এটাই কী চাঁদনী জয়শ্রীদের পথ


538 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
এটাই কী চাঁদনী জয়শ্রীদের পথ
অক্টোবর ৩১, ২০১৮ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ সুভাষ চৌধুরী ॥

ব্যথাতুর হৃদয় নিয়েই কথা বলছি। সময়ের ব্যবধান মাত্র এক বছর। শ্যামনগরের বয়ারসিং গ্রামের জয়শ্রী চক্রবর্তী তখন নোয়াবেকি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। ২০১৭ এর ২৭ অক্টোবর তার ঝুলন্ত নিথর দেহ নামালেন স্বজনরা। আর ২০১৮ এর ২৯ অক্টোবর। সাতক্ষীরার বাগানবাড়ি এলাকার বাসিন্দা দশম শ্রেণির ছাত্রী আসফিয়া খাতুন চাঁদনীর ঝুলন্ত শীতল দেহ ঘরের আড়া থেকে সযতনে নামালেন তার নিকটজনেরা। এই দুই ঘটনার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। বরং সবক্ষেত্রে রয়েছে মিল।
জয়শ্রীর পেছনে লেগেছিল বখাটে যুবক শেখর মন্ডল। ঘটনার দিন জয়শ্রী ফিরছিল কলেজ থেকে।নোয়াবেকির বাঁশঘাটায় আসতেই শেখর পেছন দিক থেকে এসে তার ঘাড়ে হাত দেয় । এতে অপমানিত বোধ করে জয়শ্রী প্রতিবাদ করে ছুট দেয়। শেখর মন্ডল এ সময় তার সহযোগীদের নিয়ে তাকে ধাওয়া করে রাস্তায় ধরে ফেলে জয়শ্রীর চুল কেটে নিয়েছিল । এই অপমান আর সহ্য করতে পারেনি সে। বাড়িতে পৌঁছে কাউকে কিছু না বলেই ঠাকুর ঘরে ঢুকে জয়শ্রী নিজেকে ওড়নার সাথে ঝুলিয়ে দেয় ঘরের আড়ায়। এ ঘটনা নিয়ে সে সময় তোলপাড় হয়েছিল। শেখর মন্ডল পালিয়ে যায়। শত শত নারী পুরুষ শিক্ষার্থী মাঠে নেমে প্রতিবাদের ঝড় তোলে । কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। জয়শ্রী ফেরেনি। শেখরও ধরা পড়েনি। এ ঘটনার পর বছর না ঘুরতেই সাতক্ষীরা শহরের বাগানবাড়ির ঘটনা। শেখরের মতো বখাটে মেহেদি হাসান পিছু নিয়েছিল কারিমা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী আসফিয়া খাতুন চাঁদনীর। আগের রাতে তাকে এসিড মারতে চেয়েছিল। ঘটনার দিন সকালে প্রাইভেট পড়ে আসার সময় সে তাকে ধাওয়া করে। এবার সে আর মুখে প্রতিবাদ করেনি। বাড়ি এসে সবার অজান্তে চাঁদনী নিজেকে ঝুলিয়ে দেয় ঘরের আড়ায় । এভাবেই নীরব প্রতিবাদ জানিয়ে সমাজকে শিক্ষা দিয়ে চলে গেছে সে। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে মাঠে নেমেছেন শিক্ষক শিক্ষার্থী অভিভাবকরা। আর এই প্রতিবাদে তাদের শক্তি সাহস ও প্রেরণা যোগাতে মাঠের মানববন্ধনে অংশ নিয়েছেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল ও পুলিশ সুপার সাজ্জাদুর রহমান।
আমি প্রশ্ন তুলতে চাই জয়শ্রী আর চাঁদনীদের জন্য কী এটাই নির্ধারিত পথ। তাদের জন্য কী অপেক্ষায় থাকে ঘরের আড়াগুলো। আর শেখর মন্ডল ও মেহেদি হাসানেরা কী এভাবেই তাদের তাড়িয়ে ফিরবে। সমাজ কী এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে। মাত্র ক’দিন আগে প্রেমজ সম্পর্কের জের ধরে শহরের একটি ডায়গনস্টিক সেন্টারে তামান্না খাতুন নামের এক তরুণির ফ্যানে ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার করা হয়েছে আবু সাঈদ নামের এক যুবককে। বারবার ঘটতে থাকা এসব ঘটনা আমাদের মনঃপীড়ার কারণ। আর এসব কারণে কোনো অভিভাবক তার মেয়েকে স্কুল কলেজে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না। তারা বখাটেদের উৎপীড়নের কথা ভুলতে পারছেন না। এ জন্য চেয়ে দেখুন মেয়েদের স্কুল কলেজে যাবার সময় তাদের বাবা কিংবা মা সাথে যাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে অবস্থান করছেন। লেখাপড়া শেষ হলে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। অথচ এমনটি তো হবার কথা ছিলনা। মেয়েরা স্বাভাবিকভাবে পায়ে হেঁটে অথবা যানবাহনে দল ধরে ক্লাস করতে যাবে। নিরাপদে ফিরে আসবে। কিন্তু সেই দিনটি পরিবর্তন করে দিয়েছে এই সব শেখর মেহেদি সাঈদরা। তারা পথে পথে মেয়েদের আটকায়। গায়ে এসিড মারতে চায়। চুল কেটে দেয়। প্রেম ও বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের সাথে অসামাজিক অশালীন আচরন করে। আর কোনো কোনো সময় সব ভুলে মনের ভুলে একাকার হয়ে যায় কোনো কোনো মেয়ে। তাদের পরণতি হয় শেষ পর্যন্ত জয়শ্রী চাঁদনী তামান্নাদের মতো।
এ প্রসঙ্গে বলে রাখি বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২১.৪ শতাংশ অর্থাৎ ৩ কোটি ৬৩ লাখ ৮০ হাজার কিশোর কিশোরী। তাদের মধ্যে কিশোরীর সংখ্যা ১ কোটি ৮৪ লাখ। এরা এখনও ছাত্রী পর্যায়ে অথবা লেখাপড়া শেষ করেছে। তারা সামাজিক কারণে বাল্য বিবাহের ঝুঁকিতে পড়েছে । কারণ এখনও বাংলাদেশে বাল্য বিয়ের শিকার হচ্ছে ৪৭ শতাংশ কিশোরী। পরিত্যক্ত হয়ে যাচ্ছে তাদের লেখাপড়া। জাতির এমন ভবিষ্যত আমরা চাইনা যেখানে বাল্য বিয়ের কারণে অপরিনত বয়সেই তারা মা হবেন। তাদের লেখাপড়া ধুলোয় মিশে যাবে। তারা স্বামীর ঘর থেকে পরিত্যক্ত হবে। কম বয়সের সন্তান ধারনের কারণে তাদের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়বে। অনাগত শিশুরা হয়ে থাকবে কৃশকায়, কম উচ্চতার কিংবা কম ওজনের। তারা হয়ে থাকবে প্রতিবন্ধী। জাতির এই ভবিষ্যত অস্বচ্ছ ছবিকে ভেঙ্গে দিতে হবে। সেখানে প্রতিস্থাপন করতে হবে একটি স্বাস্থ্যবান জাতির ছবি। যেখানে থাকবে না মাতৃমৃত্যু, শিশুর পুষ্টিহীনতা, শিশুর শারীরিক দুর্বলতা কিংবা বৈকল্য। আর মেয়েরা লেখাপড়া শিখবে নির্বিঘেœ। তারা পেশাগত জীবনে প্রবেশ করবে। পরিণত বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে। আমরা বাংলাদেশের সেই ছবির প্রতীক্ষায় থাকতে চাই।
এখন তাই বখাটেদের প্রতিহত করতে হবে। তাদেরকে ভুল পথ থেকে সরিয়ে নিতে হবে । সামাজিকভাবে ছাড়াও তাদেরকে আইনের বলে ঠেলে ফেলতে হবে। আসুন মেয়েদের চলার পথকে নিরাপদ করি। তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলি। তাদেরকে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেই। এক কথায় তাদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি যুগিয়ে দিতে হবে। সাথে সাখে ছেলেদের অবিভাবকদেরও ভাবতে হবে তার সন্তানকে নিয়ে। সরিয়ে আনতে হবে মাদকতা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে। বখাটে উচ্ছৃংখল আচরন থেকে। প্রেম নিবেদনের নামে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা থেকে। তাদেরকে সরাতে হবে সব ধরনের অপরাধ প্রবণতা থেকে। এ জন্য অবিভাবকই হবেন তার প্রথম শিক্ষক। আর স্কুল কলেজের শিক্ষকরা হবেন তাদের দ্বিতীয় অভিভাবক। তাদের নিয়ে কাউন্সেলিং করতে হবে। তারা যেনো শেখর মেহেদি কিংবা সাঈদ না হয়। তারা যেনো হয় সাহসী সন্তান, দামাল ছেলে, এক একটি সূর্য সন্তান। যাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য লেখাপড়া ও সুন্দর পেশাগত ভবিষ্যত গড়ে তোলা। ছেলে ও মেয়ে উভয় পক্ষের অভিভাবককে নিশ্চিত করতে হবে যে পরিনত বয়সের আগে তাদের কারও বিয়ে নয়।
বিন¤্রভাবে বলতে চাই জয়শ্রী চাঁদনী তামান্না তোমাদের পথ আত্মহনন নয়। তোমাদের জন্য ঘরের আড়া নয়, কিংবা বিষের বোতলও নয়। তোমাদের জন্য রয়েছে প্রতিবাদের ভাষা,উঠে দাঁড়ানোর ভাষা, তোমাদের জন্য রয়েছে প্রতিরোধের ভাষা। রুখে দাঁড়ানোর ভাষা। কারণ তোমাদের সাথে আইন আছে। বিচার আছে। সামাজিক সুরক্ষা আছে। তোমাদের অভিভাবক আছেন। তোমাদের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে উজ্জ্বল ভবিষ্যত। এই ভবিষ্যতকে তোমরা ভেঙ্গে দিতে পারোনা। শক্ত হয়ে দাঁড়াও । নির্মল বাতাস আর খোলা আকাশ থেকে সঞ্চয় করো শক্তি । অবশ্যই তোমরা সফল হবে।
আমরা দেখতে চাই তোমাদের বিনির্মান করা এক নতুন বাংলাদেশ।

পাদটীকা
একদল রোমিও, আছে সাতক্ষীরাতে
বলে খুব মজা ছিল আড্ডা জমাতে।
স্টার কোচিং মোড় , পাশে নারী হোস্টেল।
খুব জোরে গাড়ি চালাই,মাস্তানিও বেশ দেখাই।
হঠাৎ দেখি ম্যাজিস্ট্রেট, ধেয়ে আসছেন এদিকে
‘এই ব্যাটা করোছ কী, জেলের ভাত খাবা কী’
‘মাফ চাই, পায়ে ধরি। এ যাত্রা রেহাই চাই
চালাবোনা জোরে গাড়ি, মাস্তানিও নয় আর,
হবোনা রোমিও আর , ক্ষমা করে দেন স্যার
এবার আমি ভালো হবো, লেখাপড়াই শিখে যাবো।

——– সুভাষ চৌধুরী দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভি , সাতক্ষীরা।