আমার দেখা ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় “বুলবুল”


792 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
আমার দেখা ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় “বুলবুল”
নভেম্বর ১১, ২০১৯ জাতীয় দুুর্যোগ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ এম.কামরুজ্জামান ॥

সিডর ও আইলার মতো ভয়াবহ ঘুর্ণিঝড়ের সংবাদ সংগ্রহের পূর্বঅভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। কিন্তু ঘুর্ণিঝড় বুলবুলের সংবাদ সংগ্রহের অভিজ্ঞতাটা আমার কাছে একটু ভিন্ন। একজন গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে এতো কাছে থেকে আগে কখনো বুলবুলের মতো শক্তিশালী ঘুর্ণিঝড়ের সংবাদ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখেছি “বুলবুল” এর ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পেতে উকপূলীয় মানুষের আকুতি। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বয়েসের মানুষটিও ছুটে চলেছে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। দেখেছি অনেকেই বাড়ির গৃহপালিত পশু সাথে নিয়ে ছুটছে। আশ্রয় কেন্দ্র গুলোতে গরু,ছাগাল, হাঁস-মুরগির সাথে মানুষের বসবাস। যে দৃশ্য সব মানবিকতাকে হার মানাবে।
শুক্রবার সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে টেলিফোনে জানানো হলো বিকেল ৫ টায় ঘুর্ণিঝড় বুলবুলের প্রস্তুতি নিয়ে জেলা প্রশাসকের সভাকক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরী সভা। নির্ধারিত সময়ের কিছু আগেই সভাস্থলে হাজির হলাম। সভায় প্রস্তুতিমূলক নানা আলোচনা। কোন বিভাগের কি করনীয় তানিয়ে নানা সিদ্ধান্ত। একজন গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে সেখানে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেলাম। সভায় ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘুর্ণিঝড় সিডর, ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘুর্ণিঝড় আইলা এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালের ফনির অভিজ্ঞতার আলোকে ঘুর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় জরুরী ভাবে কি কি করনীয় তা বলার চেষ্টা করেছিলাম।

উপকূলবর্তী মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অনেক ধরনের গাফিলতি ইতোপূর্বে লক্ষ্য করা গেছে। বুলবুল আঘাত হানার আগে জানমাল রক্ষার্থে কি ধরনের জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায় তা নিয়ে কিছু সভায় পরামর্শও দিয়েছিলাম। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামালসহ সেখানে উপস্থিত সকলেই ঘুর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় কি ধরনের প্রস্তুতি নেয়া জরুরী তা জানবার আগ্রহের কোন কমতি ছিলনা।
সভায় আবহাওয়ার বরাত দিয়ে জানানো হলো, ঘুর্ণিঝড় বুলবুল শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে সুন্দরবন উপকূল অতিক্রম করবে। সিদ্ধান্ত হলো শনিবার বেলা ১১ টার মধ্যে সাতক্ষীরা উপকূলীয় সব মানুষকে ঘুর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে আনার। ওই সভায় মানুষের জান-মাল রক্ষায় সব ধরনের প্রস্তুতিও নেয়া হলো।

শনিবার সকালে সাতক্ষীরা থেকে সংবাদ সংগ্রহের জন্য রওনা হলাম শ্যামনগর উপকূলীয় এলাকার উদ্দেশ্যে। সকাল থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। বেলা ১২ টার দিকে শ্যামনগরের সুন্দরবন উপকূলবর্তী নীলডুমুরস্থ প্রমত্ত খোলপেটুয়া নদীর ঘাটে পৌছে গেলাম। নদীর ওপারে সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ বদ্বীপ গাবুরা ইউনিয়ন। এই বদ্বীপে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। যেয়ে দেখলাম কোষ্টগার্ড, সিপিপি, বিজিবি, নৌবাহিনীর সদস্যরা বেশ তৎপর। সেনা সদস্যরাও উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিতে পথে। গাবুরার মানুষজনকে নিরাপদে সরিয়ে আনতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে তারা। খোলপেটুয়া নদীর উত্তল ঢেউ উপেক্ষা করে নৌকাযোগে পার করে আনা হচ্ছে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়েসের মানুষকে। যাদেরকে উদ্ধার করে আনা হচ্ছে তাদের চোখে-মুখে আতংকের ছাপ। ঘুর্ণিঝড় বুলবুলের ভয়াল ছোবল থেকে প্রাণে বাঁচার আকুতি তাদের মধ্যে প্রবল। কেউ কোলের শিশুটি নিয়ে, কেউ বা বাড়ির হাঁস-মুরগি নিয়ে দলে দলে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছে।
আমারা কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী উত্তল খোলপেটুয়া নদী পার হয়ে গাবুরা এলাকায় গিয়ে দেখলাম স্থানীয় ঘুর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে বেশকিছু মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। যতোই বেলা গড়াচ্ছে আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে মানুষ ছুটছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম সন্ধ্যার আগেই আশ্রয় কেন্দ্র গুলো মানুষে ভরপুর। অনেক আশ্রয় কেন্দ্রে মানুষের পা রাখার জায়গা পর্যন্ত নেই।

সন্ধ্যার পরে কয়েকটি আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখলাম নারী,পুরষ, শিশু,বৃদ্ধ (গৃহপালিত পশু) গরু,ছাগল, হাঁস-মুরগি একই সাথে অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে বাঁচার আকুতি। কেই কারোপ্রতি কোন অভিযোগ নেই। সবার মধ্যে ঘুর্ণিঝড় বুলবুল আতংক। কোথাও বিদ্যুৎ নেই, চারিদিকে শাহশাহ অন্ধকার। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া আর বিদ্যুৎ চমকিয়ে প্রকৃতি যেনো জানান দিচ্ছে “বুলবুল” আসছে। রাত ২ টা পর্যন্ত থেমে থেমে ভারী ও মাঝারী বৃষ্টি। সেই সাথে দমকা হাওয়া।
আমরা কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী সুন্দরবন সংলগ্ন মুন্সিগঞ্জে বেসরকারি একটি সংস্থার গেষ্ট হাউজে রাতে অবস্থান নিলাম। গেষ্ট হাউজের তৃতীয় তলায় আমার থাকার ব্যবস্থা করা হলো। চারিদিকে গুমোট অন্ধকাল, শুধু শাহশাহ শব্দ। পত্রিকা অফিস গুলো থেকে ঘন্টায় ঘন্টায় খোঁজ নেয়া হচ্ছে সর্বশেষ অবস্থা। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায় বন্ধ। মাঝে মাঝে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে।
রাত প্রায় তিনটা। শক্তিশালী ঘুর্ণিঝড় বুলবুলের ভয়াল থাবা তখন শুরু। প্রবল শক্তি নিয়ে বুলবুল সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় আছড়ে পড়ছে। ভয়ানক একটি দৃশ্য যা ভাষায় বর্ণনা দিয়ে বুঝানো অসম্ভব। মনে হচ্ছে বিল্ডিং উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। টানা প্রায় ছয় ঘন্টা দুর্বিসহ জীবন কেটেছে সাতক্ষীরা উপকূলবর্তী প্রায় ছয় লাখ মানুষের। রোববার সকাল সাড়ে ৮ টার দিকে ঘুর্ণিঝড় বুলবুল দুর্বল হয়ে পড়ে।
বুলবুল দুর্বল হওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলকায় গিয়ে দেখাগেছে অসংখ্য গাছ উপড়ে পড়েছে। প্রতিটি এলাকার প্রায় সব কাঁচা ঘর ধ্বসে পড়েছে। মানুষ আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ির দিখে ছুটছে। বড় বড় গাছ বশত বাড়ির উপর উপড়ে পড়েছে। ঘরের শেষ সম্বল টুকুও যেনো শেষ। সড়কের উপর গাছ আর গাছ। রাস্তা দিয়ে পায়ে হেঁটে সামনের দিকে এগোনোর মতো পরিস্থিতি নেই। আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরে তাদের অনেকেই দেখে চিরচেনা বশত বাড়িটুকুও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তাদের আর্তনাদ, তাদের কান্না যেনো থামছে না। কে দেবে কার শান্তনা।
সময়ক্ষেপণ নয়, ঘুর্ণিঝড় বুলবুল আঘাত হানার পরপরি উপকূলীয় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ গুলো আবারও সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সংগ্রামে যেনো ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
ঘুর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় সাতক্ষীরা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। উপকূলবর্তী প্রায় ২ লাখ মানুষকে এবার নিরাপদে সরিয়ে আনতে স্বক্ষম হয়েছিলো তারা। বুলবুল আঘাত হানার আগেই প্রতিটি এলাকায় মানুষকে সচেতন করা হয়। আর এ কারণেই শক্তিশালী বুলবুলের আঘাতে মানুষের প্রাণহানির কোন ঘটনা ঘটেনি সাতক্ষীরায়।
প্রায় ২২ হাজার স্বেচ্ছাসেবক, কোষ্টগার্ড, নৌবাহিনী, সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি,সিপিপি,বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার স্বেচ্ছাসেবক সর্বপরি স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকার কারনে কোন ধরনের প্রাণহানী ছাড়াই বুলবুলের মতো শক্তিশালী ঘুর্ণিঝড় মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে। এই মুহুত্বে প্রয়োজন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুন:বাসনের জন্য জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণ।

#