একজন বনসাই প্রেমিক উৎপল


1191 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
একজন বনসাই প্রেমিক উৎপল
অক্টোবর ৬, ২০১৬ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

মো: আসাদুজ্জামান সরদার:
কেউ ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন! কেউ বই পড়তে! কারো আবার প্রিয় পশু-পাখি পোষা। কারো আবার বাগান করার সখ! এমন একজন মানুষ যার বৃক্ষের প্রতি অগাদ ভালোবাসা। বৃক্ষই ধ্যান, বৃক্ষই জ্ঞান, বৃক্ষই তার সাধনা। পড়াশুনা করছেন বিবিএ শেষ বর্ষে। কিন্তু পড়াশুনায় তার মন নেই। বলছি, বৃক্ষ প্রেমিক উৎপলের কথা। তার পুরো নাম বোরহান উদ্দিন খান উৎপল। বয়স ২৫।
তিনি সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল চৌরঙ্গী মোড়স্থ নিজের বাড়ির ভিতরে প্রায় আড়াই শতাধিক ফলজ, বনজ ও ওষধী গাছ লাগিয়ে বাড়ি ভরে ফেলেছেন। বাড়ির ছাদে উঠতেই ছোখ ছানাবড়া সারি সারি বট গাছ দেখে। ছাদ জুড়ে ১৫ বয়সী বট বৃক্ষসহ বিভিন্ন বৃক্ষের সমাহার। এটি কি সম্ভব। হ্যা, তার দ্বারা সম্ভব কারণ তিনি একজন সৌখিন বনসাই শিল্পী। অসাধ্য সাধন করে তিনি বড় বড় বট গাছকে খর্বাকৃতি করার পাশাপাশি বিভিন্ন আকৃতি দিয়েছেন। ছোট ছোট বট গাছে ফল হয়েছে, ছোট গাছে ধরেছে মালটা। গাছ দিয়ে লিখেছেন আল্লাহ, টপের মধ্যে ইট বসিয়ে ইটের উপর গাছ লাগিয়েছেন। এ যেন জীবন্ত শিল্পকর্ম। সবুজের সমারোহ দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। ১৫ বছর ধরে পরম যতেœ এগুলো গড়ে তুলেছেন এই সখের বাগান।

bonsai-tree-9

 

 
সরেজমিনে গিয়ে তার বাড়িতে দেখা গেল, দিনের বেলায়ও মাটিতে যেন একটু আলো পড়ার সুযোগ নেই। পড়বে বা কী করে? প্রাচির ঘেরা বাড়িতে বড় বড় গাছ লাগানো হয়েছে। কিন্তু এগুলো তো কিছুই না। তার বাড়ির ছাদে রয়েছে অন্যতম আকর্ষণ বনসাই গাছ। এগুলো দেখে মানুষের চোখ ছানাবড়া।  ২৫ বছরের এই তরুণ পরম যতেœ নিজ বাড়ির ছাদে গড়ে তুলেছেন মিনি এক বন! দুপুরের টানা রোধে টপের ভিতরের ঘাস পরিস্কার, গাছের মরা পাতা কাটার কাজ করছেন। ছোট বেলা থেকে এসব কর্মকান্ডের কারণে বন্ধুরা কেউ বট পাগলা, কেউ বৃক্ষ প্রেমিক নামে ডাকে। এটি শুনে নাকি তার ভালো লাগে। তাঁর বাড়িকে মানুষ ‘বনসাই বাড়ি’ নামে চেনে। ঘুরে দেখান তাঁর শখের বাগান এবং খাওয়ালেন তার বাগানের মাল্টা। শুধুই কী ছাদ, বাড়ির চতুরপাশে শুধু গাছ আর গাছ। বড় বড় গাছগুলো তার মায়ের হাতে লাগানো। তার দাদাও ছিলেন বৃক্ষ প্রেমিক।
তার বাগানে রয়েছে দেশী বট, চায়না বট, পাকড় বট, লোটা বট, ঔষধ বট, খুদে বট, থাই বট, ভ্যায়া কাটা বট, সাইকাস বট, বাটার ফ্লাই বটসহ ১৫ প্রজাতির বনসাই বট বৃক্ষ। এছাড়া তিনি সুন্দরবনের নোনাপানির গেওয়া প্রসেসিং করে মিষ্টি করে সেটিও বনসাই করেছেন। সৌদি আরবের খেঁজুর গাছও বনসাই করার প্রস্তুতি বলছে।
এছাড়া তার তার বাাগানে দেশি-বিদেশি  ৪১ প্রজাতির বনসাই গাছ আছে একশতটি। সে গুলো হলো- দুই জাতের কামিনী ফুল, বকুল ফুল, বুঝগাছ, চেরী ফল, ছফেদা, তেতুল, জেদী, বনজাম, ছেতিম, সেড়া, পাইন, ছাপোলা, দুই জাতের পেয়ারা, জিলভার ডাষ্ট, স্বেত চন্দন, চায়না কমলা, অস্টেলিয়ান কমলা, জুই ফুল গাছ, এডিমিনিয়ান, ঝাউগাছ, শিমুল, টগর ইত্যাদি।
বোরহান উদ্দিন উৎপল জানালেন বনসায়ের প্রেমে পড়ার কাহিনী, আমার মা এবং চাচা বৃক্ষ প্রেমিক। দাদাও ব্যাপক গাছ লাগাতেন। ছোট বেলা থেকে পশু-পাশি পোষতাম পাশাপাশি স্কুলের টিফিনের টাকা বাচিয়ে বিভিন্ন বৃক্ষের চারা কিনে বা রাস্তার গাছের চারা পেলে সেটি এনে বাড়ির বিভিন্ন জায়গা রোপন করতাম। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালিন সাতক্ষীরা শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে বৃক্ষ মেলায় যেয়ে বনসাইয়ের প্রেমে পড়ে যাই। তার পর কাঞ্চন ব্যানার্জি ছট্টু (তিনি এখন আর বেচে নেই) দাদার কাছ থেকে নিয়ম শিখে শুরু করে দেয় বনসাই করার কাজ।  প্রথম যে বনসাইটি তৈরী করেছি তার বয়স এখন ১৫ বছর। সবচেয়ে বড় কথা বনসাই এমনি একটি শিল্প যার মাধ্যমে বৃক্ষকে ইচ্ছামতো রূপ দেওয়া যায়।
বনসাই প্রেমিক ২৫ বছরের এই তরুণ আরো বলেন, এখন শখের বশে বনসাই করেন তারা আমাকে ডেকে নিয়ে যায় এবং আমি তাদের বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়ে থাকি।
তিনি আরো বলেন, ছোট বেলা থেকে আমি পশু-পাখির প্রতি আকৃষ্ট ছিলাম। জীবনে অনেক কিছু পুষেছি। কুকুর পুষতে ভালো লাগে। কিন্তু বাড়ি থেকে বাধা দেওয়ায় এসব এখন আর পোষা হয় না। একবার একটি বেশী পুষে ছিলাম আম্মা ছেড়ে দিয়েছিল। সেই বেজি এখন আমাদের ঘর-বারন্দায় মাঝে মাঝে ঘুরতে দেখা যায়।
বাণিজ্যিকীকরণের ইচ্ছে আছে কিনা জানতে চাইলে উৎপল বলেন, এখন পর্যন্ত এটা আমার কাছে একটা শিল্পকর্মই এবং বিক্রি করার কথা শুনলে কষ্ট লাগে। তবে খুব তাড়াতাড়ি বাণিজ্যিকভাবে বনসাই বিক্রি করার কাজ শুরু করবেন বলে তিনি জানান। বনসাই শখের পাশাপাশি এটি বাণিজ্যিকভাবে করা যায়। কিছুদিন আগে এখন একটি বনসাই ১৭ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিল কিন্তু আমি দেয়নি। মায়া লাগে।
প্রতিদিনি মাত্র বিকেলে মাত্র দুই ঘন্টা বনসাইয়ের পেছনে সময় দিয়ে বছরে অনেক টাকা আয় করা সম্ভব। প্রতিটি বনসাই ২ হাজার থেকে ২০/২৫ হাজার টাকায় বিক্রিয় হয়। একটি বনসাই পূর্ণাঙ্গ রূপ নিতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে। এ পেশায় আসতে হলে প্রথমে দরকার ধৈর্য্য।
তার ব্যবহৃত ল্যাপটপ খুলে দেখালেন তাতে বিভিন্ন ধরণের বনসাইয়ের ছবি আর রয়েছে ইউটিউব থেকে নামানো বনসাইয়ের অনেক ভিডিও চিত্র। এখান থেকে পান গাছকে খর্বাকৃতি করার সম্পর্কে নানা শিক্ষা। বনসাই সম্পর্কে জানতে নিয়মিত ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাটি করেন তিনি।
২২ ফুট লম্বা একটি মরিচ গাছ তৈরী করে সেটিতে ৩ হাজার মরিচ করে ২০০১ সালে সাতক্ষীরা কৃষি মেলায় প্রথম পুরস্কার লাভ করেন।
অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার বাবা আলাউদ্দিন খান ও গৃহিনী মা নাজমুন নাহার খান দম্পতির দুই ছেলের মধ্যে উৎপল ছোট। পড়াশুনা অমনোযোগির কারণে প্রথম দিকে পরিবার থেকে তার এই কাজে বাধা পেলেও এখন সবাই তাকে সাহায্য করে।
নিজ বাড়ির ছাদে শত প্রকার ফল ও ফুলের গাছ লাগিয়ে নান্দনিক রূপ দিয়েছেন সাতক্ষীরা বঙ্গবন্ধু পেশাভিত্তিক হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক লায়লা পারভীন সেজুতি। তার বাড়ির ছাদকে সাজিয়েছেন অপরূপ সৌন্দর্যের আবরণে। যেদিকে তাকানো যায় যেনো সুন্দরের আগুণ। সেজুতি বলেন, বনসাই একটি শিল্প। আমার অনেকদিন থেকে বনসাই করার সখ ছিল। কিন্তু সময় আর সুযোগের অভাবে করা হয়ে উঠেনি। উৎপলের দেখে শুরু করেছি। ও (উৎপল) যেটি করেছে সত্যি অসাধারণ কাজ। এই বসয়ী ছেলে এটি করতে পারে আমি ভাবিনী। বাণিজ্যিকভাবে বনসাই তৈরী করে বেকার যুবকদের স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব বলে জানান তিনি।