উত্তরাধিকারের রাজনীতি চান না প্রধানমন্ত্রী


311 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
উত্তরাধিকারের রাজনীতি চান না প্রধানমন্ত্রী
এপ্রিল ২৬, ২০১৭ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক :;
আওয়ামী লীগে উত্তরাধিকারের রাজনীতি চান না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এ ধরনের রাজনৈতিক মানসিকতা পরিহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গত সোমবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে দলের স্থানীয় সরকার, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে এ মনোভাব দেখান।

এ বৈঠকে অংশ নিয়েছেন এমন একাধিক নেতা সমকালকে জানিয়েছেন, কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দলের কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের কয়েক শীর্ষ নেতার ছেলেমেয়ে কিংবা আত্মীয়স্বজন প্রাধান্য পেয়েছেন। এর মধ্যে প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপির নিকটজনও রয়েছেন। এ নিয়ে দলের ভেতরে চাপা ক্ষোভ রয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে এসেছে।

আগামীতে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, কয়েকটি পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কয়েক নেতার সন্তানরাও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছেন। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী দুই নেতা তাদের সন্তানদের মনোনয়ন দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে দলের ভেতরে সরব আলোচনা রয়েছে। সেই সঙ্গে কয়েক সাবেক মন্ত্রী ও প্রবীণ এমপি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের সন্তানদের দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে এখন থেকেই তোড়জোড় শুরু করেছেন। এ ছাড়া কেন্দ্রের কয়েক নেতা থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপি এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ের পদস্থ নেতাদের কারও কারও মধ্যে তাদের সন্তানদের দলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে আনার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে দলীয় ঘরানার রাজনীতিতে কিছুটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েছে।

এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতেই উত্তরাধিকারের রাজনীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের মনোভাব তুলে ধরেছেন বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক নেতারা। দলের স্থানীয় সরকার, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে উপস্থিত কয়েক নেতা সমকালকে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী উত্তরাধিকারের নামে অযোগ্য ও অদক্ষদের রাজনীতিতে আনার বেলায় অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। তিনি কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পরীক্ষিত, যোগ্য, দক্ষ ও সৎ নেতৃত্বকেই সংগঠনের পুরোভাগে আনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।’

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী কারও নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, ‘কিছু নেতা ও এমপির সন্তান ও আত্মীয়স্বজনকে কেন রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে? তাদের কেন দলের মনোনয়ন পেতে হবে?’ এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তার সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রসঙ্গ এনে জানান, সজীব ওয়াজেদ জয় আওয়ামী লীগের জন্য অনেক কিছুই করছেন। কিন্তু তিনি জয়কে রাজনীতিতে আনেননি। আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে কাউন্সিলরদের সম্মিলিত দাবির পরও তাকে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদে রাখেননি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যোগ্যতা না থাকার পরও উত্তরাধিকারকে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করাটা ঠিক নয়। এমন মনোভাব কারও থাকলে অবশ্যই তা পরিহার করতে হবে। দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের দিকেই নজর দিতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিভাগওয়ারি তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি।

এ সময় দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব-বিবাদ নিরসনে চট্টগ্রাম, খুলনা, কুমিল্লা, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও যশোর জেলার নেতাদের সঙ্গে সফল বৈঠক করার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানান। তিনি বলেন, ‘দ্বন্দ্ব-বিবাদে জড়িয়ে থাকা চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার সভাপতি পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও সাধারণ সম্পাদক রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হকের মধ্যেও ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে।’

স্থানীয় সরকার, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে দ্রুত কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন সম্পর্কে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী আগামী ৬ মে কক্সবাজার যাচ্ছেন। বৈরী আবহাওয়া থাকলেও ওই দিন কক্সবাজারে জনসভা করা যায় কি-না, তা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। বৈঠকে জানানো হয়, রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেখানে এক ধরনের সাংগঠনিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় মন্ত্রী-এমপিকে তিরস্কার :ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের এমপি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর নির্বাচনী এলাকা বিজয়নগর উপজেলায় নবনির্মিত পানিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্রের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্থানীয় এমপিসহ আওয়ামী লীগের অনেক পদস্থ নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ফলে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক এবং র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। এ নিয়ে গত ২৩ এপ্রিল সেখানে হরতাল ও ১৪৪ ধারা জারির ঘটনা ঘটে। বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্থানীয় এমপিকে তার নির্বাচনী এলাকার অনুষ্ঠানে কেন অতিথি করা হবে না? কেন তাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে না? এটা কেমন কথা!’ তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর কাছে এ সম্পর্কে জানতে চেয়ে বলেন, ‘এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হরতাল ডাকা হলো। এটা কেন হলো? স্থানীয় এমপি কেন সরকারের বিরুদ্ধে হরতাল ডাকবে?’

বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েক নেতা জানিয়েছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা নিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক এবং র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এমপিকে তিরস্কার করেছেন প্রধানমন্ত্রী। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ বৈঠকে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, ড. আবদুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, মাহবুবউল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ড. আবদুস সোবহান গোলাপ উপস্থিত ছিলেন।

একীভূত হচ্ছে দুই সংগঠন :আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ ও আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। বিলুপ্ত এ দুই সংগঠনকে এখন একীভূত করার কাজ চলছে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দুই সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আগামী ৩০ এপ্রিল বিকেল ৫টায় শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠক করবেন।

এদিকে, আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের প্রচার ও দপ্তর সম্পাদকদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও বৈঠকটি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত হবে বলে নেতারা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন।