের ১৫ একর চরভরাটি সম্পত্তির উপর আশ্রয়ন প্রকল্প-২ সৃজনের মাধ্যমে এসব গৃহহীন পরিবারগুলির পুনর্বাসন করার সম্ভাব্য জায়গা নির্ধারন করা হয়।

জেলা প্রশাসকের (এসএশাখা) কার্যালয় হতে ৩১.৪৪.৮৭০০. ০০৬.০৩.০০৬.১৬- ২৭৪ নং স্মারকে আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর ২৮/১২/১৫ তারিখে আশ্রয়ন প্রকল্প-২ সৃজন করে ২০১০ সালের ৬৬০ নং স্মারকের নীতিমালা/নির্দেশিকা অনুসরন করে প্রস্তাব প্রেরন করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়।

কিন্তু উক্ত ভূমিতে আগে থেকেই লবনচাষ প্রকল্পের সিদ্ধান্ত থাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তদন্ত সাপেক্ষে সেখানকার বাস্তব অবস্থা জানার জন্য সার্ভেয়ার মাহমুদুল আলমকে প্রেরন করেন।

তিনি সরেজমিন তদন্ত করে জানান, উক্ত সম্পত্তিতে বর্তমানে কোন লবন প্রকল্প নেই। সেখানে স্থানীয় ভূমিহীনরা একসনা ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করে যাচ্ছেন। উক্ত সম্পত্তি ভৌগলিক অবস্থা বিবেচনা করে সেখানে আশ্রয়ন প্রকল্প নির্মান করা যায় বলে তিনি মনে করেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সে মোতাবেক জেলাপ্রশাসক বরাবর প্রতিবেদন দাখির করেন। কিন্তু একই দপ্তরে ভূমি কর্মকর্তারা একটি বিপরীতমুখি প্রতিবেদন দাখিল করলে আশ্রয়ন প্রকল্পটির কাজ মুলত থেমে যায়।

এব্যাপারে ইউপি চেয়ারম্যান শেখ জাকির হোসেন এ প্রতিবেদককে জানান, উক্ত ১৫ একর সরকারি সম্পত্তি এলাকার ভূমি দস্যু বহু মামলার আসামী সোহরাব হোসেন (ভুয়া) মুক্তিযোদ্ধা নামধারী সামছুল হুদার নামে দীর্ঘ মেয়াদী ইজারা নেওয়ার পায়তারা চালাচ্ছে।

অথচ এই ইউনিয়নে সামছুল হুদা নামে কোনর মুক্তিযোদ্ধা নেই। তাছাড়া রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর সাতক্ষীরা মহোদয় পয়লা ফেব্রুয়ারী ১৭ তারিখে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশাশুনিকে উক্ত প্রকল্পটির অবৈধ দখলদার উচ্ছেদসহ ডিসিআর না দেওয়ার আদেশ করেন।

কিন্তু অজ্ঞাত কারণে উচ্ছেদ কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হওয়ায় জনমনে চরম হতাশা নেমে এসেছে। এ ব্যাপারে ক্ষতিগ্রস্থ পবিবার গুলো প্রধান মন্ত্রী হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
##