উন্মোচন হলো ধইঞ্চার জিনোম সিকোয়েন্স


298 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
উন্মোচন হলো ধইঞ্চার জিনোম সিকোয়েন্স
নভেম্বর ২৩, ২০১৮ ফটো গ্যালারি স্বাস্থ্য
Print Friendly, PDF & Email

*বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের আরেক সাফল্য

অনলাইন ডেস্ক ::

পাটের জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচনের পর এবার ধইঞ্চার জীবন নকশা উন্মোচন করেছেন বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের পাটবিষয়ক মৌলিক ও ফলিত গবেষণার সঙ্গে জড়িত বিজ্ঞানীরা ধইঞ্চার জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করে এর জিনগুলো শনাক্তে সক্ষম হয়েছেন। এখন মাটির সবুজ সার ও বন্ধু হিসেবে পরিচিত ধইঞ্চার গুণগতমান ও বিপুল হারে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। মাটির উর্বরা শক্তি বাড়াতে উদ্ভাবন করা যাবে বাংলাদেশের আবহাওয়া ও প্রয়োজন অনুযায়ী ধইঞ্চার নতুন জাত। কমবে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতিকর রাসায়নিক সারের ব্যবহার। এখন ধইঞ্চার মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ধইঞ্চার জিনগুলো এবং সম্পূর্ণ জিনোম বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন (এনসিবিআই) থেকে নাম্বারিং করা হয়েছে। জিনোম গবেষণার ফল বিএমসি জিনোমিক্স ও নেচার প্ল্যান্টের মতো বিশ্বখ্যাত জার্নালে ধইঞ্চার জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। বর্তমানে এর আঁশের মানোন্নয়নসহ প্রায়োগিক গবেষণা চলমান রয়েছে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য পূরণে এবং রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এ গবেষণা অবদান রাখতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কৃষকরা বলছেন, ধইঞ্চার নানামুখী ব্যবহার রয়েছে। কখনও সবুজ সার, জ্বালানি, কখনও আবার ঘরের বেড়া এবং সবজির মাচা হিসেবেও কাজে লাগানো হয়। ধইঞ্চার পাতা এবং বীজ গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার হয়ে থাকে। চর এলাকায় মাটির ক্ষয়রোধের জন্যও তা উপকারী। সাধারণত এক ফসল থেকে আরেক ফসলের মাঝখানে যে সময়টা জমি পতিত থাকে সেই সময়ে ধইঞ্চা চাষ হয়ে থাকে। এসব ধইঞ্চা গাছ কেটে কৃষকরা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেন। এতে জমির উর্বরা বৃদ্ধি পায়। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অব্যাহত রাখতে ধইঞ্চার উর্বরাশক্তি মাটির গুণাগুণ বাড়াতে কাজে আসবে।

প্রয়াত অধ্যাপক মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে এ প্রকল্পের বিজ্ঞানীরা ২০১২ সালে পাটসহ বিশ্বের ৫০০ টিরও বেশি উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকর একটি ছত্রাক এবং ২০১৩ সালে দেশি পাটের জীবন নকশা উন্মোচন করেন। গবেষণালব্ধ তথ্যকে কাজে লাগিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে বিজ্ঞানীরা তোষা ও দেশি পাটের উচ্চ ফলনশীল ও রোগ প্রতিরোধী চারটি নতুন

লাইন উদ্ভাবন করেন। এর মধ্যে আগাম বপন উপযোগী ১০০ দিনে কর্তনযোগ্য, উন্নততর আঁশযুক্ত এবং বর্তমানে সর্বাধিক চাষকৃত জাতের চেয়েও ২০ শতাংশ বেশি ফলনশীল তোষা পাটের একটি লাইন ‘রবি-১’ এ বছরই জাত হিসেবে অবমুক্ত হবে। এ জাত প্রচলনের ফলে বিদেশ থেকে বছরে যে প্রায় ছয় হাজার টন পাটবীজ আমদানি করতে হয় তা ক্রমান্বয়ে বন্ধ হবে। এ ছাড়া পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট মধ্যম মাত্রার (৯ ডিএস/মি) লবণাক্ততা সহিষ্ণু বিজেআরআই দেশি পাট-৮ উদ্ভাবন করেছে।

কৃষি গবেষকরা বলছেন, ভালো নেই মাটির স্বাস্থ্য। বছরের পর বছর মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে ভেঙে পড়েছে মাটির স্বাস্থ্য। স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য ফসলি জমিতে ৫ শতাংশ জৈব পদার্থের প্রয়োজন হলেও দেশের জমিতে আছে দেড় শতাংশেরও কম। গত ৩০ বছরে ফসলি জমিতে প্রায় ৬ কোটি টন জৈবসারের সংকট দেখা দিয়েছে। জৈবসারের অভাবে মাটিতে বোরন দস্তাসহ বিভিন্ন পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ধইঞ্চা মাটির পুষ্টি ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এতে পরিবেশের ক্ষতি হবে না। তারা বলছেন, ধইঞ্চার উৎপাদন বাড়ানো গেলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জমিতে সবুজ সারের ব্যবহার বাড়ানো যাবে। বায়ুম লে থাকা ৭৬ ভাগ নাইট্রোজেন প্রচলিত ফসল সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না। কিন্তু দেশে প্রাচীনকাল থেকে সবুজ সার হিসেবে ব্যবহূত ধইঞ্চার শিকড় ও কাে এক ধরনের নডিউল বা গুটি তৈরি হয় যাতে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া বায়ুম লের নাইট্রোজেন সঞ্চয়-পূর্বক গাছকে সরবরাহ করে।

নেত্রকোনার দুর্গাপুরের কৃষক আবু সামা শ্রীপুরী বলেন, ধইঞ্চা গাছ হচ্ছে মাটির ভিটামিন। এ ছাড়া ধানক্ষেতে ধইঞ্চা গাছ থাকলে পাখি বসে। এসব পাখি ধানক্ষেতের ক্ষতিকারক পোকা খেয়ে ফেলে। তাতে ধানক্ষেতে রোগ- বালাই হয় না।

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক ড. মঞ্জুরুল আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক আগ্রহ এবং পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা পাটের জীবন রহস্য উন্মোচনে সাফল্য লাভ করেন। ২০১০ সালের জুনে জাতীয় সংসদে তিনি এ সাফল্যের ঘোষণা দেন। বিশ্বখ্যাত জিনোম বিজ্ঞানী অধ্যাপক মাকসুদুল আলমের হাত ধরে শুরু হওয়া জিনোম গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাটবিষয়ক মৌলিক ও ফলিত গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, প্রায় ১ হাজার ১৬৮ মিলিয়ন বেস পেয়ার জিনোম আকারের দেশি ধইঞ্চার প্রায় ৪৯ হাজারটি জিন শনাক্ত করে অধিকাংশ জিনের কার্যগুলোর বিশ্নেষণ করা হয়েছে। উচ্চ প্রযুক্তির কৃষি গবেষণাকে জোরদার করতে জিনোম গবেষণায় সাফল্যের এ ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে একটি নতুন কৃষি বিপ্লবের সূচনা করা সম্ভব হবে।

সূত্র : দৈনিক সমকাল।প্রকাশের তারিখ—২৩-১১-১৮