আম্পান দুর্গত এলাকায় দীর্ঘমেয়াদী ত্রান সহায়তা ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ সংস্কারের দাবি


212 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
আম্পান দুর্গত এলাকায় দীর্ঘমেয়াদী ত্রান সহায়তা ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ সংস্কারের দাবি
ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২১ আশাশুনি জাতীয় দুুর্যোগ ফটো গ্যালারি শ্যামনগর
Print Friendly, PDF & Email

সাতক্ষীরায় আম্পান বিধ্বস্ত উপকূলীয় জনপদ ॥ আট মাসেও অনেকেই ঘরে ফিরতে পারেনি

এম কামরুজ্জামান, দুর্গত এলাকা থেকে ফিরে :


সুপার সাইক্লোন আম্পান আট মাস অতিবাহিত হয়েছে। আম্পান দুর্গত আশাশুনি উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এখনো নদীর জোয়ার ভাটার সাথে বসবাস করছে। আম্পান আঘাত হানান আট মাস অতিবাহিত হলেও বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধের অনেক জায়গা এখনো নির্মান করা সম্ভব হয়নি। ফলে আশাশুনি উপজেলার শ্রিউলা ও প্রতাপনগর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাঁধের উপর টোং ঘর বেধে শত শত পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। দুর্গত এসব এলাকায় খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট, শীত বস্ত্র নেই, বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যে দিনাতিপাত করছে দুর্গত মানুষগুলো। বশতভীটায় কবে তারা ফিরে যেতে পারবে তাও কেউ বলতে পারে না। অনেকের বশতভীটে ভেসেগেছে নদীর খরস্রোতে।


সুপার সাইক্লোন আম্পান গতবছর ২০ মে সাতক্ষীরায় শক্তিশালী রুপ নিয়ে আঘাতহানে। আম্পানে বিধ্বস্ত আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার দেড় লক্ষাধিক মানুষ এখনো নদীর জোয়ার ভাটার সাথে লড়াই করে বসবাস করছে। অনেকের একমাত্র আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীর বেড়িবাঁধ। কর্মহীন হয়ে পড়েছে অসংখ্য মানুষ। এক পরিসংখ্যানে জানাগেছে আইলা-সিডর থেকে শুরু করে সর্বশেষ আম্পানের ভয়াল ছোঁবলে ভীটে ছাড়া হয়ে অন্যত্রে অভিবাসি হয়েছে প্রায় সাড়ে ২২ হাজার মানুষ। অনেকেই কর্মের সন্ধানে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে চলেগেছে। আবার অনেকেই স্ত্রী-সন্তান ফেলে অন্য জেলায় চলে গিয়ে সেখানে দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছে। এমতবাস্থায় সাতক্ষীরা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে বাঁচাতে হলে অতিরিক্ত বরাদ্দের কথা ভাবতে হবে সরকারকে। মঙ্গাদুর্গতদের মতো উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্গত মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ত্রানের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষ্যে দেশের সাড়ে ৮ লাখ পরিবারের জন্য বশতঘর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় সাতক্ষীরা উপকূলীয় এলাকায় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত, গৃহহীন প্রতিটি মানুষের ঘরের ব্যবস্থা করার দাবি উঠেছে।
২০১০ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে সাতক্ষীরা জেলায় মোট জনসংখ্যা ১৯ লাখ ৮৫ হাজার ৯৫৯ জন, যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ লাখে। পরিবারের সংখ্যা ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৮৯০টি। ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী সাতক্ষীরা জেলার ৪৬.৩০ ভাগ মানুষ দরিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে। আর ২৯.০৭ ভাগ মানুষ অতিদরিদ্র। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে সাতক্ষীরা অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে দরিদ্র ও পিছিয়েপড়া জনগোষ্টি।


প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার ২২ লাখ মানুষকে রিতিমত হিমসিম খেতে হয়। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে সাতক্ষীরা জেলায় দরিদ্্র মানুষের সংখ্যা সব চেয়ে বেশি, অথচ সিডর-আইলা-বুলবুল-আম্পানের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় এ জেলার জন্য সরকারের অতিরিক্ত নেই কোন বরাদ্দ। সরকার মঙ্গা দুর্গত এলাকার মানুষকে বাঁচাতে সেখানে বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারের নেই কোন বিশেষ বরাদ্দ। ফলে সাতক্ষীরা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় নাকাল।
সাতক্ষীরা উপকূলবর্তী জেলা হওয়ায় প্রতিবছর এখানকার মানুষকে কোন না কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হয়। দুর্যোগপ্রবন জেলা হিসেবে চিহ্নিত সাতক্ষীরা। অথচ এ জেলায় সরকারের অতিরিক্ত কোন বরাদ্দ না থাকায় মানুষজন সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। নেই কোন বাড়তি সুযোগ-সুবিধা। দিন দিন দরিদ্র থেকে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে মানুষের আগামী ভবিষ্যত। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ এখনও মাজা সোজাকরে দাঁড়াতে পারেনি। একদিকে করোনার ভয়াল ছোঁবল, অন্যদিকে শক্তিশালী আম্পানের আঘাত। অনেক এলাকায় এখনও বেড়িবাঁধ সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। ফলে গ্রামের উপর দিয়ে নদীর জোয়ার-ভাটা প্রবাহিত হচ্ছে। রাস্তাঘাটের বেহালদশা, খানাখন্দে ভরা। অনেক এলাকায় রাস্তাঘাট নদীতে ধসে পড়েছে। দুর্গত এলাকায় চিকিৎসা, সুপেয় পানি ও খাদ্য সংকট লেগেই আছে। সবমিলিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাটছে দুর্বিসহ জীবন।


সম্প্রতি আশাশুনির দুর্গত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সেখানে এখনও বিধ্বস্ত অবস্থা। কৃষিজমি , মৎস্য ঘের নদীর জলের সাতে মিশে একাকার। কথা হয় শ্রিপুর গ্রামের গফফার গাজীর স্ত্রী শাহিনা খাতুন (৪০) এর সঙ্গে। তিনি বলেন, আম্পানের পর ধ্বসেপড়া বেঁড়িবাঁধ মেরামতের জন্য প্রায় এক সপ্তাহ তার স্বামী কাজ করেছে। কাজের বিনিময়ে সেসময় পৃথক ২টি স্লিপের মাধ্যমে স্থানীয় প্রতাপনগর ইউনিয়র পরিষদ থেকে ৮ জেকি করে মোট ১৬ কেজি চাল ছাড়া এ পর্যন্ত কোন সরকারি সাহায্য-সহায়তা তারা পাননি। এলাকায় কর্ম নেই। কাজের সন্ধানে স্বামী গফফার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে ৪ মাস আগে। বাড়িতে ঠিক মতো টাকা পাঠায় না। এখন শুনছি রংপুর গিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করে সেখানে ঘর-সংসার পেতেছে। ২ ছেলে ১ মেয়ে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে তাদের দিন কাটছে। কুড়িকাউনিয়া গ্রামের বেসরকারি স্কুল শিক্ষক ওলিউর রহমান (৫০) জানালেন, তার ওয়ার্ডে ( শ্রিপুর-কুড়িকাউনিয়া) সাড়ে ১১’শ পরিবারের বসবাস। আম্পানের পরে ১৭৫ পরিবার এলাকা ছেলে চলেগেছে। এরমধ্যে অনেকেই স্ত্রী, সন্তান ফেলে অন্য জেলায় গিয়ে বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছে। স্বামীরা প্রথম স্ত্রী, সন্তানদেরকে খোঁজ-খবর নিচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ছেলে-মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার অবস্থা নেই। গ্রামের ভিতর একস্থান থেকে অন্যস্থানে যেতে হলে একাধিক বাঁশের সাকো পার হয়ে যেতে হয়। রাস্তাঘাট বলতে কিছুই নেই। গ্রামের উপর দিয়ে এখনো জোয়ার-ভাটা বইছে। তার জিজ্ঞাসা, ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা কিভাবে ওই বাঁশের সাকো পার হয়ে স্কুলে যাবে। চাকলা গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ভীটেবাড়ি সবই নদীতে ভেসে গেছে। কিছুই নেই। কপোতাক্ষ নদের বেঁড়িবাঁধের উপর আম্পানের পর থেকে আমরা ২৫ বাসবাস করছি। সরকারি সহায়তা হিসেবে পরিবারপ্রতি ২০ কেজি চাল ছাড়া আর কিছুই পাইনি। তাও ৫ দিন বাঁধ মিরামতের কাজ করার পর চাল দেয়া হয়। অসংখ্য মানুষ তাদের বশতভীটে হারিয়ে নি:স্ব হয়ে গেছে। অনেকের পাকা বিল্ডিং, গোয়াল ঘর, রান্নাঘর, ধানের গোলা ছিল। এখন সেখানে কোন চিহ্ন নেই। তাদের বশতভীটার উপর দিয়ে তৈরী হয়েছে নদী।


সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আনিসুর রহিম বলেন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-চিকিৎসা, বাসস্থানসহ সবধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত সাতক্ষীরা উপকূল অঞ্চলের মানুষ। দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় সাতক্ষীরা জেলা অনেক পিছিয়ে। এ জেলায় নিরক্ষরতার হার অন্যজেলা থেকে ১৮ ভাগ বেশি। আর স্বাস্থ্যে অন্যান্য জেলা থেকে ২০ ভাগ বেশি মানুষ বঞ্চিত। এ জেলায় তেমন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় দিন দিন আরো পিছিয়ে পড়ছে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরা। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুন:বাসনে সরকারকে এখুনি নজর দিতে হবে । এ জেলার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে এগিয়ে নিতে হলে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন। তানাহলে সাতক্ষীরা উপকূলীয় অঞ্চলে মানুষের বসবাস অনুপযোগী হয়ে পড়বে।

#