একাদশ শ্রেণীর নতুন শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক পাচ্ছে তো ?


636 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
একাদশ শ্রেণীর নতুন শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক পাচ্ছে তো ?
আগস্ট ১১, ২০১৬ আশাশুনি ফটো গ্যালারি শিক্ষা
Print Friendly, PDF & Email

শেখ আসাদুজ্জামান মুকুল,দরগাহপুর :
আশাশুনির দরগাহপুর বাসষ্টান্ডের অরিন লাইব্রেরীতে গিয়েছিলাম একটা বই কিনতে। পড়ন্ত বিকেল সচারচর ভিড় কম হয়। কিন্তু আজ দেখলাম অনেক ভিড়। আমি একটু পাশে দাড়িয়ে থাকলাম। যারা দাড়িয়ে ছিল তারা বেশির ভাগই একাদশ শ্রেণীর বিভিন্ন বিষয়ের বই কিনছে। আমার আর বুঝতে বাকি থাকল না যে, এরা একাদশ শ্রেণীর নতুন শিক্ষার্থী। হটাৎ একটি ছেলে আমার গাঁ ঘেসে দাড়িয়ে দোকানদারকে  জিঞ্জাসা করল “ ইতিহাস প্রথম পত্রের রবি(ছদ্মনাম) পাবলিকেশনের বই আছে?” দোকানদার আন্তরিকতার সাথে উত্তর দিল “নাই ভাইয়া, শেষ হয়ে গেছে। এক দিন পর পাওয়া যাবে”। শুনেই ছেলেটি চলে গেল। হয়ত আন্য কোন লাইব্রেরীতে পাওয়া যায় কি দেখতে গেল। যারা বই কেনার জন্য দাড়িয়ে ছিল তাদের ভেতর থেকে কয়েকজন বলে উঠল তাদেরও তো ঐই একই বই লাগবে। দোকানদার আবারও আন্তরিকতার সাথে বললেন “শেষ হয়ে গেছে, তবে ওর থেকে ভাল লেখকের বই আছে, দেখাবো?” তখন একটি ছেলে বলল “ না। ঐই বই-ই লাগবে”। দোকানদার আর বেশিকিছু বললেন না।

কিছুক্ষন পর ভিড় অনেকটা কমে এলে আমি দোকানদার কে জিঞ্জাসা করলাম “যে বইয়ের এতো চাহিদা, তা বেশি করে আনেন না কেন?” দোকানদার উত্তর দিল“ ১০০ কপি এনেছিলাম, দুইদিনে বিক্রি শেষ”। আবার প্রশ্ন করালাম “এতোবেশি চাহিদার কারণ কি?” দোকানদার বলল “আমি জানি না” হাটাৎ এক ছাত্রকে পেয়ে প্রশ্ন করলাম “অনেক বই থাকতে তোমরা এই বই কিনছো কেন?” ছাত্রটি উত্তরে বলল “রফিক(ছদ্মনাম) স্যার এই বই কিনতে বলছেন। তিনি এই বই ছাড়া অন্য কোনো বই পড়াবেন না। তাই এই বই…..”। আর একটি ঘটনা, পাইকগাছার বাঁকা বাজারের জবা লাইব্রেরীতে ইচ্ছে করেই গিয়েছিলাম সেখানে কি অবস্থা দেখার জন্য, ভিড় কম। একটি ছেলে এসে জিঞ্জাসা করল “ একাদশ শ্রেণীর আমাদের বারি(ছদ্মনাম) স্যারের লেখা বইটি আছে?” দোকানদার হ্যা সূচক সংকেত দিয়ে বইটি বের করে দিলেন। ছেলেটি বইটি কিনে চলে গেল। আমি দোকানদার কে প্রশ্ন করলাম “স্যার কি সত্যিই বইটি লিখেছেন? ”। দোকানদার উত্তর দিলেন “স্যারের নাম আছে” আর কিছু বললেন না। আমি বইটি দেখতে চাইলাম দোকানদার বইটি দিলেন। কভার পেজটি উল্টাতেই চোখে পড়ল পনের জনের নাম সম্বলিত একটি বিশাল লেখক প্যানেল। যার মধ্যে, পড়ে বুঝলাম তিনজন লেখক, দুইজন সম্পাদক এবং নয়জন  সহযোগী স¯ম্পাদক। যার মধ্যে পাইকগাছা, কয়রা, খুলনা ও যশোরের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকদের নাম রয়েছে। বুঝেই গেলাম যে, পনের জন মিলে এই বই লিখেছেন ! আর তাতে স্যারের নাম থাকায় সেই সব কলেজে এই বই পড়ানো হচ্ছে এবং ছাত্র-ছাত্রীরা বইটির মানের কথা চিন্তা না করেই নিরুপায় হয়ে সেই বই কিনতে বাধ্য হচ্ছে। আসলে পনের জন মিলে একটি বই?  বিশ্বাস করতে যেন কষ্ট হল।  প্রিয় পাঠক এতক্ষন একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির বানিজ্যের এবং শিক্ষকদের বিরল প্রতিভার দুটি ঘটনা উল্লেখ করলাম।

এটি শুধুমাত্র এই দুটি এলাকার চিত্র নয়। অনেক কলেজের শিক্ষার্থীদের সাথেও একই ঘটনা ঘটছে। একাদশ শ্রেণীর নতুন শিক্ষা বর্ষ শুরুর সাথে সাথে বিভিন্ন বই কোম্পানির প্রতিনিধিরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পেছনে ধন্যা দেন। এমনকি বিভিন্ন কোম্পানি অনেক সময় বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা দিয়ে শিক্ষকদের ম্যানেজ করে বই চালাচ্ছেন। সকল শিক্ষকরা নন, তবে কিছু কিছু শিক্ষক বিভিন্ন কোম্পানির প্ররোচনায় পড়ে শিক্ষার্থীদের মানহীন বই কিনতে বাধ্য করান। অনেক শিক্ষকরা বইও লিখছেন, আবার সেই বই কেনার জন্য ছাত্র-ছাত্রীদে বাধ্য করাচ্ছেন। তাছাড়া অনেক কোম্পানি নিজেদের মানহীন বই বিক্রির জন্য কৌশলে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকদের নাম ব্যবহার করছেন। আর শিক্ষকরাও বইয়ের মানের কথা চিন্তা না করে তাদের সম্মতি দিচ্ছেন। আজ শিক্ষদের বিরুদ্ধে কলম ধরতে চাই না, কারণ আপনারা মানুষ গড়ার কারিগর, সমাজের দর্পন। আমাদের সন্তানরা, আমাদের ভাইবোনরা ও আমাদের ছেলে-মেয়েরা যাতে ভাল মানের বই পাই এবং সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয় সেটাই আমরা চাই। আমরা জানি আপনারা মেধাবী, আপনারাও পারেন পাঠ্যপুস্তক সংশ্লিষ্ট বই বা গাইড লিখতে। আর সেই বইয়ের মান ভাল না খারাপ সেটা আপনার শিক্ষার্থীদের যাচাই করার সুযোগ দিন।

তারা বাজারের আর দশটি বইয়ের সাথে তুলনা করে দেখুক, আপনার বই যদি ভাল হয় তারা সেটাই কিনবে, কিনতে বাধ্য করানো লগবে না। আপনারা যদি বিভিন্ন মানহীন কোম্পানির কাছে বিক্রি হন, তাহলে তো আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বিক্রি হয়ে যাবে। আপনারা মানুষ গড়ার কারিগর, আমরা আপনাদের কাছ থেকে বিদ্যা অর্জন করেছি, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও আপনাদের কাছে শিখবে। তাই আপনাদের (শিক্ষকদের) কাছে আনুরোধ করি “ ছাত্র-ছাত্রীরা আপনার জ্ঞানের শস্যক্ষেত্র, দয়া করে তাদের পণ্যের বাজার বানাবেন না। বরং ভাল মানের পাঠপুস্তক নির্বাচনে তাদের পথ দেখিয়ে দিন, দর্পনের আলোর ফুলঝুরি ঝরুক”।