আম্পানে লন্ডভন্ড সাতক্ষীরা জনপদ, নিহত ২


192 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
আম্পানে লন্ডভন্ড সাতক্ষীরা জনপদ, নিহত ২
মে ২১, ২০২০ দুুর্যোগ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ শাহিদুর রহমান (শাহিন) ॥

সুপার সাইক্লোন আমপানের আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে সাতক্ষীরা। কাচাপাকা ঘরবাড়ি পড়ে এবং শত শত বৃক্ষ উপড়ে সাতক্ষীরা এক ভুতুড়ে জনপদে পরিনত হয়েছে। বিদ্যুতের খুটি উপড়ে গেছে। বুধবার সন্ধ্যা থেকেই বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
এদিকে আমপানের তান্ডবে সুন্দরবন এলাকার শ্যামনগর, আশাশুনি, দেবহাটা, কালিগঞ্জ ও সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কমপক্ষে ২৫টি পয়েন্টে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাধ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এসব পয়েন্ট দিয়ে গ্রাম জনপদে রাতেই পানি ঢুকে পড়েছে। জোয়ারের সময় এই পানি আটকে থাকলেও ভাটায় কিছুটা নামতে শুরু করেছে। তবে আমাবস্যার প্রভাব না কাটা পর্যন্ত এমন অবস্থা থাকবে বলে গ্রামবাসী ধারনা করছেন। সাতক্ষীরা শহর ছাড়াও শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ , দেবহাটা এবং কলারোয়া উপজেলার পথে পথে কেবলই উপড়ে পড়া ছোটবড় গাছ। জনগনের সাথে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা যোগ দিয়ে এই গাছ কেটে সড়ক পরিস্কার করা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্থ বেড়িবাধ মেরামতে পানি উন্নয়ন বোর্ড জোরালো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সব এলাকার জনপ্রতিনিধি স্থানীয় জনগনকে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাধ মেরামতের কাজ করছেন। কিছু কিছু এলাকায় বাধ নির্মান করে পানি ঠেকানো গেলেও অনেক স্থানে তা সম্ভব হয়নি।
আম্পানের তান্ডবে উঠতি বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবজি ক্ষেত লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।আমের জন্য বিখ্যাত সাতক্ষীরা । সেই আম শিল্প ধবংস হয়েগেছে। প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমির চিংড়ি ঘের ভেসে গেছে। ২৫ কিলোমিটার ভেড়িবাধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আমপানে বুধবার রাতে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও বৃহস্পতিবার সকালে আরও একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এরা হলেন সাতক্ষীরা শহরের কামালনগরের করিমননেচ্ছা (৪০) । তিনি আম কুড়াতে গিয়ে গাছের ডাল ভেঙে চাপা পড়ে মারা যান। নিহত অপর ব্যক্তি হলেন মোঃ শামসুর রহমান(৫৫)। তিনি শহরতলীর বাঁকাল এলাকায় মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বাড়ি ফেরার সময় গাছচাপা পড়ে মারা যান।

আমপানের আঘাতে সাতক্ষীরার আমবাগানের সর্বনাশ ঘটেছে। কাচাপাকা ও আধাপাকা আম পড়ে সয়লাব হয়ে গেছে। একইসঙ্গে কাঠাল গাছ ভেঙে পড়ায় জৈষ্ঠ্যের এই ফলেরও সর্বনাশ ডেকে এনেছে আমপান। চাষীরা জানান, তাদের সারা বছরের পরিশ্রমের ফসলের মধ্যে ছিল মূহুর্তেই তা নষ্ট হয়ে গেল।
আমপানে সুন্দরবনের বিস্তীর্ন অঞ্চল লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। অনেক গাছপালা ভেঙে গেছে বলে দূর থেকে দৃশ্যমান হচ্ছে। এসময় কোন বন্য পশুর প্রানহানি ঘটেছে কিনা তা কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি।
ভয়াল আমপানের আঘাতে সাতক্ষীরার শতশত চিংড়ী ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে মৎস্য সম্পদ ঘের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে কেউ লাভবান হয়েছেন আবার কেউ মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী জানান, ঘন্টায় ১০০-১২০ কিলোমিটার গতিবেগে বিকেল ৪টার পর থেকে সুন্দরবন উপকুলে আম্পান আছড়ে পড়ে। এরপর সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২ টা পর্যন্ত ১৪৮ কিলোমিটার গতিবেগে পশ্চিম দিকে ঝড়ো হাওয়াটি জেলা শহরের ওপর আঘাত হানে।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ.ন.ম আবুজর গিফারী বলেন, শ্যামনগর উপজেলায় ২৫ কিলোমিটার ভেড়িবাধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩০ হাজার হেক্টর জমির চিংড়ি ঘের ভেসে কয়েক কোটি টাকার মাছ নষ্ট হয়েছে। ৫ হাজার গবাদি পশু মারা গেছে। ১৫ কিলোমিটার রাস্তা নষ্ট হয়েগেছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিবাশীষ চৌধুরী জানান, সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের স্থায়ীত্ব ছিল প্রায় ৫ ঘন্টাব্যাপী। হাজার হাজার গাছ উপড়ে পড়েছে। অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টিনের চাল উড়েগেছে।
আম্পনের কারনে নদীর পানি ৩ থেকে ৪ ফুট বৃদ্ধি পেয়ে নদীর প্রবল জোয়ারে মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের দাঁতনেখালি, দূর্গাবাটি, পদ্মপুকুর ও গাবুরার বেশ কয়েকটি পয়েন্টে ভেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। কয়েকটি স্থানে ওভারফ্লো হয়ে বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকে বিস্তির্ণ এলাকা প্লাবিত করে। কাঁচা ও টিনের ঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গাছ-গাছালি উপড়ে রাস্তা-ঘাট ও বাড়ী ঘরের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কন্ট্রোল রুম থেকে জানানো হয়েছে ১৪৫টি সাইক্লোন সেল্টার ও ১ হাজার ৭০০ টি স্কুল কলেজসহ আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ লাখ৭০ হাজার মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। জেলায় ১২ হাজার সেচ্ছাসেবকের পাশাপাশি ১০৩ জনের মেডিকেল টিম স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।
মরিচ্চাপসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি ২ থেকে ৩ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ও গাবুরা, মুন্সিগঞ্জ ও আশাশুনি উপজেলার দয়ারঘাট, হাজরাকাটি, কুড়িকাউনিয়া, মনিপুরি ও বিছট এলাকার ভেড়িবাঁধে ভয়াবহ ফাটল দেখা দিয়েছে।
আমপানের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল বলেন, আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। বিকাল ৫টায় তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত পরিসংখ্যান তৈরী করা সম্ভব হয়নি। রাতের দিকে সংবাদ সম্মেলন করে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব জানাতে পারবেন বলে জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার আমপানের তান্ডবের পরও সাতক্ষীরা দিনভর মেঘাচ্ছন্ন ছিলো। প্রকৃতিতে একরকম থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিলো। রাস্তাঘাট ছিলো জনশূন্য। দোকানপাট খুব কম সংখ্যায় খোল ছিলো।
আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আলিফ রেজা জানান, আশাশুনিতে ভেড়িবাধ ভেঙে প্রতাপনগর ইউনিয়নের পুরোটাই প্লাবিত হয়েছে। পুরো ইউনিয়নে এখন জোয়ার-ভাটা বইছে। সেখানে বহু মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। বাধ সংস্কারের কাজ চলছে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এম এস মোস্তফা কামাল জানান, আম্পানে জেলার সব কয়টি উপজেলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলাব্যাপী আম্পানের তান্ডব চলেছে। তবে কি পরিমান ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার সঠিক চিত্র জানার জন্য আরো সময় লাগবে। প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পাঠাতে বলা হয়েছে। তারা কাজ করছে। রাতের মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির রিপোর্ট পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।

#