আরেকটি কালো দিন আজ


269 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
আরেকটি কালো দিন আজ
নভেম্বর ৩, ২০১৯ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

জেলহত্যা দিবস

অনলাইন ডেস্ক ::

আজ ৩ নভেম্বর। ঐতিহাসিক জেলহত্যা দিবস। জাতির ইতিহাসের অন্যতম বেদনাবিধুর ও কালিমালিপ্ত এক দিন। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি অবস্থায় নিহত হন মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী জাতীয় চার নেতা বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান। সেই থেকে এই দিনটি জেলহত্যা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণীতে জাতীয় চার নেতার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ চার সহকর্মী ও জাতীয় চার নেতাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তী অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্যু-পাল্টা ক্যুর রক্তাক্ত অধ্যায়ে ৩ নভেম্বর সংঘটিত হয় ইতিহাসের জঘন্য, নৃশংস ও বর্বরোচিত জেল হত্যাকাণ্ড। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার চক্রান্তকারীদের পাঠানো ঘাতকরাই কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করে জাতির চার সূর্যসন্তানকে। কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকাবস্থায় এমন হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

জেল হত্যাকাণ্ডের পর ওই সময় লালবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ ২১ বছর এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয়। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার জেলহত্যা মামলার প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করে। এরপর দীর্ঘ আট বছরের বেশি সময় বিচারকাজ চলার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত মামলাটির রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২০ আসামির মধ্যে ১৫ সাবেক সেনা কর্মকর্তার শাস্তি এবং অন্য পাঁচজনকে খালাস দেওয়া হয়। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে পলাতক তিনজনের মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হচ্ছে রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ওরফে হিরন খান, দফাদার মারফত আলী শাহ এবং এলডি দফাদার মো. আবুল হাসেম মৃধা। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হচ্ছে কর্নেল (অব). সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সৈয়দ শাহরিয়ার রশীদ, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদ (বরখাস্ত), লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (অব.) এম এইচ এম বি নূর চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, লে. কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) আহাম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ, ক্যাপ্টেন (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) মো. কিসমত হোসেন এবং ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসার। খালাসপ্রাপ্তরা হচ্ছে- বিএনপি নেতা মরহুম কে এম ওবায়দুর রহমান, জাতীয় পার্টি নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, সাবেক মন্ত্রী মরহুম তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, নূরুল ইসলাম মঞ্জুর এবং মেজর (অব.) খায়রুজ্জামান।

২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট হাইকোর্টের রায়ে কেবল রিসালদার মোসলেমউদ্দিনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দফাদার মারফত আলী শাহ ও এলডি দফাদার মো. আবুল হাসেম মৃধা এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য চার আসামি লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব.) শাহরিয়ার রশীদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা ও লে. কর্নেল (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকে মামলা থেকে খালাস দেওয়া হয়। নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ওই চার আসামির চারটি আপিল ও রাষ্ট্রপক্ষের ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি করে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আতাউর রহমান খান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ রায় দেন। তবে জাতীয় নেতাদের পরিবারের সদস্যরাসহ বিভিন্ন মহল থেকে সে সময় রায়টিকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও ‘প্রহসনের রায়’ বলে আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করা হয়। তাদের অভিযোগ ছিল- জেলহত্যার ষড়যন্ত্রের দায়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়নি। জাতির ইতিহাসের নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডের পুনর্তদন্ত ও পুনর্বিচার দাবি করেন তারা।

এরই মধ্যে জেলহত্যা মামলায় খালাসপ্রাপ্ত লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব.) শাহরিয়ার রশীদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা ও লে. কর্নেল (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ- এ চারজন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি ফাঁসির রায় কার্যকর হয় তাদের। অন্যদিকে হাইকোর্টের রায়ে পলাতক অন্য আট যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আসামি সম্পর্কে কোনো মতামত না দেওয়ায় তাদের দণ্ড বহাল রয়েছে বলে আইনজীবীরা ব্যাখ্যা দেন।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতাসীন হওয়ায় জেল হত্যাকাণ্ডের পুনর্বিচারের সুযোগ আসে। ২০১৩ সালের ১ নভেম্বর সরকারপক্ষ জেলহত্যা মামলার আপিল বিষয়ে সারসংক্ষেপ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে জমা দিলে পুনর্বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সংক্ষিপ্ত রায়ে ২০০৮ সালের হাইকোর্টের রায় বাতিল করে ২০০৪ সালের নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখা হয়। অর্থাৎ পলাতক তিন আসামি রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ওরফে হিরন খান, দফাদার মারফত আলী শাহ ও এলডি দফাদার মো. আবুল হাসেম মৃধাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

দিনের কর্মসূচি: দিবসটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন আজ ঢাকাসহ সারাদেশে বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করবে।

আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে রয়েছে, সকাল ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে দলের শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, কালো পতাকা উত্তোলন ও কালো ব্যাজ ধারণ, ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, ৮টায় বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদ ও জাতীয় নেতাদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ মাহফিল ও মোনাজাত, রাজশাহীতে জাতীয় নেতা শহীদ কামারুজ্জামানের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ মাহফিল ও মোনাজাত এবং বিকেল ৩টায় রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে স্মরণসভা। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সভায় জাতীয় নেতারা বক্তৃতা করবেন।

দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিবৃতিতে দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে যথাযথ মর্যাদা ও শোকাবহ পরিবেশে জেলহত্যা দিবস পালনের জন্য দলের সব শাখা ও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সব শাখার নেতাকর্মী-সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

এ ছাড়া গণফোরাম, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগ, ছাত্রলীগ, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জয়বাংলা সাংস্কৃতিক ঐক্যজোটসহ বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করবে।

সৈয়দ নজরুল স্মরণে কিশোরগঞ্জে ব্যাপক কর্মসূচি :কিশোরগঞ্জ অফিস জানায়, চার নেতার অন্যতম কিশোরগঞ্জের সন্তান বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের শাহাদতবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে কিশোরগঞ্জে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসন আয়োজিত এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ বাদ জোহর সৈয়দ নজরুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি যশোদলের বীরদামপাড়া সাহেববাড়ি জামে মসজিদ, শহরের পাগলা মসজিদ এবং শহিদী মসজিদে পবিত্র কোরআনখানি ও দোয়া মাহফিল এবং জেলা সদরের মসজিদগুলোতে বিশেষ মোনাজাত, মন্দির-গির্জা-প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা। এর আগে সকাল ৯টায় কিশোরগঞ্জের পুরাতন স্টেডিয়াম থেকে বিশাল শোক র‌্যালির মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হবে। র‌্যালিটি জেলার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে শেষ হবে। সেখানে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দিনব্যাপী স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রম চলবে।

বিকেল ৪টায় কিশোরগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু হবে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সন্ধ্যা ৬টায় আলোচনা সভা। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ইসলামিয়া সুপার মার্কেট প্রাঙ্গণে প্রদর্শিত হবে সৈয়দ নজরুলের রাজনীতি এবং জেলহত্যার ওপর তথ্যচিত্র। এ ছাড়াও শহরের আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ও কিশোরগঞ্জ পৌর এলাকায় সব কলেজে আলোচনা সভা হবে।

জেলা প্রশাসক সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এসব অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন সৈয়দ নজরুল ইসলামের বড় মেয়ে কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দা জাকিয়া নুর লিপি।

বিশেষ অতিথি থাকবেন কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান শাহজাহান ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এম এ আফজাল।