উপকূলবাসীর নিরন্তর কান্না


150 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
উপকূলবাসীর নিরন্তর কান্না
জুলাই ২, ২০২০ দুুর্যোগ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

॥ বিধান চন্দ্র দাস ॥

গত মে মাসের ২০ তারিখে উপকূলে আছড়ে পড়া সুপারসাইক্লোন আম্পানের আঘাতজনিত কান্না এখনো থামেনি। উপকূলবাসীর এই কান্না শিগরিগই শেষ হওয়ারও নয়। পঞ্চাশের দশকে জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে গাওয়া কালজয়ী সেই গান, ‘যাদের জীবন ভরা শুধু আঁখি জল’-উপকূলবাসীর জীবনেরও যেন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততাজনিত উপর্যুপরি দুর্যোগ উপকূলবাসীর চোখের পানি শুকাতে দেয় না। বারবার বিপর্যস্ত হয় উপকূলীয় জীবন-জীবিকা আর স্বপ্ন। পরিবর্তিত হয় সেখানকার প্রতিবেশ, পরিবেশ আর প্রকৃতি।
আম্পানের পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংস্থা থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হয়েছিল। দেখা গিয়েছিল যে বাংলাদেশে সর্বমোট ১৯টি জেলা এই ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়লেও তার মধ্যে উপকূলীয় আটটি জেলাতেই (সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা) প্রধানত মাঝারি থেকে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়। এসব ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-ঘরবাড়ি ধ্বংস হওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, বাঁধ ভেঙে কিংবা উপচে পানি ঢোকা, ফসলের ক্ষতি হওয়া ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়া। আটটি জেলার মধ্যে ইউনিয়নভিত্তিক ৫০ শতাংশের বেশি এলাকা প্লাবিত হয়েছিল সাতক্ষীরা (৯টি ইউনিয়ন), খুলনা (৯টি ইউনিয়ন), পটুয়াখালী (চারটি ইউনিয়ন), পিরোজপুর (একটি ইউনিয়ন) ও বরগুনা (একটি ইউনিয়ন) জেলায়। বর্তমানে এসব জেলার অনেক ইউনিয়নে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস-উত্তর দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এসব এলাকায় এখনো চারদিকে থইথই পানি, অথচ তা খাওয়ার কিংবা ব্যবহারের উপযুক্ত নয়। একটুখানি মিষ্টি পানির জন্য অনেক জায়গায় চলছে হাহাকার। যেন কোলরিজের সেই নাবিকদের মতোই অবস্থা—‘পানি, পানি, চারদিকে অথৈ পানি; কিন্তু খাওয়ার মতো এক ফোঁটাও নেই।’
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস নতুন কিছু নয়। বিগত সোয়া চার শ বছরে জানা ইতিহাসে বাংলাদেশের উপকূলে বহুবার ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস সংঘটিত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে অসংখ্য প্রাণ আর সম্পদের। বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন উপকূলভাগের ভৌত কাঠামো ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্চ্ছ্বাসের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। অগভীর মহীসোপান (স্থলভাগ সন্নিহিত সমুদ্রতলের অংশ), জটিল মোহনা প্রণালির জালিকাবিন্যাস ও উত্তর বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন স্থলভাগ ফানেলসদৃশ হওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চল প্রায়ই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়ে।
তবে এখনকার মতো এত ঘন ঘন বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আগে বাংলাদেশে হতো না। সন্দেহ নেই যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমনটা ঘটছে। উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাস কিংবা বৃষ্টির কারণে আগে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা হতেও দেখা যেত না। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিগত শতকের ষাটের দশকে উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যা মোকাবেলার জন্য নদী বরাবর অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ দিয়ে পোল্ডার তৈরির পর থেকেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। পোল্ডারের মধ্যে বড় বড় শাখা নদী বা খালগুলো বন্ধ করা কিংবা সেসব নদী-খালের মুখে সংকীর্ণ স্লুইস গেট বসানোর ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই পোল্ডারের বাইরের নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ কমে যায়। জমতে শুরু করে পলি। নদীর গভীরতা হ্রাস পায়। ফলে পোল্ডারের মধ্যে তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। পোল্ডারের মধ্যে বড় বড় শাখা নদী-খালের মুখ বন্ধ না করে কিংবা সংকীর্ণ স্লুইস গেট না বসিয়ে সেসব জায়গায় সেতু নির্মাণ করে সেসব সেতুর কাছ থেকে বড় বড় শাখা নদী-খাল বরাবর সাবপোল্ডার তৈরি করা হলে মূল নদীর প্রবাহ অনেকটাই বজায় থাকত। এ ছাড়া বেড়িবাঁধগুলো যথেষ্ট উঁচু ও মজবুত করেও তৈরি করা হয়নি।
ক্রুগ কমিশনের (কমিশন প্রধান জুলিয়ার্স আলবার্ট ক্রুগের নামানুসারে) সুপারিশের ভিত্তিতে এই পোল্ডার তৈরি করা হলেও কমিশনের সতর্কবার্তা অর্থাৎ যথেষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারগুলো আমলে নেওয়া হয়নি। সেই সময় কয়েকজন প্রকৌশলীও এই পোল্ডার কর্মসূচির সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বাস্তুতাত্ত্বিক অভিঘাত সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। এর সঙ্গে আশির দশক থেকে যোগ হয়েছে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ। যেখানে-সেখানে বেড়িবাঁধ কেটে স্লুইস গেট বসিয়ে নদীর নোনা পানি ভেতরে ঢুকিয়ে চিংড়ির ঘের করা হয়েছে। এর ফলে বেড়িবাঁধগুলো দুর্বল হওয়া ছাড়াও পোল্ডারের ভেতরের পরিবেশ গেছে পাল্টে।
ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের সময় দুর্বল হয়ে পড়া বেড়িবাঁধগুলো খুব সহজেই ভেঙে কিংবা উপচে প্লাবিত করে পোল্ডারের ভেতর। অমাবস্যা-পূর্ণিমায় জোয়ারের সময়ও একটু জোরে ¯্রােত আর ঢেউ হলেই দুর্বল এই জায়গাগুলো ভেঙে গিয়ে পোল্ডারের ভেতর পানি ঢুকে যায়। পোল্ডারের ভেতরের চেয়ে নদীতল উঁচু হয়ে যাওয়ায় ভেতরে ঢোকা পানি আর বাইরে যেতে পারে না। সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। ফসল, গাছপালা সবই ধ্বংস হয়। এলাকার মানুষের জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ যন্ত্রণা। এ ছাড়া বিশাল এলাকাজুড়ে চিংড়ির ঘেরে ক্রমাগত নোনা পানি ঢুকিয়েও একধরনের জলাবদ্ধতা তৈরি করা হয়। উপকূলীয় এলাকায় অনেক সময় বৃষ্টির পানিতেও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।

দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার অভিঘাতে সেখানকার জীব প্রজাতির উল্লেখযোগ্য সদস্যরা হারিয়ে গেছে। গোটা এলাকার বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন ঘটেছে। খাওয়ার পানি তথা মিষ্টি পানির সংকট, শস্য না হওয়া, গবাদি পশু পালন সমস্যা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, যাতায়াতের অসুবিধাসহ নানা ধরনের দুর্গতি নেমে আসে এলাকার মানুষের জীবনে। গত শতকের মধ্য আশির দশক থেকেই উপকূলের মানুষকে পোহাতে হচ্ছে এই দুর্ভোগ।

উপকূলীয় এলাকায় এসব দুর্ভোগ কমানোর জন্য সরকার বিভিন্ন সময় নানা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে বেড়িবাঁধ সংস্কার, নদী খনন, নদীতীর বনায়ন অন্যতম। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই কাজগুলো আশানুরূপ সম্পন্ন হয়নি। বিশেষ করে অনেক জায়গার বেড়িবাঁধ ঠিকমতো মেরামত করা হয়নি। ফলে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের থেকে কম গতিতে বাংলাদেশে আঘাত করলেও বেড়িবাঁধের ক্ষতি তুলনামূলক বাংলাদেশেই বেশি হয়েছে।

আম্পান-উত্তর পরিস্থিতিতে গত ১৫ জুন (২০২০) সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটি এক মানববন্ধনে বেশ কয়েকটি দাবি উত্থাপন করে। এর মধ্যে উঁচু, মজবুত ও টেকসই (ভিত্তি ১০০ ফুট, উচ্চতা ৩০ ফুট ও ওপরে চওড়া ৩০ ফুট) বেড়িবাঁধ পুনন্র্মিাণ, বাঁধের নদীর পাশে যথেষ্ট জায়গা রেখে সেখানে বৃক্ষ রোপণ, ভাঙনপ্রবণ এলাকায় কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ, খাওয়ার পানির স্থায়ী সমাধান, মিষ্টি পানির জলাধার নির্মাণ, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র ও মাটির কেল্লা তৈরি উল্লেখযোগ্য। এই দাবিগুলো শুধু সাতক্ষীরা নয়, বরং বিস্তীর্ণ উপকূলের প্রায় সব এলাকার জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকার সব নদীর পলি অপসারণ, ভরাট হওয়া নদীগুলো খনন ও পোল্ডারের মধ্যে একসময়ের প্রবহমান স্রোতোধারা ফিরিয়ে আনাও প্রয়োজন। চিংড়ি চাষ বা অন্য কোনো কারণে যেন বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তার জন্য কঠোর নজরদারি ও দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার। উপকূলবাসীর কান্না প্রশমন করতে হলে এই কাজগুলো সম্পন্ন করা প্রয়োজন।

লেখক: অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়