উপকূলের উৎকণ্ঠা


116 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
উপকূলের উৎকণ্ঠা
সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২২ দুুর্যোগ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে দেখা দেওয়া জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে ষাটের দশক থেকে উপকূলীয় এলাকায় যে বাঁধ নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছিল, এর বেশিরভাগই আর আগের মতো সুরক্ষা দিতে পারছে না একাধিক কারণে। আমরা দেখে আসছি- একদিকে একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ে কমবেশি ৭ হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত এই বাঁধগুলো যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; অন্যদিকে জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা বেড়ে চলেছে। আবার ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও ভরা কটাল ও মরা কটালে দেখা দেওয়া জোয়ারের উচ্চতা ও বিস্তৃতিও যে ক্রমে বাড়ছে। বিশেষত নিম্নচাপ দেখা দিলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে উপকূলজুড়ে। সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার বহেরা গ্রামের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে- কীভাবে অমাবস্যা-পূর্ণিমা ‘ভয়ংকর রূপে’ আসে। কীভাবে বসতঘর জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় এবং ভাটার পর ঘর গোছানোর বিড়ম্বনা চলে। এমন চিত্র শুধু বহেরা গ্রামের নয়; উপকূলীয় এলাকার প্রায় সব জনপদের।
বস্তুত অপেক্ষাকৃত ছোট ঘূর্ণিঝড়ের কথা বাদ দিলেও সিডর, আইলা, আম্পানের মতো ‘সুপার সাইক্লোন’ এই বাঁধ নেটওয়ার্কের উল্লেখযোগ্য সম্পূর্ণ বিলীন করেছে, ভেঙেছে বা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবোকে উদ্ৃব্দত করে সহযোগী একটি দৈনিকে চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যাচ্ছে, উপকূলজুড়ে ৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি বাঁধই এখন বিলীন অথবা জরাজীর্ণ। আরও উদ্বেগের বিষয়, একেকটি ঘূর্ণিঝড়ে মুহূর্তেই যে বাঁধ বিধ্বস্ত হয়; তা মেরামত হয় না বছরের পর বছর। বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে জলোচ্ছ্বাস, জোয়ার, নিম্নচাপেও নোনাপানি ঢোকে। আমরা দেখেছি, গত বছর মে মাসে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ও ডিসেম্বরে ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ এবং চলতি বছর মে মাসে ঘূর্ণিঝড় অশনি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূল এড়িয়ে চলে গেছে; কিন্তু তাতে ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায়নি। জোয়ার এলাকাভেদে স্বাভাবিকের তুলনায় ৬ থেকে ৮ ফুট বেশি উচ্চতা নিয়ে এসেছিল। অনেক স্থানে বাঁধ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; তেমনই বাঁধ উপচে জোয়ারের পানি লোকালয় ও ফসলের ক্ষেতে প্রবেশ করেছে। যত দিন যাচ্ছে, এই চিত্র প্রকট হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও নিম্নচাপ ও জোয়ারের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ ও দুর্ভোগ থেকে উপকূলীয় অঞ্চল রেহাই পাচ্ছে না।
আমরা জানি, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বাংলাদেশে সক্ষমতা এখন বৈশ্বিক উদাহরণ। আমাদের দেশে নব্বই দশকে প্রণীত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশ একটি কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে ইতোমধ্যে প্রমাণিত। যে কারণে নব্বইয়ের দশকের পর ক্রমেই কমতে থাকে প্রাণহানি। ঘূর্ণিঝড় থেকে সুরক্ষায় স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে নকশা করার উদ্যোগও যথেষ্ট উদ্ভাবনমূলক। এমনকি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জলোচ্ছ্বাস ও প্লাবন মোকাবিলায় যে মাটির ঢিবি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেই ‘মুজিব কেল্লা’ এখনও দুর্যোগ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখছে। এই ব্যবস্থা বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় থেকে গবাদি পশু রক্ষায় হয়ে উঠছে অন্যতম প্রধান ভরসা। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা যেভাবে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যান, তার উদাহরণও বিশ্বে কম। এও স্বীকার করতে হবে, আমাদের ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাস ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানের। এখন নজর দিতে হবে বাঁধ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী ও সংহত করার দিকে।
সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় উপকূলীয় বাঁধগুলোর উচ্চতা আরও অন্তত ১০ ফুট বাড়ানো উচিত বলে আমরা মনে করি। তাহলে ফসল ও বসতবাড়ির ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি যখন দৃশ্যমান; লবণাক্ততার আওতা যখন ক্রমে বাড়ছে; তখন এর বিকল্পও নেই। আমরা বারংবার বলে আসছি- বাঁধের উচ্চতা বাড়াতে না পারলে উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বাড়তেই থাকবে। উপকূলীয় বাঁধ যদি মজবুত না হয়, তাহলে নোনাপানি ফসলের ক্ষেতে প্রবেশ করে খাদ্য উৎপাদন ও জীবিকা বিপন্ন করতেই থাকবে। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের আশঙ্কাই সত্য প্রমাণ হচ্ছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আগেই উপকূলের উৎকণ্ঠা দূর করা হবে বলে প্রত্যাশা।

#