এই ভার কেমন করে বইবে বাংলাদেশ


287 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
এই ভার কেমন করে বইবে বাংলাদেশ
সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৭ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::
‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান’- কিন্তু ছোট্ট এই বাংলাদেশে ভিন্ন দেশের কত শিশুর স্থান সংকুলান হবে? পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে সংখ্যায় শিশুরাই বেশি। তারপরই রয়েছে নারী। সে তুলনায় কর্মক্ষম পুরুষ হাতেগোনা। অপ্রত্যাশিত এই রোহিঙ্গাদের ভার কেমন করে বইবে বাংলাদেশ।

 

গত বুধবার জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি লেকের দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, রাখাইনে সাম্প্রতিক সহিংসতার পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা এক লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গার ৮০ শতাংশের বেশি নারী ও শিশু। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, রাখাইনের আরও এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় আছে। তবে টেকনাফ ও উখিয়ার স্থানীয় লোকজনের দাবি, ২৪ আগস্টের পর পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা এক লাখ ২৫ হাজারের অনেক বেশি হবে। স্থানীয় এই লোকজনের মতে, টেকনাফ পৌরসভার ৪০ কিলোমিটার দূরের পুথিন পাহাড়ে যে রোহিঙ্গা বস্তি গড়ে তোলা হয়েছে, শুধু সেখানেই এর মধ্যে দেড় লাখের মতো রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।

 

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালের দিকে চেষ্টা করেও পুথিন পাহাড়ের নতুন রোহিঙ্গা বস্তিতে পেঁৗছানো গেল না। উংছিপ্রাং এলাকায় টেকনাফ সড়ক থেকে কাঁচা সড়কে নেমে মোটরসাইকেলে আধা কিলোমিটার যাওয়ার পর রাস্তার ভয়াবহ অবস্থা দেখা গেল। আমাদের মতো নাজুক নাগরিক মধ্যবিত্তের পক্ষে হাঁটু সমান কাদামাটির ওই পথ ঠেলে আর এগোনো সম্ভব নয়। ওখান থেকে আরও আধা কিলোমিটার দূরে পুথিন পাহাড়ের পাদদেশে টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। ওই রোহিঙ্গাদেরই এক নারী নূর বেগম সপ্তাহখানেক হলো বাংলাদেশের মাটিতে পেঁৗছার আগে আগে মিয়ানমারে পাহাড়ের ঢালে জন্ম দিয়েছেন এক কন্যাসন্তানের। টেকনাফ থেকে পুথিন পাহাড়ের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পর কয়েক কিলোমিটার যেতেই মৌচনি এলাকায় দেখা পেলাম নূর বেগমের। সাত দিনের ওই ছোট্ট মেয়েটিকে কোলে নিয়ে গাছতলায় বসে ছিলেন তিনি। নূর বেগমের সঙ্গে আলাপের একপর্যায়ে সেখানে এলেন তার স্বামী আবদুস সালাম। নূর বেগম ও আবদুস সালামের গ্রাম ছিল মংডুর ওপারে। রাশিদং-এর নীলাম্বর পাড়ায়। বহুপথ হেঁটে পাড়ি দিতে হয়েছে তাদের। বার্মিজ টাকা-পয়সা যা ছিল তা নাফ নদী পাড়ি দেওয়ার নৌকাভাড়াতেই শেষ হয়ে গেছে। পরে বাংলাদেশের শাহপরীর দ্বীপে এসে তিন হাজার টাকার বিনিময়ে নূর বেগম তার নাকফুলটি বিক্রি করে দিয়েছেন। রোহিঙ্গা সধবা নারীদের আর কোনো অলঙ্কার না থাকলেও নাকফুলটি সবারই নাকে শোভা পায়। তারা মনে করেন, তার বৈধব্য থেকে তাকে রক্ষা করে নাকফুল। সেই নাকফুল বিক্রি করে দিতে হয়েছে বলে মন খারাপ নূর বেগমের। তবু ভাগ্য ভালো সন্তানদের সবাইকে জ্যান্ত নিয়ে আসতে পেরেছেন। নূর ও সালামের এখনও নাম না রাখা সাত দিনের মেয়েটিসহ সন্তানের সংখ্যা আট।

 

আট সন্তানের পরিবার রোহিঙ্গা সমাজে খুব বড় নয়, কোনো কোনো রোহিঙ্গা নারীর এর দ্বিগুণ সন্তানসন্ততিও রয়েছে। এমনই একজন হাশিমা খাতুনের সঙ্গে আলাপ হলো উংছিপ্রাং এলাকায় ঢুকতেই। হাশিমা জানালেন, তার স্বামী ফয়জার হোসেন খুন হয়েছেন নয় দিন হলো। তাদের গ্রামের বাড়ি রাখাইন প্রদেশের আংডাংয়ে। ওইদিন ফয়জার তার গৃহপালিত গরুটি নিয়ে মাঠে গিয়েছিলেন। প্রথমে সেনাবাহিনী এসে গুলি করে গরুটিকে। তারপর ফয়জারকেও। হাশিমার দাবি, ফয়জার বেঁচে ছিলেন গুলির পরও। তিনি নিজের চোখে দেখেছেন এরপর তাদের একই গ্রামের তংথু থাম নামে এক রাখাইন এসে ফয়জারের গলা কাটে। গ্রামেরই দুই ভাই সলিমুল্লাহ ও আরিফুল্লাহ বাধা দিতে গিয়ে গুরুতর আহত হন। এই ঘটনার পর হাশিমা তার সাত ছেলে ও চার মেয়ে নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেন। হাশিমার বড় ছেলে জাহিদ হোসেনের বয়স ৩২ বছর এবং হাশিমার বয়স ৪৫।

 

রোহিঙ্গাদের এত বেশি সন্তানসন্ততি থাকার কারণ কী জানতে চাওয়া হলে টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি আবদুল মতলব বলেন, গরিব মানুষের সন্তানসন্ততি সব সময়, সব দেশেই বেশি হয়। কারণ, তারা মনে করে সন্তানরাই তাদের সম্পদ। এক যুগেরও অধিক সময় আগে মিয়ানমার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা এই রোহিঙ্গা নেতা বলেন, রাখাইনে সংখ্যায় রোহিঙ্গারা অধিক নয়, তারা খুবই দরিদ্র। তদুপরি সরকার তাদের ওপর বছরের পর বছর নিপীড়ন চালাচ্ছে, ফলে সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখাও কঠিন। তাই সবাই রিজিকের মালিক আল্লাহ_ এই বিশ্বাস থেকেই একের পর এক সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন। তার কাছে রাখাইনে নতুন করে সেনা অভিযান শুরু হওয়ার পর কত রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে এসেছে, এমন একটি ধারণা পেতে চাইলে তিনি বলেন, আনুমানিক তিন লাখ হবে। তিনি জানান, এর আগে কয়েক দশকে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যাও তিন লাখের মতো। এবার আরও আসবে। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের থাকতে দেবে না সেনারা। ওখানে সেনারা এই পর্যন্ত কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ হত্যা করেছে। তাদের মধ্যে যুবকের সংখ্যাই বেশি। তার প্রশ্ন_ আমরা রোহিঙ্গারা কোথায় যাই, কাকে বলি মৃত্যু থামাও।

 

স্থানীয় প্রশাসনের কোনো সূত্রই এবার আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা কত তা জানাতে পারছে না। টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাহিদ হোসেন সিদ্দিক জানান, পুথিন পাহাড়ে নতুন করে গড়া রোহিঙ্গা বস্তিতে এই পর্যন্ত ৬০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। তাদের এখনও সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

 

প্রকৃতপক্ষে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার অন্তত ৩৯টি সীমান্ত এলাকা দিয়ে ঢুকছে রোহিঙ্গারা। তাদের অনেকেই নতুন-পুরোনো কোনো ক্যাম্পে না গিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে এই দুই জেলার গ্রাম-গ্রামান্তরে। গতকাল দুপুরে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের বেড়িবাঁধের ওপর হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী দেখা যায়। নৌকায় নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে এসেছে তারা। শাহপরীর দ্বীপে কথা হয় কিশোরী তসলিমার সঙ্গে। তাদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনী। পোড়া পায়ের ব্যথায় কাতরাচ্ছিল ওই কিশোরী। নৌকা থেকে নেমে মা রহিমা খাতুনকে বাঁশের ঝুড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন দুই ভাই এরশাদ ও আবদুল্লাহ।

 

দুপুরের ওই সময়টায় শাহপরীর দ্বীপের ঘাটে গোটাবিশেক রোহিঙ্গা বহনকারী নৌকা ভিড়তে দেখা যায়। সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর হোসেন বলেন, তার ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপসহ কয়েকটি ঘাট দিয়ে প্রতিদিনই গড়ে ৩০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা শরণার্থী ঢুকছে। প্রতিদিনের মতো গতকালও শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় ঘটেছে দুটি নৌকাডুবির ঘটনা। গত বুধবার রাত ১০ টা থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত নাফ নদী ও সমুদ্রসৈকতে ভেসে আসা ১৭টি লাশ পাওয়া গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাইন উদ্দিন খান। এর মধ্যে পুরুষ দু’জন, ছয় নারী এবং নয় শিশু।
আওয়ামী লীগের টেকনাফ উপজেলা শাখার সভাপতি ও কক্সবাজার-৪ (উখিয়া ও টেকনাফ) আসনের সাবেক সাংসদ মোহাম্মদ আলী বলেন, মানবিক কারণেই রোহিঙ্গাদের আসায় কেউ বাধা দিচ্ছে না। তবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার অতীত অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয়। যারা একবার এসেছে, তাদের আর ফিরিয়ে দেওয়া যায়নি। রোহিঙ্গাদের কারণে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এবার রোহিঙ্গা আসার স্রোত অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এই ভার কেমন করে বইবে বাংলাদেশ? তাই আমাদের উচিত হবে যত দ্রুত সম্ভব তাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমদ বলেন, মিয়ানমারে বিচ্ছিন্নতাবাদী বা উগ্রপন্থিদের দমনের নামে সামরিক বাহিনী যে অভিযান শুরু করেছে তা এথনিক ক্লিনজিং, স্পষ্ট গণহত্যা। এ কাজ মিয়ানমারের সামরিক স্বৈরশাসকেরা শুরু করেছিল। আশা করা গিয়েছিল গণতন্ত্র এলে নিপীড়নের অবসান ঘটবে, কিন্তু ঘটেনি। এখন আমরা যে শরণার্থীদের আশ্রয় দিচ্ছি, চেষ্টা করতে হবে গণহত্যা যাতে থামে এবং ওই শরণার্থীরা যাতে নিরাপদে ও সসম্মানে নিজেদের দেশে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। এর জন্য প্রথম ও প্রধান কাজ ঘটনার বাস্তবতা ও ভয়াবহতা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা। বিষয়টিকে জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের কাছে নিয়ে যাওয়া চাই। গত ৩০ আগস্ট নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা নিয়ে আলোচনার পর থেকেই আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবীর অবশ্য নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা নিয়ে আলোচনায় এখনও খুব আশার কিছু দেখছেন না। তিনি বলেন, সেখানে চীনের আপত্তির কারণে আলোচনা থেমে গেছে। তবে এরই মধ্যে তুরস্ক ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলো সাড়া দিয়েছে। দশকের পর দশক মিয়ানমারের হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ, যা আমাদের জন্য বিরাট বোঝা। বিষয়টি সমাধানে প্রথমত, মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করতে হবে, তবে এ চেষ্টা যে খুব ফলপ্রসূ হবে না, তা বোঝাই যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন দেশকে সংবেদনশীল করে চাপ প্রয়োগ।