আশাশুনিতে ভূমিহীন তালিকা চূড়ান্ত


157 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
আশাশুনিতে ভূমিহীন তালিকা চূড়ান্ত
জুন ২৪, ২০২১ আশাশুনি ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

এক খন্ডজমির আশা, কার না থাকে। আর যদি মানুষটি হয় জমি বা ভূমিহীন, তবেতো এই আশা রীতিমতো স্বপ্œ। অর্থনীতিবিদরা হিসাব করে দেখিয়েছেন যে, একখ- জমিকে ঘিরে পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকা- একটি পরিবারকে স্বাবলম্বী করে তুলতে পারে। আমাদের দেশে অনেক খাসজমি আছে। এই খাসজমি ভূমিহীনদের মাঝে বিতরণ করে তাঁদেরকে স্বাবলম্বী করে তোলা যায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা গড়ে তোলা। তিনিও বিশ^াস করতেন, খাসজমি ভূমিহীনদের মাঝে বিতরণের মাধ্যমে দেশ সমৃদ্ধ হয়ে গড়ে উঠবে। এ কারণেই তিনি স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলাদেশের ভূমি দখল (সীমিতকরণ) অধ্যাদেশ-১৯৭২/ পিও ৯৮ জারি করেন। এর মাধ্যমে কয়েক লাখ ভূমিহীনের মাঝে খাসজমি বিতরণ করে তাঁদের দু:খ দূর করেন। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পরের বছর ১৯৯৭ সালে পিতার পথ ধরে কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮৭ সালের কৃষি খাসজমি ব্যব¯’াপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালাটি সংশোধন ও ত্রুটিমুক্ত করেন।
আমাদের দেশে এখনও প্রচুর খাসজমি রয়েছে। ভূমিহীনও রয়েছে। কিš‘ সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী তা ভূমিহীনদের মাঝে বরাদ্দ বা বিতরণ করা হ”েছ না। তাই বলে, কোন খাসজমি উন্মুক্ত বা অব্যবহৃত অব¯’ায় পড়ে নেই। প্রকৃতপক্ষে, তা সমাজের নানাস্তরের সুবিধাভোগী-ক্ষমতাধর মানুষেরা দখলে রেখেছেন। আবার ভূমিহীন কারা এবং তাদের তালিকা না থাকায় ই”েছ থাকা সত্ত্বেও মাঠ প্রশাসনে নিযুক্ত ব্যক্তিরা সরকারের এই রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেন না। অবশ্য, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভুমিহীনদের তালিকা তৈরি করার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
জনগণের বিশেষ করে সমাজের আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অঙ্গীকারবদ্ধ সমাজ-উন্নয়নমূলক সংগঠন‘উত্তরণ’ দীর্ঘদিন ধরে ভূমিহীনদের কাছে খাসজমি হস্তান্তরের মাধ্যমে তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা পালন করে আসছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সচিব মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান, ২০০৫ সালে তালা উপজেলায় ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। তখন তাঁর ঐকান্তিক ই”ছায় উত্তরণ-এর সার্বিক সহযোগিতায় তালা উপজেলায় ভূমিহীন বাছাই ও তালিকা তৈরি করা হয়। যা সকল মহলেই প্রশংসিত হয়। ভূমিহীন বাছাই ও তালিকা তৈরির এই কাজটি ‘তালা মডেল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ওই কাজের ধারাবাহিকতায় সাতক্ষীরা জেলা ও উপজেলা প্রশাসন আশাশুনি উপজেলায় ভূমিহীনদের তালিকা প্র¯‘তির উদ্যোগ নেয়। বলাই বাহুল্য, উত্তরণ-এর কাজ ও অঙ্গীকারের দায়বদ্ধতা থেকে প্রশাসনের এই কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে।
কার্যক্রমটি বাস্তবায়নে ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট ‘জেলা কৃষি খাসজমি ব্যব¯’াপনা ও বন্দোবস্ত কমিটি’র আনুষ্ঠানিক সভা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ওই বছরের ২৫ নভেম্বর আশাশুনি ‘উপজেলা কৃষি খাসজমি ব্যব¯’াপনা ও বন্দোবস্ত কমিটি’র সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় উত্তরণ’কে উপজেলায় ভূমিহীন বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। কার্যক্রমটি বাস্তবায়নের ধরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। যথারীতি ভূমিহীন বাছাই কার্যক্রমের সূচনা হয়। ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। এদিন সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল ব্যক্তিগতভাবে আশাশুনি উপজেলা চত্ত্বরে বাছাই কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপ¯ি’ত ছিলেন। তিনি এই কার্যক্রমটি শুরু করতে পেরে তাঁর সš‘ষ্টি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এ জেলায় প্রচুর খাসজমি রয়েছে এবং সেসব জমি নিয়ে জেলাতে এক ধরণের ছিনিমিনি চলে।’তিনি ভূমিহীনদের প্রতি জাতির পিতার অঙ্গীকার ও খাসজমি বিতরণের উদ্যোগের কথা স্মরণ করে বলেন, ভূমিহীন বাছাই ও তালিকা তৈরির কাজ সম্পন্ন হলে অতি সহজেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা ‘মুজিব-বর্ষে বাংলাদেশে কোন পরিবারই গৃহহীন থাকবে না’ শ্লোগান বাস্তবায়ন করাও অনেক সহজ হবে। একার্যক্রমে উত্তরণ-এর অভিজ্ঞতারও প্রশংসা করেন তিনি।
জেলা প্রশাসকের দিক-নির্দেশনায় আশাশুনি উপজেলার ইউএনও, এসিল্যান্ড, ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তাগণ, উপজেলার সকল ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণ এবং ভূমি কমিটির ঐকান্তিক চেষ্টায় উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ৯৯টি ওয়ার্ডের ২৪৪টি গ্রামের ভূমিহীন বাছাই ও তালিকা তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কার্যক্রমটি বাস্তবায়নে আর্থিক এবং কারিগরি সহায়তা দিয়েছে ‘উত্তরণ’ এবং এতে অর্থায়ন করেছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।আশাশুনি উপজেলায় মোট ১৯,৬৮১টি ভূমিহীন পরিবার চিহ্নিত হয়েছে। উপজেলায় মোট গৃহহীন পরিবার রয়েছে ৫২৫৭টি। উপজেলা প্রশাসন বর্তমানে এই ৫২৫৭টি পরিবারের মধ্যে থেকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে মুজিব-বর্ষের ঘর বিতরণ করছে।
সরকারী নীতিমালায় ভূমিহীনদের যে অগ্রাধিকার তালিকার কথা বলা হয়েছে, সেই অনুযায়ী উপজেলায় মোট ১৯,৬৮১টি ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে দু:¯’ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার (ক ক্যাটাগরি) ২৪টি, নদী-ভাঙ্গা পরিবার (খ ক্যাটাগরি) ৩০৬টি, সক্ষম পুত্রসহ স্বামী পরিত্যক্তা পরিবার (গ ক্যাটাগরি) ৫৩৮টি, কৃষি জমি ও বা¯‘ভিটাহীন পরিবার (ঘ ক্যাটাগরি) ৫,১৬৪টি এবং অনধিক শূণ্য দশমিক দশ (০.১০) একর বসতবাটি আছে কিš‘ কৃষি জমি নেই এমন পরিবার (ঙ ক্যাটাগরি) ১৩,৬৪৯টি চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত ও তালিকা প্র¯‘ত করা হয়েছে। প্রনীত তালিকায় প্রতিটি পাতায় অংশগ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে ইউএনও, সহকারী কমিশনার (ভূমি), ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা ও ইউপি চেয়ারম্যানগণের স্বাক্ষর রযেছে।
এই তালিকাটি ইতোমধ্যে ইউনিয়ন ভূমি অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস, উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয় (ইউএনও), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। অতি শিঘ্রই প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদ, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ে পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর পরামর্শ অনুযায়ী জেলার ওয়েব-সাইটে তালিকাটির(সফট কপি) সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কার্যক্রমটির সফল সমাপ্তিতে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোস্তফা কামাল উত্তরণ-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, খাসজমি বন্দোবস্ত এবং সেফটি-নেট কর্মসূচীর উপকারভোগী নির্বাচনে এই তালিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। উপজেলার সকল দপ্তর এই তালিকা ব্যবহার করে তাদের টার্গেট অনুযায়ী দরিদ্র/ হতদরিদ্র্র পরিবার চিহ্নিত করে তাদের দোরগোড়ায় সেবা পৌছে দিতে পারবে। উপজেলা প্রশাসন এই তালিকাটি ব্যবহার করে প্রকৃত ভূমিহীনদের হাতে খাসজমি বিতরণের পাশাপাশি সরকারের নানাবিধ উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দিতে পারবে। ইউপি চেয়ারম্যানদের এখন থেকে বারে বারে অসহায় মানুষের তালিকা তৈরী নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করতে হবে না; এই তালিকা ব্যবহার করতে পারবেন। উপরš‘, আশাশুনি উপজেলায় কর্মরত দেশি-বিদেশী যে কোন এনজিও এই তালিকার সহযোগিতা নিতে পারবে। তালিকাটিতে ভূমিহীনদের নামের পাশাপাশি তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর রয়েছে। একারণে জাতীয়ভাবেও কোন ভূমিহীনকে চিহ্নিত করতে হলেও তা অনায়াসে করা যাবে। তালিকাটি প্রতি বছর আপডেট করার সুযোগ রয়েছে।