এবার ভয় গ্রামে


161 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
এবার ভয় গ্রামে
মে ২০, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ঢাকা থেকে গ্রামে ছুটছেন হাজার হাজার মানুষ, ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

অনলাইন ডেস্ক ::

এবার ঈদ সামনে রেখে ঢাকা থেকে গ্রামের পথে ছুটতে শুরু করেছেন মানুষ। অথচ দেশে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত আক্রান্ত ২৫ হাজার ছাড়িয়েছে। মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৩৭০। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের বিস্তার রোধে সরকারি নিষেধাজ্ঞার পরও গ্রামমুখী মানুষের স্রোত ঠেকানো যাচ্ছে না। গত সোমবার ঢাকা থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পথে মানুষের ঢল নেমেছিল মাওয়া, পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া ঘাটে। জনস্রোত থামাতে শেষ পর্যন্ত ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঢাকা বিভাগের কয়েকটি জেলার পাশাপাশি বরিশাল ও খুলনা বিভাগের মানুষের ঈদযাত্রা কিছুটা থামাতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু দেশের অন্য ছয় বিভাগের যাত্রীদের গ্রামে যাওয়া আটকানো যায়নি। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় গতকালও অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেটকার, পিকআপভ্যান ভাড়া করে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। এ অবস্থায় বিপদ বাড়ছে গ্রামের। করোনার সংক্রমণ এবার গ্রামের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত আট সদস্যের কমিটি বিষয়টিকে আশঙ্কাজনক আখ্যায়িত করেছে। তাদের অভিমত, বর্তমানে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পিকটাইম চলছে। এই সময়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। কার্যকর লকডাউনের পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধের কৌশল নেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু তা না করে হাজার হাজার মানুষ যেভাবে ঢাকা থেকে গাদাগাদি করে গ্রামে ছুটছেন, তাতে আক্রান্ত ও মৃত্যু আশঙ্কাজনক হারে বাড়বে।

কমিটির প্রধান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন বলেন, দেশের ৬৪ জেলায় ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়লেও দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি উপজেলায় এখনও সংক্রমণ ছড়ায়নি। এটি একটি আশাব্যঞ্জক বিষয় ছিল। কিন্তু সর্বোচ্চ সংক্রমিত রাজধানী থেকে যেভাবে হাজার হাজার মানুষ ঈদ উপলক্ষে বাড়িতে ফিরছেন, তাতে ওই গ্রামগুলো আর নিরাপদ থাকবে না। সেখানে সংক্রমণ ছড়াবে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
ডা. শাহ মনির হোসেন আরও বলেন, জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির সদস্যরা সবাই ভাইরাসটির বিস্তার পর্যালোচনা করে একটি পূর্বাভাস দিয়েছিলাম। এতে চলতি মে মাস এবং জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংক্রমণের সময়কাল বিবেচনা করা হয়েছিল। এর পর ধাপে ধাপে ভাইরাসটির বিস্তার হ্রাস পাবে বলে ধারণা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা আরও বিলম্বিত হবে।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে শাহ মনির হোসেন বলেন, ভাইরাসটির বিস্তার হ্রাসের মূল উপায় কার্যকর লকডাউন ও নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা। আমরা একটিও করতে পারিনি। প্রথমে সংক্রমণ ছিল ঢাকা ও মাদারীপুরে। এরপর নারায়ণগঞ্জ যুক্ত হয়। মানুষকে ঘরে রাখার উদ্দেশ্যে ২৬ মার্চ থেকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ছুটি ঘোষণার পর মানুষ দল বেঁধে ঢাকা থেকে গ্রামে চলে যায়। এর পরই কিন্তু ঢাকার বাইরে সংক্রমণ শুরু হয়। একে একে ৬৪ জেলাতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এরপরও আমরা আশাবাদী ছিলাম, কারণ বেশিরভাগ উপজেলা এখনও সংক্রমণের বাইরে রয়েছে। কিন্তু ঈদের ছুটিতে যেভাবে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর থেকে গ্রামের দিকে যাচ্ছেন, তাতে করে গ্রামগুলোতে এখন ঝুঁকি তৈরি হবে। এর ফলে ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হবে। একই সঙ্গে আরও অধিকসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করবেন।

আক্রান্ত ও মৃতের বেশিরভাগই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা : গতকাল পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলায় ২৫ হাজার ২৫১ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে ৩৭০ জনের। তাদের মধ্যে রাজধানী ঢাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ হাজার ৯৪৪ জন, যা মোট সংখ্যার ৬৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। এর বাইরে ঢাকা বিভাগের ১৩ জেলায় আরও ৪ হাজার ৫৭৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এ হিসাবে মোট আক্রান্তের ৮১ দশমিক ২৭ শতাংশ এই বিভাগের বাসিন্দা। মৃতদের মধ্যে ১৫০ জনই রাজধানীর। মৃত্যুহার ৪০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ঢাকা বিভাগের ১৩ জেলায় মৃত্যু হয়েছে আরও ১১১ জনের। এ হিসাবে এ বিভাগে মৃত্যুহার ৭০ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
ঢাকার পর চট্টগ্রাম বিভাগকে এখন সংক্রমণের নতুন রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বিভাগে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৮৯৭ জন। মৃত্যু হয়েছে ৬৮ জনের। আক্রান্ত ও মৃত্যুহার যথাক্রমে ৭ দশমিক ৫১ শতাংশ ও ১৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

এর পর ময়মনসিংহ বিভাগে আক্রান্ত ৬৪৯ জন। মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের। আক্রান্ত ও মৃত্যুহার যথাক্রমে ২ দশমিক ৫৭ ও ২ দশমিক ৯৭ শতাংশ। রাজশাহী বিভাগে আক্রান্ত ও মৃত্যু যথাক্রমে ৪১৮ ও ৩ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুহার যথাক্রমে ১ দশমিক ৬৫ ও শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ। রংপুর বিভাগে আক্রান্ত ৬০৩ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের। আক্রান্ত ও মৃত্যুহার যথাক্রমে ২ দশমিক ৩৮ ও ১ দশমিক ৬২ শতাংশ। খুলনা বিভাগে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৫৩ জন। এই বিভাগের মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের। আক্রান্ত ও মৃত্যুহার যথাক্রমে ১ দশমিক ৩৯ ও ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। বরিশাল বিভাগে আক্রান্ত ২৪৭ জন। মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের। আক্রান্ত ও মৃত্যুহার যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৯৭ এবং ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। সিলেটে আক্রান্ত হয়েছেন ৪৩২ জন এবং মারা গেছেন ৭ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুহার যথাক্রমে ১ দশমিক ৭১ এবং ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

একক জেলা হিসেবে আক্রান্ত ও মৃত্যুতে শীর্ষে অবস্থান করছে নারায়ণগঞ্জ। এই জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৭৮৩ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৬০ জনের। আক্রান্ত ও মৃত্যুহার যথাক্রমে ৭ দশমিক ৬ এবং ১৬ দশমিক ২১ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম। এই জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ৮৪৫ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৩৯ জনের। আক্রান্ত ও মৃত্যুহার যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩৪ এবং ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ৮০৯ জন আক্রান্ত ও ১৪ জনের মৃত্যু নিয়ে ঢাকা জেলা তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এই জেলায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার যথাক্রমে ৩ দশমিক ২০ এবং ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

এ বিষয়ে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় করোনাভাইরাসটি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে উৎপত্তি লাভ করে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। শুরুতে এই দুটি এলাকার মানুষকে লকডাউনের মধ্যে আনা গেলে এটি এতটা বিস্তার ঘটাতে পারত না। কিন্তু লকডাউনের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে, মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করা হলেও অধিকাংশ মানুষ তা মানছেন না। এতে ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

ভয়ংকর পরিণতি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও করোনা প্রতিরোধে গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, টেকনিক্যাল কমিটি থেকে ভাইরাসটি প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে আমরা স্বাস্থ্য বিভাগকে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছিলাম। প্রধান বিষয় ছিল কার্যকর লকডাউন ও নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা। কিন্তু সোমবার ফেরিঘাটে মানুষের যে ভিড় দেখলাম, তাতে নিজেই আতঙ্ক অনুভব করছি। দেখে মনে হয়, ভাইরাসটিকে ছড়ানোর জন্য মানুষ নিজেই আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। না হলে এই পিকটাইমে এ ধরনের ভিড় থাকত না।

ডা. নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ঈদের ছুটিতে গ্রামে না যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেই সরকার দায়িত্ব শেষ করেছে। সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিলে হাজার হাজার মানুষ এভাবে জড়ো হতে পারত না। ঢাকা থেকে কীভাবে এতো মানুষ বের হলেন? চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশের প্রতি কি এসব মানুষকে ঠেকানোর নির্দেশনা ছিল না? এটি সমন্বয়হীনতার প্রমাণ। দুর্যোগ সামাল দিতে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. সহিদুল্লা বলেন, সংক্রমণ প্রতিরোধে শুরু থেকেই একের পর এক ভুল হচ্ছে। এই ভুলের মাশুল জনসাধারণকেই গুনতে হবে। ভুলের শুরু হয়েছিল বিদেশফেরতদের সঠিকভাবে কোয়ারেন্টাইন না করার মধ্য দিয়ে। ইউরোপসহ অন্যান্য দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইনের পরামর্শ দিয়ে বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেউ তা মানেননি। তারা সর্বত্র ঘুরে বেড়িয়েছেন। প্রথমে তাদের মাধ্যমে সংক্রমণ শুরু হয়েছিল। এরপর পরিবারের অন্য সদস্য, প্রতিবেশী হয়ে সবার মধ্যে ছড়িয়েছে। সংক্রমণের বিস্তার রোধে সরকার যখন ছুটি ঘোষণা করে, মানুষ সেটাকে ঈদের ছুটি মনে করে গ্রামে চলে গেলেন। এখন তো ঈদই সামনে চলে এসেছে।

ডা. সহিদুল্লা আরও বলেন, রোগতাত্ত্বিক দিক থেকে বলব, কার্যকর লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত না করা এবং একের পর এক ভুলের কারণে আমরা ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে যাচ্ছি। জানি না, কত মানুষ আক্রান্ত হবে। কতজনের মৃত্যু হবে। পরবর্তী ঘটনার জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী থাকব।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য: সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ভাইরাস প্রতিরোধে সরকার সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিয়েছে। লকডাউন কার্যকর এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে শুরু থেকেই বলে আসছি। সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রতিদিন পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলে সতর্কবার্তা প্রকাশ ও প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু মানুষ তা শুনছে বলে মনে হচ্ছে না। ওই সতর্কবার্তা শুনলে ঈদে বাড়ি ফেরার জন্য হাজার হাজার মানুষ এভাবে ফেরিঘাটে ভিড় জমাত না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, লকডাউন শিথিল করতে আমরা বাধ্য হয়েছি। বিশ্বের উন্নত ও সম্পদশালী রাষ্ট্রগুলোও লকডাউন নিয়ে চরম সংকটে পড়েছে। অনেকে লকডাউন প্রত্যাহার করেছে। অনেকে প্রত্যাহারের পথে রয়েছে। আমাদের মতো দরিদ্র ও জনবহুল একটি রাষ্ট্রের পক্ষে লকডাউন শতভাগ চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। তবুও আমরা চেষ্টা করেছি। কিন্তু মানুষের মধ্যে চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করেছি। যেভাবে হাজার হাজার মানুষ গ্রামে ছুটে গেলেন, তাতে গ্রামগুলোতে ব্যাপকভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।