আন্তর্জাতিক নারী দিবস : “প্রজন্ম হোক সমতার সকল নারীর অধিকার”


443 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
আন্তর্জাতিক নারী দিবস : “প্রজন্ম হোক সমতার সকল নারীর অধিকার”
মার্চ ৭, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

॥ মমতাজ খাতুন ॥

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারী অধিকার বাস্তবায়নের দাবীতে প্রথম আন্তজাতিকভাবে সংগ্রাম শুরু হয় ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ। ১৮৫৭ সালের এই দিনে নিউইয়র্কের একটি কারখানার নারী শ্রমিকরা নির্যাতন, মজুরী বৈষম্য দূরিকরণ, ভোটাধিকারসহ তাদের মর্যাদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশকিছু সুনির্দিষ্ট দাবি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তিসহ ১২ ঘন্টা শ্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য রাস্তায় নেমে আন্দোলন করলে তারা পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন। এ সময় মালিক পক্ষের স্বার্থে আন্দোলনরত কয়েকজন নারী শ্রমিক প্রাণ হারান। এ ঘটনার ৫০ বছর পর ১৯০৭ সালে নারী নেতা ক্লারা জেটকিন জার্মানীর স্টুটগার্ট শহরে শ্রমজীবি নারীদের নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। বিষয়টি তখন থেকেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সকল মহলের দৃষ্টি আকর্ষন করে। অতপর ১৯১০ সালে ডেনমার্কে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর দীর্ঘ ৭৩ বছর পর ১৯৮৪ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করার পর থেকে দিনটিকে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো সরকারিভাবে নারী দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। বাংলাদেশও জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হওয়ায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও প্রতি বছর ৮ মার্চ নারী দিবস গুরুত্বের সাথে এই দিবসটি পালন করে থাকে এবং দিনটিতে নারী সমাজের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্যবিষয়

“প্রজন্ম হোক সমতার
সকল নারীর অধিকার”

“সভ্যতার সৃষ্টিলগ্ন থেকে নারী সমাজ সকল অগ্রগতি ও উন্নয়নের সমান অংশীদার হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে”। বিশ্বায়নের এই যুগে নারী সমাজকে বাদ দিয়ে বা সমতার অংশগ্রহন এর মাধ্যমে সকল নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে একুশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা যথেষ্ট অসম্ভব হয়ে পড়বে।

প্রজম্ম হোক সমতার মানে হচ্ছে জীবনের উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহন ও অধিকার থাকবে, সমান সুয়োগ সুবিধা ও ভোগ করার অধিকার। কিন্তু আমাদেও দেশের নারীরা কি পুরুষের সমান অধিকার ভোগ করতে পারছে? কি ঘরে কি বাইরে সবখানেই পুরুষের আধিপত্য। আজও ভূসম্পত্তিতে নারীর অধিকার এখনও নিয়ন্ত্রনের বাইরে। অফিস আদালত সবখানেই উচ্চ পদগুলোতেই বেশীর ভাগ পুরুষের দখলে। উচ্চ পদে নারী দেখা গেলেও সেই সংখ্যা খুবই নগন্য। সংসার ও সমাজে নারীর কথার কোন গুরুত্ব নাই। গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্ত গ্রহনে নারীর অবস্থা ও অবস্থানকে কোন মূল্যায়ন করা হয় না।

তারপরেও আশার কথা দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, জাতীয় সংসদের স্পিকার তিনজনই নারী। নারী সমাজের উন্নয়নের জন্য এর চেয়ে বড় ইতিবাচক শর্ত আর কী হতে পারে? বাংলাদেশের সংবিধানসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালায় নারীর রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এতকিছুর পরও কেন পিছিয়ে থাকবে নারীরা? অনেক দেশে জেন্ডার সমতার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশেও এটা সম্ভব। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দৃঢ় প্রত্যয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও আধুনিক শিক্ষার প্রসার হতে পারে কর্মসূচি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বর্তমান সরকার নারী বান্ধব সরকার। যা ইতোমধ্যে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই অনুভব করতে শুরু করেছে। কারণ বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু সমুহের সাথে বাংলাদেশের অবস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে নারী মুক্তির লক্ষ্যে বিদ্যমান সকল কার্যক্রমকে এগিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশে সকল মন্ত্রাণালয়ের কার্যক্রমের আওতায় নারীকে উন্নয়নের মূলধারায় আনয়নের জন্য মন্ত্রনালয়গুলোর ম্যান্ডেট স্থির হয়েছে এবং জেন্ডার রেসপন্সিভ বাজেট প্রনয়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় রয়েছে সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটি। উন্নয়ন নীতিমালা পরিকল্পনা ও কার্যক্রমে জেন্ডার ইস্যু যুক্ত করার জন্য সকল মন্ত্রণালয়ে রয়েছে যুগ্ম সচিব পর্যায়ের ফোকাল পয়েন্ট। ফোকাল পয়েন্ট ম্যাকানিজম শক্তিশালী করতে ১৪টি লাইন মন্ত্রণালয়ের জন্য জাতীয় নারী উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ম্যাট্রিক্স রয়েছে। জেলা/ উপজেলা সমন্বয় কমিটি ও প্রকল্প সমুহের কার্যক্রম পরীবিক্ষনের জন্য মনিটরিং ম্যাকানিজম ফরম্যাট রয়েছে। নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা পালন এবং ২০০৫ সালে বেইজিং এ ৪র্থ বিশ্বনারী সম্মেলনে গৃহিত বেইজিং প্লাটফর্ম ফর এ্যাকশান (পি এফ এ) এর আলোকে মন্ত্রণালয়ের এলোকেশন অব বিজনেস সংশোধিত হয়েছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী/ প্রতি মন্ত্রীর সভাপতিত্বে ২১ সদস্য বিশিষ্ট বাংলাদেশ মহিলা কল্যাণ পরিষদ (বামকপ) নামীয় একটি কমিটি রয়েছে। আরও রয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ৫০ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় মহিলা ও শিশু উন্নয়ন পরিষদ (এন সি ডাব্লিউ সি ডি)। যার মাধ্যমে নারীদের যাবতীয় সমস্যা সমাধানে এবং নারী উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্পৃক্ত হয়ে যাবতীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করে থাকেন।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের “ নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোদ সনদ (সিডও) সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে নারীর অধিকার রক্ষায় আন্তজাতিক দলিলের উপর মৌলিক জায়গাগুলোতে আশানুরুপ সাফল্য অর্জন করার ক্ষেত্রে সরকার, বেসরকারী সংস্থা এবং সকল নাগরিককে যার যার অবস্থান থেকে প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করা দরকার। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে সমতার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সকল নারীকে ক্ষমতায়নের আওতায় আনা বর্তমান পেক্ষাপট বিবেচনায় সহজসাধ্য যদিও নয় তারপরেও সকলে মিলে একযোগে কাজ করতে হবে। বর্তমান প্রক্রিয়াতে ২০৩০ এর মধ্যে প্রজম্মকে সমতার আওতায় আনা সম্ভব হয়ে উঠবে না। আর এজন্য সরকার নতুন সব প্রযুক্তি ব্যবহার এর মাধ্যমে কোন নারী যেন পিছনে পড়ে না থাকে সে চেষ্টার ধারা অব্যাহত রাখা জরুরী।

সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি দেশের নারী প্রধান সংস্থাসমূহ সহ অন্যান্য বেসরকারী সংস্থা নারীর সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে কাজ করে আসছে বিশেষভাবে। এতদসত্বেও বাংলাদেশের নারীর বাস্তবতা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের থেকে ভিন্ন। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক-কোন ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ যথেষ্ট নয়। আমরা যদি শিক্ষার দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাই, প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলে ও মেয়ে শিশুর ভর্তির হার প্রায় সমান কিন্তু মাধ্যমিক থেকে উচ্চতর পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমশ কমতে থাকে। একইভাবে কর্মক্ষেত্রেও পুরুষ ও নারীর অংশগ্রহণ সমান নয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আগের যেকোন সময়ের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে একথা ঠিক কিন্তু পুরুষের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। একইভাবে পরিবার থেকে শুরু করে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ এখনও পিছিয়ে আছে। সম্পত্তির মালিকানার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। ইভটিজিং, খুন, ধর্ষন, এডিস সন্ত্রাস ইত্যাদি অপরাধের শিকার হয়েও নারীর পক্ষে ন্যায় বিচার পাওয়া কঠিন। সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ ধারণা ও কুসংস্কার নারীর সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এখনও দেয়াল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষুধা, দারিদ্র, দুর্যোগ, বিশেষ করে চলমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ঝুঁকিও নারীকে সবচেয়ে বেশী বিপন্ন অবস্থায় রেখেছে। এমনকি দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ পরবর্তী নারী নানা ধরনের পরিস্তিতির স্বীকার হয়। উল্লেখিত অবস্থা সমূহের পরিবর্তন হওয়া খুবই জরুরী।

বস্ত্রশিল্পে নারী শ্রমিকের বঞ্চনা আলোচিত ঘটনা। এ শিল্পের প্রসার ঘটেছে মূলত নারী শ্রমিকের কল্যাণেই, অথচ তারা মানবেতর জীবনযাপন করে থাকেন। নারী শ্রমিকেরা দু ধরনের বৈষম্যের স্বিকার হচ্ছেন। প্রথমে তারা শ্রমিক হিসেবে এবং দ্বিতীয়তঃ নারী শ্রমিক হিসেবে। কাজের মজুরীর ক্ষেত্রেও দরকষাকসি চলে। কারন নারীর দরকষাকসির শক্তিও কম।
ফলে তারা মজুরী ক্ষেত্রেও ছাড় দেন।

যৌতুক প্রথা, বাল্যবিবাহ, ধর্মীয় কুসংস্কার, পারিবারিক জীবনে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের আধিপত্য, প্রথা, মান্ধাতা আমলের মনোকাঠামো ইত্যাদি নারী অগ্রগতির পথে বড় বাধা। এসব অতিক্রম করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চলছে দেশে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। কিন্তু আবহমানকালের প্রথাগত সামাজিক চিত্রটিকে একেবারে মুছে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না।

নারীর অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত ও বেগবান করার জন্য আমাদের দেশে সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারী সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। শুধু জিও, এনজিও নয় নারী পুরুষের সমতা ও সম অংশীদার ও অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দেশের প্রতিটি মানুষকেই আরো সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। নতুন প্রজম্মকে আরও সমতাভিত্তিক নারীর অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করতে হবে। সমাজকে গড়ে তোলার জন্য সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠি নারীকে যেমন সম্পৃক্ত করতে হবে এবং তাদের অবদানকে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্টিয়ভাবেও গুরুত্ব দিতে হবে ও মূল্যায়ন করতে হবে। আর তবেই অর্জিত হবে আন্তর্জাতিক নারী
দিবসে বাংলাদেশের প্রতিপাদ্য “প্রজন্ম হোক সমতার সকল নারীর অধিকার” এর সফল বাস্তবায়ন।

তাই আসুন আমরা সকলেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে নারীর অধিকার রক্ষার্থে পারিবারিক,সামাজিক ও রাষ্টিয়ভাবে তাঁদের অবদানকে আরও গুরুত্ব দিই এবং মূল্যায়ন করি। তাহলেই বাংলাদেশ সোনার বাংলায় রুপান্তরিত হবে এবং অবশ্যই একদিন মানবিক মূল্যবোধ ও সমতার সমাজ প্রতিষ্টিত হবেই।

লেখক : মমতাজ খাতুন, নির্বাহী পরিচালক আশ্রয় ফাউন্ডেশন