ঋণের টাকায় ঋণ শোধ !


196 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
ঋণের টাকায় ঋণ শোধ !
সেপ্টেম্বর ৩, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

প্রণোদনার অপব্যবহারের আশঙ্কা, সতর্ক করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

অনলাইন ডেস্ক ::

নতুন ঋণ নিয়ে আগের ঋণ পরিশোধ করার মতো অনিয়ম হচ্ছে। ঋণগ্রহীতাদের একটি অংশ এভাবে ঋণের অপব্যবহার করছে। এতে করে খেলাপি ঋণের নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এক খাতের নামে ঋণ নিয়ে অন্য খাতে ব্যবহারের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগে থেকেই কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এই করোনাকালে নতুন ঋণ নিয়ে আগের ঋণ পরিশোধ করার প্রবণতা টের পেয়ে ব্যাংকগুলোকে বিশেষভাবে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে গতকাল বুধবার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, গ্রাহকের অনুকূলে দেওয়া ঋণ দিয়ে গ্রাহকের বিদ্যমান অন্য ঋণের দায় পরিশোধ বা সমন্বয় করা হচ্ছে, যা ঋণ-শৃঙ্খলার পরিপন্থি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন কোনো ব্যবসা বা বিনিয়োগের জন্য ঋণ নিয়ে আগের ঋণ পরিশোধ করার অর্থ হলো, তিনি ঋণের যথাযথ ব্যবহার করছেন না। ওই ঋণ কোথাও বিনিয়োগ করার কথা এবং সেখান থেকে আসা মুনাফার মাধ্যমে ঋণ পরিশোধ করার কথা। এর ব্যত্যয় হওয়া মানেই ঋণটি খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল।
ব্যাংকাররা জানান, ব্যাংকগুলো এখন যে ঋণ দিচ্ছে, তার প্রায় সবই বিতরণ করছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সরকারের প্রণোদনার আওতায়। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঋণ চলতি সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে বিতরণ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ মুহূর্তে প্রণোদনার বাইরে ঋণ বিতরণ খুব কম হচ্ছে। ফলে এখন কম সুদের প্রণোদনার ঋণের অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা বেশি। তারা বলেন, প্রণোদনাসহ সব ঋণের সুদহার এখন ৯ শতাংশ। তবে প্রণোদনার আওতায় বিতরণ করা ঋণের সুদহারের অর্ধেক এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার বেশি হারেও ভর্তুকি হিসেবে ব্যাংকগুলোকে দিচ্ছে সরকার। এর মানে, গ্রাহক প্রচলিত সুদের অনেক কম হারে এখন ঋণ পাচ্ছেন। যে কারণে কেউ হয়তো কম সুদে চলতি মূলধন ঋণ নিয়ে বেশি সুদের পুরাতন ঋণ সমন্বয় করছেন। এতে করে সরকার কর্মসংস্থান ধরে রাখার যে উদ্দেশ্যে সুদ ভর্তুকি দিচ্ছে, তা ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুসরণ করে গ্রাহককে যে উদ্দেশ্যে ঋণ দেওয়া হয়েছে বা হবে, সে উদ্দেশ্যেই ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত তদারকির নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৮ সালে জারি করা এক সার্কুলারের মাধ্যমে কিস্তিভিত্তিক প্রকল্প ঋণের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী কিস্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়ে পরবর্তী কিস্তি ছাড় করা এবং কোনো ঋণের অর্থ মঞ্জুরিপত্রে বর্ণিত খাতের পরিবর্তে অন্য খাতে ব্যবহার হলে ব্যাংককে তার কারণ উদ্‌ঘাটনসহ তা রোধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তবে সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, গ্রাহকের অনুকূলে দেওয়া ঋণ দিয়ে গ্রাহকের বিদ্যমান অন্য ঋণের দায় পরিশোধ বা সমন্বয় করা হচ্ছে। নীতিমালার যথাযথ পরিপালন নিশ্চিত করতে এ মর্মে নির্দেশনা দেওয়া যাচ্ছে, একটি ঋণের অর্থ দিয়ে কোনোভাবেই অপর কোনো ঋণের দায় পরিশোধ বা সমন্বয় করা যাবে না। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পরিবীক্ষণ করার নির্দেশনা দেওয়া হলো। মতামত জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ঋণ নিয়ে আগের ঋণ পরিশোধের অনেক ঘটনা আগে শোনা যায়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায় ব্যাংকারের। ঋণ দেওয়ার আগে ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। প্রণোদনার আওতায় চলতি মূলধন ঋণ নিয়ে অন্য খাতে ব্যবহার করলেন কিনা, সেটা দেখতে হবে।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হালিম চৌধুরী বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগের ঋণ সমন্বয় না করার বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করছে। এ নিয়ে ব্যাংকগুলোও সতর্ক রয়েছে। এরপরও কোনো গ্রাহকের হয়তো প্রয়োজন নেই, তারপরও তিনি কম সুদের প্রণোদনার ঋণ নিচ্ছেন। এক শাখা বা এক ব্যাংক থেকে প্রণোদনার ঋণ নিয়ে আরেক ব্যাংকের দায় শোধ করছে। এমন হয়ে থাকলে সেটা অন্যায়।
মধুমতি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সফিউল আজম বলেন, যে খাতের নামে ঋণ দেওয়া হবে, সেই খাতে ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে আগে থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে। ব্যাংকগুলোরও দায়িত্ব সঠিক খাতে ঋণের ব্যবহার নিশ্চিত করা। তার ধারণা, কোনো কোনো গ্রাহক এখন হয়তো কম সুদের প্রণোদনার টাকা নিয়ে বেতন-ভাতা পরিশোধ বা চলতি মূলধন ব্যয় না মিটিয়ে আগের ঋণ পরিশোধ করছেন। সে ক্ষেত্রে ব্যাংকারদের অবশ্যই দায় আছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান বলেন, প্রতিটি ঋণের একটি উদ্দেশ্য থাকে। সে বিষয়ে গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকের চুক্তিও থাকে। নতুন ঋণ যে উদ্দেশ্যে দেওয়া হচ্ছে, সে কাজেই ব্যবহার করতে হবে। আর আগের ঋণ আগের নিয়মে চলবে। তা না করে এই করোনাকালে কেউ যদি প্রণোদনার আওতায় দেওয়া কম সুদের ঋণ নিয়ে বেতন-ভাতা পরিশোধ বা চলতি মূলধনের নিয়মিত ব্যয় না মিটিয়ে আগের ঋণ পরিশোধ করেন, তাহলে ঋণ নিয়মাচার চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
ঋণ নিয়ে ঋণ শোধ বা অন্য কাজে ব্যবহারের মতো অনিয়ম যে এখন ঘটছে, তা নয়। এর আগেও অনেক প্রতিষ্ঠান এই অনিয়ম করেছে। ঋণের টাকা অপব্যবহার করা বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই এখন ডুবতে বসেছে। দেশের একসময়কার সেরা তথ্যপ্রযুক্তি আমদানিকারক ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার সোর্স ব্যবসা বাড়ানোর কথা বলে ঋণ নিয়ে জমি কিনেছিল। বিভিন্ন ব্যাংকে ৫৬৮ কোটি টাকার খেলাপি হয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিক দীর্ঘদিন পলাতক। ব্যাংক খাতের আলোচিত ক্রিসেন্ট গ্রুপ ভুয়া রপ্তানি বিল তৈরি করে তার বিপরীতে ঋণের নামে জনতা ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে। জনতা ব্যাংকে এই গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ এখন চার হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির মালিক এম এ কাদের সম্প্রতি জেল থেকে ছাড়া পেলেও তার ব্যবসা দীর্ঘদিন বন্ধ।
একসময় সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করা গোয়ালিনী কনডেন্সড মিল্ক্ক, মুসকান আটা-ময়দার মালিকানাধীন এসএ গ্রুপ ব্যবসার নামে ঋণ নিয়ে বিলাসবহুল বাড়ি, জমি কেনাসহ নানা কাজে খাটিয়ে বিপদে আছে। দেউলিয়ার পথে থাকা এই গ্রুপের ছয় প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ এখন দুই হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এসএ গ্রুপের কর্ণধার মো. শাহাবুদ্দিন আলমকে ২০১৮ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একসময় দেশের শীর্ষ জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান আনন্দ শিপইয়ার্ড এখন ব্যাংক খাতে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার খেলাপি। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অন্য কাজে ব্যবহার করায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম এখন বন্ধ। ব্যাংক খাতের আলোচিত ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান অ্যাননটেক্স, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, ইলিয়াস ব্রাদার্স, রাইজিং স্টিলসহ বেশিরভাগই ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান এক খাতের নামে ঋণ নিয়ে অন্য খাতে ব্যবহার করেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শনে উঠে এসেছে। একপর্যায়ে এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ঝামেলায় পড়েছে। আবার ব্যাংককেও বিপদে ফেলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রণোদনার আওতায় ব্যাংকগুলো এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে বড় শিল্প ও সেবা খাতে। শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ঘোষিত ৩৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা বিতরণ শেষ হয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে এ ক্ষেত্রে সুদহার নির্ধারিত আছে সাড়ে ৪ শতাংশ। আর এসএমই খাতের ২০ হাজার কোটি টাকা থেকে বিতরণ হয়েছে মাত্র তিন হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে গ্রাহক মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছেন। আর সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে ৫ শতাংশ। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক, বৈদেশিক বাণিজ্য, প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে প্রণোদনার আওতায় ঋণ বিতরণ হচ্ছে।