আয়নাবাজির বাজিকর


428 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
আয়নাবাজির বাজিকর
অক্টোবর ২০, ২০১৬ ফটো গ্যালারি বিনোদন
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক :
এক দুনিয়া ভাঙ্গা ভাঙ্গা/ আরেক দুনিয়া যাওয়া মানা।’-সত্যিই কি আমরা যা দেখি আসলেই তাই? সদ্য প্রয়াত সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক লিখেছিলেন ‘এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর/যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভেতর।’ বাজিকর। যার হাতের রুমালের ইশারায় আমরা চলছি। প্রতিটি মুহূর্তে অভিনয় করে যাচ্ছি। পুরো পৃথিবীটা যেন এক রঙ্গমঞ্চ আর আমরা সেই মঞ্চের অভিনেতা। কী সংসারে, কী সমাজে- সব সময় নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ক্ষণে ক্ষণে নতুনভাবে হাজির হচ্ছি আমরা সবাই। সে যাই হোক, এত কথা বলার পেছনের কারণ অমিতাভ রেজার আয়নাবাজি। ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন একজন অভিনেতার গল্প। জীবনের রূঢ় বাস্তবতা আয়নাকে অপরাধী করে তোলে। ছবির অন্যতম প্রধান চরিত্র শরাফত করিম আয়না [চঞ্চল চৌধুরী] একজন অভিনয়শিল্পী। মা যাত্রাপালায় অভিনয় করতেন। মার হাতেই তার অভিনয়ে হাতেখড়ি। একসময় তার পেশা হয়ে দাঁড়ায় অভিনয়। তবে তার অভিনয় মঞ্চ বা সিনেমায় নয়। বাস্তবজীবনের অভিনয়। কখনও দুশ্চরিত্র মানুষ, কখনও খুনি, কখনও পাগল, কখনও রাজনীতিক মানুষের অবিকল। আয়না টাকার বিনিময়ে বদলি জেল খাটে। এই ছবির কল্যাণে বর্তমান সময়ের এলইডি, এলসিডি, থ্রিডিমুখী দর্শক হলমুখী হচ্ছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কিনছে। এক্সিকিউটিভ, স্পেশাল কিংবা ইকোনমিক ক্লাস কোনো ব্যাপার হচ্ছে না। যে কোনো মূল্যে একটা টিকিট তাদের চাই। সম্প্রতি ছবিটি নিয়ে নন্দনের সঙ্গে আড্ডায় বসেছিলেন অমিতাভ রেজা, চঞ্চল চৌধুরী ও নাবিলা। প্রথমেই অমিতাভের কাছে জানতে চাই- নিজের প্রথম ছবি নির্মাণের জন্য এতটা সময় নেওয়ার পেছনে কোনো কারণ ছিল- এমনটা জানতে চাইলে অমিতাভ বলেন, ‘অনেক দিন ছবি নির্মাণের জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকলেও পারিপাশর্ি্বক কারণে করতে পারিনি। সিনেমা বানাতে গেলে একজন শক্ত প্রযোজক লাগে, পরিচালনা পর্ষদ লাগে, ভালো ডিস্ট্রিবিউশন লাগে। সেগুলো তৈরি করতেই এত সময় নিয়েছি। ঠিকঠাক প্রযোজক পাচ্ছিলাম না। যার সঙ্গে প্রথম ছবিটা আমার মতো করে তৈরি করতে পারব। সেই সুযোগটা এই প্রযোজকরা করে দিয়েছেন। এর আগে ‘ঢাকা মেট্র্রো’, ‘মিতা এখন ঢাকায়’ এ রকম কয়েকটা গল্প নিয়ে ছবি বানানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু হচ্ছিল না।’ মূলত কি গল্পের কারণেই ‘আয়নাবাজি’ নিয়ে কাজ করেছেন? জানতে চাইলে অমিতাভ বলেন, ‘অনেকটা বলা যেতে পারে। আমি একটি সহজ গল্প বলতে চেয়েছিলাম। যার মাধ্যমে অধিকাংশ দর্শকের সঙ্গে নিজের যোগসূত্র তৈরি করতে পারব। এই গল্পটা পড়ে মনে হয়েছে এটা আমার প্রথম ছবি হতে পারে। সেই জায়গা থেকে ‘আয়নাবাজি’ নিয়ে কাজ করা।’ বাংলাদেশের মানুষ ‘আয়নাবাজি’তে আচ্ছন্ন হয়েছে তা বলা যায়।

হলগুলোতে একের পর এক হাউজফুল শো, টিকিট না পেয়ে হল থেকে হলে ছুটে বেড়ানো- এমনটা কি ক’দিন আগেও কল্পনা করেছে কেউ? ভালো ছবি হলে যে দর্শক হলমুখী হবেই, তা-ই যেন নতুন করে আবারও প্রমাণ করে দেখালেন অভিতাভ রেজা ও তার ‘আয়নাবাজি’। ট্রেলার দেখে যেমন উত্তেজিত হয়েছিল জনতা, পুরো

সিনেমা দেখে আরও ভয়ানক উত্তেজিত তারা। দীর্ঘদিন পর কোনো বাংলা সিনেমা একবার নয়, দ্বিতীয়বার দেখার জন্য মানুষ লাইন দিচ্ছে। ছবির চিত্রগ্রহণ ও লোকেশন নিয়ে জানতে চাইলে অমিতাভ বলেন, ‘আমি আমার পরিচিত এই শহরটাকে দেখাতে চেয়েছি। আর সে কারণেই ছবির দৃশ্যধারণ ঢাকায় করেছি। পাশাপাশি ছবির চিত্রগ্রহণ করেছেন রাশেদ জামান। বিজ্ঞাপনে তার সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। ছবির পাত্রপাত্রী থেকে শুরু করে লোকেশন, সেট নির্মাণ, সবক্ষেত্রেই দারুণ সহযোগিতা পেয়েছি।’

এবার আসি চঞ্চল চৌধুরীর কাছে। আপনার তো এটা পাঁচ নম্বর চলচ্চিত্র। মনপুরার পর আবারও চঞ্চল চঞ্চল বলে মানুষের মধ্যে জয়ধ্বনি হচ্ছে। কেমন লাগছে? ‘দর্শকের প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে। আমারও ভালো লাগছে আর আমি যেহেতু একজন অভিনেতা, অভিনয়টাই আমার পেশা এবং নেশাও বটে। মনপুরার পর এ ছবিটি নিয়ে দর্শকদের এত আগ্রহ দেখে ভালো লাগছে। মনপুরা করেছিলাম ২০০৯ সালে আর ‘আয়নাবাজি’ করলাম ২০১৬ সালে। আমি বলব এটা আমার পরিণত বয়সের অভিনয়। মনপুরার গল্প থেকে শুরু করে চরিত্র সবকিছুই আলাদা। মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বলা যায়। আয়নাবাজিতে আমি আয়না। সব মিলিয়ে যখন দর্শকদের কাছে ভালো লেগেছে শুনছি, তখন সব পরিশ্রম সার্থক হয়েছে বলে মনে হয়।’

অন্যদিকে ছবির নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাবিলা। মূলত মিডিয়াতে তার পরিচিতি উপস্থাপিকা হিসেবেই। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই এই একটা জায়গাতেই নিজেকে তিনি গড়ে তুলেছেন দারুণভাবে। পুরো নাম মাসুমা রহমান নাবিলা। উপস্থাপনা ছাড়াও নাবিলা বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হিসেবেও পরিচিত। কিন্তু এখন থেকে তার নামের আগে যুক্ত হলো চিত্রনায়িকা। আয়নাবাজি তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র। প্রথম ছবিতে বাজিমাত- কেমন লাগছে জানতে চাইলে নাবিলা বলেন, ‘এককথায় দর্শকের প্রশংসা দারুণ উপভোগ করছি। ভালো লেগেছে এমন একটি চলচ্চিত্রে কাজ করতে পেরে। এটাকে আমি আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট বলব।’

বাংলা সিনেমার পরিবর্তন দেখতে হলে, নতুন রূপ দেখতে হলে ‘আয়নাবাজি’ অবশ্যই দেখতে হবে। ভিজুয়াল মিডিয়ায় বহু বছর আগে নাম লেখালেও অমিতাভ রেজা তার প্রথম সিনেমা হুট করে নির্মাণ করেননি, সময় নিয়েছেন, হাত পাকিয়েছেন। বিজ্ঞাপন আর নাটকের পর তিনি এবার সোনা ফলালেন আয়নাবাজি দিয়ে। এ যেন এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। প্রথম ছবিতে এমন সাফল্য আজ পর্যন্ত খুব বেশি পরিচালকের ভাগ্যে জোটেনি।

ছবিটি নিয়ে অনলাইনে প্রশংসার ঝড় উঠেছে। ফেসবুকে ভাসছে অভিনন্দনের জোয়ার। ফলে বলা যায়, অমিতাভের রাজকীয় অভিষেক ঘটল। সিনেমার মাঠে নেমেই সেঞ্চুরি হাঁকালেন অমিতাভ রেজা।