‘এখন আর কারো কাছে হাত পাততে হয়না আমাদের’


328 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
‘এখন আর কারো কাছে হাত পাততে হয়না আমাদের’
জানুয়ারি ১৫, ২০১৯ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

নাজমুল আলম মুন্না ::

দেশে নানারকম এবং নানাধরনের পেশা রয়েছে যেখানে শ্রম দিয়ে জীবনজীবিকার উপায় খুজে পেয়েছে অনেক গ্রামীণ নারী-পুরুষ। শহর কেন্দ্রীক নারীরা গৃহশ্রমীক, বাসাবাড়ী, কলকারখানা, দোকনপাট, অফিস-আদালত, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মাছ কোম্পানী, বরফকলসহ খাবারের হোটেলে শ্রমীকের কাজ থাকলেও গ্রামীণ নারীদের জন্য তেমন কোন কাজের ক্ষেত্র দেশে সেভাবে আজও তৈরি হয়নি। কাজের সন্ধানে গ্রামের নারীদের শহরমূখি হতে হয়। আধুনিক নাগরিক সুবিধার আশায় শহরমূখী হচ্ছে মানুষ। ফলে শহরাঞ্চলে বাড়ছে জনসংখ্যা এবং যানবহন, সৃষ্টি হচ্ছে যানজটের। প্রয়োজন পড়ছে শহর বাড়ানোর কাজ। একজন গ্রামীণ নারীর জীবন ও কাজের ব্যাপ্তী অনেক ক্ষেত্রে বেশী থাকলেও সেসব কাজের কোন স্বীকৃতি পায়না তারা। তাছাড়া দেশে সেবামূলক কাজে পুরুষের তুলনায় নারীর অবদান অনেক বেশী। একটি পরিবারে সেবামূলক কাজে পুরুষরা সময় দেন মাত্র ১ ঘন্টা, সেখানে নারীকে দিতে হয় ৬ ঘন্টা সময়। তারপরও বসে নেই গ্রামীণ নারীরা, নিজের জীবনের মোড় ঘোরাতে ছুটে চলেছে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে। সিমিত আকারে তেমই একটি কাজের ক্ষেত্র গড়ে উঠেছে সাতক্ষীরায়। শুটকী মাছের কথা আমরা প্রায় সকলেই অবগত। শুটকী মাছ মুখরোচক খাবারগুলোর মধ্যে অন্যতম। সাধারণত শুটকি পল্লী বা খামার গড়ে ওঠে নদী অথবা সামদ্রিক চর এলাকায়। কিন্তু সাতক্ষীরায় নদী না থাকায়ও বিলের মধ্যে গড়ে উঠেছে শুটকি মাছের খামার। সেখানে শ্রম দিয়ে জীবনের চক্রযান পরিচালনা করছে কয়েকটি গ্রামীণ পরিবার। সেখানে সারাদিন শ্রম দিয়ে নিজেদের সংসারের অভাব কাটিয়ে উঠেছে কয়েক জন তৃণমূল নারী। সদরের ৪ নং ঘোনা ইউনিয়নের বিওপি মোড়ে গড়ে উঠেছে শুটকি মাছের ছোট ২টি খামার। খামারের ব্যাপারী মোঃ কোরবান আলী জানান আমার নিজস্ব কোন যায়গা নেই, তার জন্যি আমি রাস্তার পাশে এই ছোট খামারটি গড়ে তুলি প্রায় ৬ বছর আগে। এখানে কারা কাজ করে প্রশ্নে তিনি বলেন এখানে নিয়মিত কাজ করে ৭/৮ জন নারী শ্রমীক। তারা সকাল ৭ টা হতে বেলা ৩ টা পর্যন্ত এখানে কাজ করে। শুটকীর জন্য এতো তাজামাছ কোথায় পান জানতে চাইলে তিনি বলেন আমি ঘোনা মৎস্য আড়ৎ হতে তিন ধরনের পুটি এবং মায়া-ঝায়া ও চান্দা মাছ কিনে এই বিলের মধ্যে শুটকী ব্যবসা চালু করি। এতে তেমন কোন মুনাফা হয়না তবে মনপ্রতি ৩/৪শত টাকা থাকে। কোথায় বিক্রি করেন প্রশ্নে তিনি বলেন আমাদের এই এলাকায় শুটকী মাছের তেমন চাহিদা নেই এজন্য আমি দেশের উত্তরাঞ্চলে সৈয়দপুর মোকামে পাঠাই। কতদিন লাগে কাচা মাছ শুটকীতে পরিনত হতে তিনি বলেন এসব কিছু রোদের উপর নির্ভরশীল তবে ৫-১০ দিন সময় লাগে। এরপর বাছাই করে বস্তাজাত করি। আরেকটি শুটকী খামারের মালিক আকরোম ব্যাপারী বলেন আমার বাড়ী গোপালগঞ্জের মোকছেদপুর তিনি সাতক্ষীরায় শুটকী মাছের ব্যবসা শুরু করেছেন ৪/৫ বছর। সাধারনত এই শুকটী মাছের কারবার হয় শীতকালিন সময়ে ৩/৪ মাস। কার্তিক মাসের প্রথম থেকে শুরু হয় আর মাঘ মাসে শেষ হয়। এ ব্যবসায় কেমন মুুনাফা পাচ্ছেন প্রশ্নে তিনি বলেন এটা বলা মুশকিল কারন সবকিছু বাজার দরের উপর। লাভ-লোকশান নির্ধারন হয় সিজিনের শেষে। তাছাড়া গতবছর বাজার খারাপ থাকায় আমার এই ব্যবসায় ৫ লক্ষ টাকা লোকসান হয়েছে। খোজ নিয়ে জানায়ায় আপনার খামারে সব পুরুষ লোক কাজ করে, নারী শ্রমীক নেই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন আমার যে কাজ তাতে মহিলা শ্রমীক লাগেনা কারন তারা মাছের বড় বড় ঝুড়ি গাড়ীতে ওঠানো নামানো করতে পারেনা সেজন্য কোন নারী শ্রমীক আমি রাখিনা। শুটকী খামারের ২জন মালিকের সাথে কথা বলে একটা বিষয় লক্ষনীয় হয়েছে মুজুরী বৈষম্য। একই কাজ করে পুরুষরা পাচ্ছে দিনপ্রতি ২৫০ টাকা, সেখানে নারী শ্রমীকরা পাচ্ছে ১৫০ টাকা করে। তারপরও নারী শ্রমীকরা এ কাজ করে সন্তষ্ট বলে জানান শুটকী পল্লীতে কাজ করা তানজিলা, ছখিনা, ছবিরণ ও আলেয়া। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায় তারা এই শুটকীর খামারে কাজ করছে প্রায় ৫/৬ বছর। প্রতিবছর ৩/৪ মাস এই কাজ করি, ফলে আগের তুলনায় তারা এখন অনেক ভাল রয়েছে। তারা বলেন এখন আর কারো কাছে হাত পাততে হয়না। কারন তারা স্বামীর রোজগারের পাশাপাশি নিজেরা কাজ করে সংসারের অভাব অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে। এখন তারা পরিবারের প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটিয়ে ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন। তারা বলেন আমাদের এলাকায় অনেক দিনমজুর নারী রয়েছে তারা একাজে সম্পৃক্ত হতে চায় কিন্তু এই এলাকায় মাত্র ২টি শুটকী খামার রয়েছে ফলে সেখানে বেশী লোকের প্রয়োজন হচ্ছেনা। তারা অভিযোগ করে বলেন গ্রামের নারীদের সংসারের যাবতীয় কাজের পাশাপাশি স্বামীর খেদমত, রান্নাবান্না, আত্মীয়স্বজন, সন্তান লালন-পালনসহ সংসারের সমস্থ কাজ করে কিন্তু তাদের কোন মূল্যায়ন করা হয়না এবং পরিবারে মতামতের কোন গুরুত্ব দেয়া হয়। পরিবারে প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতনের মূল কারন হিসাবে তারা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা পুরুষের উপর পুরোটাই নির্ভরশীল হওয়াকেই দায়ি করেছেন। তারা দাবি জানিয়ে বলেন সারা বছরতো শুটকীর কাজ থাকেনা তখন আমরা সংসারে আবার অভাব দেখা দেয় তাই সরকারী ও বেসরকারীভাবে আমাদের এলাকায় যদি আরও কয়েকটি শুটকী মাছের খামার অথবা যেকোন কারাখানা গড়ে তোলা যায় তবে সারাবছর অনেক নারীরা কাজের সুযোগ পাবে। দুর হবে সংসারের অভাব । তাই এ বিষয়ে তারা সরকারসহ-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষন করেছে।

#