আপডেট ॥ সাতক্ষীরার শ্যামনগরে গাছে বেধে দুই শিশু নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে ধ্রুমজাল


550 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
আপডেট ॥ সাতক্ষীরার শ্যামনগরে গাছে বেধে দুই শিশু নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে ধ্রুমজাল
জুলাই ২৩, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি শ্যামনগর
Print Friendly, PDF & Email

বিশেষ প্রতিনিধি :
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমারি ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামে দুই শিশুকে বেঁধে রাখার ঘটনা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।বিভিন্ন গনমাধ্যমে যে ছবিটি প্রকাশিত হয়েছে তানিয়েও সৃষ্টি হয়েছে ধ্রুমজাল।কালিগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মীর মনির হোসেন ও শ্যামনগর থানার ওসি ইনামুল হক বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত নির্যাতনের ঘটনা এবং প্রত্রিকায় প্রকাশিত ছবিটি সঠিক বলে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন । কিন্তু বৃহস্পতিবার বিকেলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের দাবি, যে ছবিটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সে-টি সাজানো।যে গাছের সঙ্গে শিশু দু’টিকে বেধে রাখা হয়েছে সে-টি মামলার বাদির বাড়ির ভিতরের একটি গাছ। পুলিশের সরেজমিন তদন্তে বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।পুলিশ কর্তকর্তাদের পরস্পর বিরোধী এ ধরনের বক্তব্য নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া।আসলে পুলিশের কোন বক্তব্যটি সঠিক তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
সম্প্রতি শিশু রাজনকে নির্যাতন করে হত্যার ঘটনা নিয়ে সারাদেশ যখন স্বোচ্চার ঠিক তখন শ্যামনগরের পল্লীতে একই ভাবে দুই শিশু নির্যাতন কাহিনী গনমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় পর দেশবাসিকে রিতিমত হতবাক করেছে।
এদিকে, গ্রেফতারকৃত গোলাম মোস্তফার দাবি, শিশু দুটিকে সে দড়িদিয়ে বেধে রেখেছিল ঠিকই, কিন্তু গনমাধ্যমে যে ছবি প্রকাশিত হয়েছে তা সঠিক নয়। আদৌ সে কোন গাছের সঙ্গে শিশু দুটিকে বাধেনি। তিনি বলেন, আমার প্রতিপক্ষরা আমাকে ফাঁসানোর জন্য শিকল ও দড়িদিয়ে এভাবে শিশু দুটিকে গাছের সাথে পেঁচিয়ে ছবিটি সাজিয়ে তা সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করেছে।
শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়নের জয়নগরে গাছে বেঁধে দুই শিশুকে নির্যাতনের ঘটনায় নির্যাতনকারী মোস্তফাকে বুধবার বিকেলে আটক করেছে পুলিশ।এ ঘটনায় শ্যামনগর থানায় নির্যাতনের শিকার শিশু নাসির তরফতারের পিতা হামিদ তরফদার বাদি হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছে।বৃহস্পতিবার সকালে গ্রেফতারকৃত গোলাম মোস্তফাকে শ্যামনগর থানা পুলিশ আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করেছে।
মামলার এজহারভূক্ত আসামি গোলাম মোস্তফাকে বুধবার বিকেল ৩টার দিকে গ্রেফতার করা হয়।
গত ১৬ জুলাই এ ঘটনা ঘটলেও বুধবার বিষয়টি জানজানি হয়।
নির্যাতনের শিকার শিশুরা হলো- জয়নগর  গ্রামের ইসমাইল তরফদারের ছেলে ইয়াছিন (৮) ও হামিদ তরফদারের ছেলে নাছিম (৯)। এরা দু’জনেই তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। নির্যাতনকারী মোস্তফা ওই গ্রামের ইমরান আলী মোড়লের ছেলে।
মামলার বাদি জানায়, প্রতিবেশী মোস্তফার জায়গার উপর দিয়ে গড়ে ওঠা পায়ে হাঁটা রাস্তার উপর খেলছিল ইয়াছিন ও নাছিম। এ সময় বৃষ্টি শুরু হলে মোস্তফা তাদের বাড়ি চলে যেতে বলেন। কিন্তু তারা বাড়ি না গিয়ে সেখানে খেলা করায় রাস্তায় কাদা হয়ে যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মোস্তফা তাদের দু’জনকে একই গাছে বেঁধে তাদেরকে শারীরিক ভাবে নির্যাতন চালায়।
খবর পেয়ে ইয়াছিন ও নাছিমের অভিভাবকরা এগিয়ে এলে তাদেরও মারধর করতে উদ্যত হন মোস্তফা। এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এলাকাবাসি জানান, শিশু দুটিকে মোস্তফা বেধে রেখেছিল।পরে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে প্রথমে স্থানীয় ভাবে মিমাংসার চেষ্টা চালায় তারা। ঘটনার এক সপ্তাহ পর বিষয়টি স্থানীয় কতিপয় সাংবাদিকের মাধ্যমে পুলিশ খবর পায়। তারা কোন পক্ষই এনিয়ে মামলা করতে চাননি। পরবর্তীতে শ্যামনগর থানা পুলিশ বুধবার বিকেলে মোস্তফাকে আটক করে নিয়ে আসে। একই সাথে মামলার বাদি হামিদ তরফদারকে পুলিশ বাড়ি থেকে তুলে এনে তাকে দিয়েই এজহার দাখিল করিয়েছে।
আটক গোলাম মোস্তফা জানান, আমি তাদের দড়ি দিয়ে বেধে রেখেছিলাম সঠিকই ।কিন্তু এভাবে বেধে রাখার ঘটনা ঠিক নয়। আমি কোন গাছের সঙ্গে তাদেরকে বেধে রাখিনি। আমাকে ফাঁসাতে আমার প্রতিপক্ষরা এভাবে দড়ি ও শিকল দিয়ে বেধে রেখে আমার উপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে।
গ্রেপ্তারকৃত গোলাম মোস্তফা মোড়ল বৃহস্পতিবার সকাল ৯ টায় শ্যামনগর থানায় বসে জানান, ছেলে দুটো খুবই দুষ্টু। তার দেওয়া বেড়া তুলে ফেলে দেওয়ায় তিনি তাদের বেঁধে রেখেছিলেন। তবে নির্যাতন করেননি। গোলাম মোস্তফার বাড়িতে যেয়ে দেখা যায় ঘরে তালা ঝুলছে। কাউকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গলে শিশু নাছিম ও ইয়াসিন  তরফদারদের প্রতিবেশি রওশনারা বেগম জানান, ঘন্টাখানেক শিশু দুটিকে মোস্তফার বাড়িতে বেঁধে রাখা হয়েছিল। একই গ্রামের যুবক রেজাউল ইসলামও একই দাবি করেন।

কালিগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মীর মনির হোসেন জানান , জমিজমা নিয়ে আগে থেকেই তাদের মধ্যে বিরোধ ছিল। বেধে রাখার ঘটনাটি সঠিক প্রমানীত হলে শিশু ইয়াছিন ও নাছিমের নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।বুধবার সন্ধ্যায় ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমের সঙ্গে আলাপকালে এই পুলিশ কর্মকর্তা এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বুধবার স্থানীয় একটি পত্রিকায় শিশু দু’টির যে ছবি প্রকাশিত হয়েছে তা সঠিক।কোন কাল্পনিক বা সাজানো ছবি নয়।পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিটি তিনি দেখেছেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, পত্রিকার ছবি দেখেই তিনি ছবির সঠিকতা নিশ্চিত করছেন।

শ্যামনগর থানার ওসি ইনামুল হক জানান, এ ব্যাপারে নির্যাতনের শিকার শিশু নাসিরের পিতা হামিদ তরফদার বাদি হয়ে শ্যামনগর থানায় একটি মামলা করেছে।বুধবার রাতেই মামলাটি থানায় রেকর্ড করা হয়েছে। যার মামলা নং ৩৪। এই মামলার আসামি গোলাম মোস্তফাকে গ্রেফতদার করা হয়েছে।গাছে বেধে রাখার ঘটনা সঠিক।ছবিটি সাজানো কি-না বুধবার সন্ধ্যায় জানতে চাইলে তিনি ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, ঘটনার বিবরণ সঠিক এবং পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিটিও সঠিক। কোন সাজানো নয় বলে তিনি সে সময় বাদি করেন।
বৃহস্পতিবার বিভিন্ন গনমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন উঠছিল তখনও শ্যামনগর থানার ওসি ইনামুল হক সাংবাদিকদেরকে নিশ্চিত করেন নির্যাতনের ঘটনা এবং প্রত্রিকায় প্রকাশিত ছবি সঠিক।বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯ টায় ওসি ইনামুল হকের সাথে দ্বিতীয় দফায় তার সেল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, নির্যাতনের ঘটনা সত্য এবং পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিটি সঠিক।তিনি আরো জানান, বৃহস্পতিবার সকালে গ্রেফতারকৃত গোলাম মোস্তফাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।এ ব্যপারে রাতেই মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে, বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টায় সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মীর মো: মোদদাছছের হোসেন জানান, প্রাথমিক তদন্তে বেধে রাখার ঘটনা প্রমানিত হয়েছে। গ্রেফতারকৃত গোলাম মোস্তফা তাদের কাছে বেধে রাখার কথা স্বীকারও করেছেন।বিধায় যেভা্ই বেধে রাখুক না কেন এটি অপরাধের পর্যায় পড়ে।তবে বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিটি সাজানো বলে মনে হচ্ছে। কারণ যে গাছের সঙ্গে শিশু দু’টিকে বেধে রাখা হয়েছে সে-টি মামলার বাদির বাড়ির ভিতরের একটি গাছ বলে জানাগেছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিন গিয়ে এসব তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে।মোস্তফার বাড়িতে এ ধরনের কোন গাছ পাওয়া যায়নি। কালিগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার ও শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিন গিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, কি ভাবে এবং কারা এ ধরনের একটি সাজানো ছবি সাংবাদিকদের কাছে সহবরাহ করেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, গ্রেফতারকৃত মোস্তফাকে তিনি নিজে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।এ সময় মোস্তফা জানিয়েছে, দুই শিশুকে সে তার বাড়িতে নিয়ে বেধে রেখেছিল একথা সত্য। কিন্তু কোন গাছের সাথে তাদেরকে বেধে রাখা হয়নি।
সাংবাদিকদের কাছে সহকারী পুলিশ সুপার মীর মনির হোসেন এবং ওসি ইনামুল হক নির্যাতনের ঘটনা সত্য এবং পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিটিও সঠিক বললেন কি কারনে তা জানতে চাইলে, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, এ বিষয়টিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু সায়েদ মো: মনজুর আলম সরেজমিন পরিদর্শন শেষে বৃহস্পতিবার রাত ৮ টায় ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, মোস্তফা ওই দিন শিশু দু’টিকে তার বাড়িতে নিয়ে বেধে রেখেছিল এ ঘটনা সত্য। কিন্তু কোন গাছের সাথে তাদেরকে বেধে রাখা হয়নি বা তাদেরকে মারপিট করেনি।ঘটনার দিন সন্ধ্যায় বেধে রাখার ঘটনা নিয়ে শিশু দু’টির পরিবারের সদস্যরা মোস্তফাকে মারপিট করে।সে আহতও হয়। ওই দিন রাত সাড়ে ৮ টার দিকে মোস্তফাকে শ্যামনগর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।মোস্তফা এ নিয়ে মামলা করতে পারে এই আশংকায় শিশু দু’টির পরিবারের সদস্যরা তাদের বাড়ির ভিতর একটি গাছের সাথে এভাবে দড়ি ও শিকল দিয়ে বেধে রেখে ছবি উঠিয়ে তা সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করেছে বলে তিনি জানান।