এ লজ্জা রাখব কোথায়


154 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
এ লজ্জা রাখব কোথায়
অক্টোবর ৬, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

বেগমগঞ্জে ন্যক্কারজনক ঘটনা

ধরা পড়েছে চার দুর্বৃত্ত

অনলাইন ডেস্ক ::

নির্মম, বীভৎস, ভয়ানক- কোনো বিশেষণ দিয়েই এ ঘটনার বর্ণনা করা যায় না। একদল হিংস্র দুর্বৃত্তের ভয়াল থাবা, বর্বর উল্লাসের সঙ্গে মিশে ছিল অসহায় এক নারীর বুকফাটা আর্তনাদ। দুর্বৃত্তদের বারবার ‘বাবা’ ডেকে সল্ফ্ভ্রম ভিক্ষা চেয়েছিলেন। শরীরটাকে ঢেকে রাখার প্রাণপণ লড়াই করেছেন। এত আকুতিতেও টলেনি দুর্বৃত্তের পাষণ্ড মন। বিবস্ত্র করে ওই নারীকে নির্যাতনের এই কালো রাতটি নেমে এসেছিল গত ২ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের একলাশপুরের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামে। ওই ঘটনার বিচার না পেয়ে এক মাস ধরে এমন ক্ষত, দগদগে ঘা বয়ে বেড়াচ্ছিলেন ওই গৃহবধূ। সেই রাতের হিংস্রতায় ওই নারীর আর্তচিৎকার যাদের কানে ভেসে গিয়েছিল, তাদেরও মুখ বন্ধ ছিল। দুর্বৃত্তের দল এতটাই ভয়ানক ছিল যে, পাশের ঘরে থাকা গৃহবধূর আদরের বোন নীরবে ঝরিয়েছেন অশ্রু। ওই নারীর সেই আর্তনাদ সংশ্নিষ্ট কারোরই কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি এত দিন।

অবশেষে ৩২ দিন পর এলো গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের সেই ভিডিও। রোববার দুপুরে ভিডিওটি যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে (ভাইরাল) পড়ল, তখনই টনক নড়ে সবার। প্রতিবাদে গর্জে ওঠে পুরো দেশ। এর পর হয় মামলা। উদ্ধার করা হয় নির্যাতনের শিকার সেই নারীকে। ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পরই গ্রেপ্তার করা হয়েছে চার দুর্বৃত্তকে। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো বহু ঘটনা দেশে ঘটে চললেও নোয়াখালীর ভিডিওটি নাড়া দিয়েছে পুরো জাতিকে। সবাই স্তম্ভিত। ভিডিওতে একজন জননীর সল্ফ্ভ্রম রক্ষার আর্তচিৎকার দেখে, শুনে নির্ঘুম রাত কেটেছে বহু মানুষের। রোববার রাত থেকে ফেসবুকের পাতাজুড়ে ধিক্কার, ঘৃণা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এই লজ্জা, এই ক্ষত জাতিকে কতদিন বয়ে বেড়াতে হবে- সেই প্রশ্নও রেখেছেন অনেকে। কেউ কবি শামসুর রাহমানের কবিতার ‘আমি অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়েও অধিক পশু সেই সব পশুদের’- এমন লাইন তুলে ধরে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। কবি আল মাহমুদের ‘রোদন’ কবিতা তুলে ধরেছেন একজন- ‘হায়েনার দাঁত শুধু হামলে পড়ে/আমাদের শতাব্দীর অনাবৃত লজ্জার ওপর/….মানুষী মায়ের গর্ভে এই দেশে আর কোনো/ হায়েনার উদ্ভব না হোক।’

ফেসবুকের সেই আগুন গতকাল সোমবার সকাল থেকে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। নোয়াখালীর যে গ্রামে বীভৎস এই ঘটনা ঘটেছে; ফুঁসে উঠেছে সেই গ্রামও। দিনভর আন্দোলনে উত্তাল ছিল পুরো নোয়াখালী জেলা। সকাল থেকে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ হয়েছে রাজধানীর শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড়, জাতীয় প্রেস ক্লাব, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায়।

এদিকে দুর্বৃত্তদের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে নির্যাতিত নারী মামলার এজাহারে উল্লেখ করেছেন। গত ২ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় ওই নারী রোববার বেগমগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা করেন। আসামিরা হচ্ছে- একলাশপুর ইউনিয়নের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের সাহাব উদ্দিনের ছেলে বাদল, মৃত শেখ আহম্মেদ দুলালের ছেলে মো. রহিম, জুলফিকার আলী বাবুলের ছেলে আবুল কালাম, মধ্যম একলাশপুর গ্রামের আমিন উল্যার ছেলে ইস্রাফিল হোসেন মিয়া, আবদুর রহিমের ছেলে রহমত উল্যা, পূর্ব একলাশপুর গ্রামের লোকমান হোসেনের ছেলে সাজু, নেয়ামত উল্যার ছেলে সামসুদ্দিন সুমন, একলাশপুর গ্রামের মৃত আবদুল জলিলের ছেলে আবদুর রব ওরফে চৌধুরী মিয়া ওরফে লম্বা চৌধুরী ও মৃত মোস্তফা মিয়ার ছেলে আরিফ।

প্রধান আসামি বাদলসহ চারজনকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বাদলকে ঢাকা থেকে ও দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ারকে নারায়ণগঞ্জ থেকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। গতকাল দুপুরে নারায়ণগঞ্জের আদমজীতে র‌্যাব-১১ এর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‌্যাব-১১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম। এর আগে রোববার বিকেলে আবদুর রহিম ও রাত ১০টার দিকে রহমত উল্লাহকে গ্রেপ্তারের কথা নিশ্চিত করেন বেগমগঞ্জ থানার ওসি মুহাম্মদ হারুন অর রশীদ চৌধুরী।

র‌্যাবের দাবি- এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীর করা মামলার এজাহারে দেলোয়ারের নাম না থাকলেও আসামি সবাই তারই লোক। তারা একত্রে চলাফেলা করে এবং নানা অপকর্মে লিপ্ত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেগমগঞ্জের এক ইউপি সদস্য বলেছেন, ওই নারীর ১৮ বছর আগে বিয়ে হয়। তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করায় কয়েক বছর আগে তিনি বাপের বাড়ি চলে আসেন। তার এক ছেলে ও মেয়ে আছে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বাড়িতে ওই নারী ছেলে ও এক ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন। সম্প্র্রতি তার স্বামী তার কাছে আসা-যাওয়া করতে শুরু করেন। এ নিয়ে কয়েকজন যুবক আপত্তি জানিয়ে সেদিন ওই নারীকে নির্যাতন করে। ঘটনার দিন ওই নারী তার স্বামীর সঙ্গেই ছিলেন। নির্যাতনকারীরা তার স্বামীকেও আটক করে নিয়ে যায়। পরে ওই নারীর ভাই দেড় হাজার টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনেন। ওই নারীর মা নেই। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র থাকেন।

সেই রাতে যা ঘটে: নির্যাতিত নারী অভিযোগ করেছেন, স্বামীর অনুপস্থিতিতে একই গ্রামের বাদল, সাইফুল, সুমন, আবুল কালামসহ দুর্বৃত্তরা তাকে দফায় দফায় অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। তিনি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় বাদল ও তার লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। প্রায় রাতেই তারা ঘরের চারপাশে ঘোরাফেরা করত এবং গভীর রাতে দরজায় টোকা দিত। দীর্ঘদিন পর গত ২ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে তার স্বামী ঘরে প্রবেশ করেন। এর কিছুক্ষণ পরই বাদলের নেতৃত্বে ৪০-৫০ জন তার বসতঘর ঘিরে রাখে। এক পর্যায়ে দরজার কড়া নাড়লেও তিনি দরজা খোলেননি। এতে বাদল ও তার লোকজন লাথি দিয়ে দরজা ভেঙে ১৬-১৭ জন ঘরের ভেতর প্রবেশ করে। এ সময় তার স্বামীকে মারধর করে পাশের একটি কক্ষে নিয়ে আটকে রাখে। এরপর বাদল, রহিম, সাইফুল ও সুমন তার ওপর বীভৎস নির্যাতন চালান। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলেও দুর্বৃত্তদের ভয়ে কেউ কাছে আসতে সাহস পাননি। নির্যাতনকারীরা চলে যাওয়ার সময় এ ঘটনা কাউকে বললে ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে যায়।

বিচার চেয়েও পাননি: নির্যাতিত নারী বলেন, ঘটনার পরদিন সকালে স্থানীয় একলাশপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন সোহাগের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বিচার দাবি করেন। মেম্বার বিষয়টি তদন্ত করে সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাসও দেন। কিন্তু তিনি নির্যাতনকারীদের পক্ষ নিয়ে ঘটনার তদন্ত কিংবা বিচার কিছুই করেননি। ওই নারী বলেন, ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে নির্যাতনকারীরা তাকে ফের অনৈতিক প্রস্তাব দেয়। একপর্যায়ে তিনি সন্ত্রাসীদের ভয়ে বসতঘরে তালা মেরে মাইজদী শহরে তার বোনের বাড়িতে আশ্রয় নেন।

এ ব্যাপারে ইউপি সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন সোহাগ বলেন, ওই নারী তার কাছে ঘটনার বিচার দিলেও কারা নির্যাতন করেছিল তাদের নাম বলেননি। তাই তিনি এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি।

দুর্বৃত্তদের খুঁটির জোর কোথায়: নির্যাতনকারীরা স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনন্তপুর ও জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের একাধিক বাসিন্দা বলেন, বাদল, রহিম, আবুল কালাম, ইস্রাফিল, আরিফসহ ৩০-৪০ যুবক স্থানীয় যুবলীগ নেতা দেলোয়ারের অনুসারী। তারা এলাকায় মাদক সেবন ও ব্যবসা করে আসছে। তারা বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত।

দেলোয়ারের সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কিরণকে ফুল দেওয়ার ছবিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে রোববার থেকে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় মামুনুর রশিদ কিরণের পক্ষে এলাকায় পোস্টার বের করেন দেলোয়ার। নোয়াখালীর পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন বলেন, আসামিরা কোন দলের বা কোন নেতার অনুসারী সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। অপরাধী অপরাধীই। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

নোয়াখালীতে বারবার কেন এমন ঘটনা: নাগরিক ও সুশীল সমাজের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে নোয়াখালীর গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট বাহিনী। প্রতিটি ঘটনার পর বেরিয়ে আসে বাহিনীর নাম। বেপরোয়া বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে কেউ মুখ খোলে না। যেমনটি এই গৃহবধূর ওপর বর্বরতার পরও কেউ কথা বলেনি। সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান-সুপ্র-এর চেয়ারপারসন আব্দুল আউয়াল সমকালকে বলেন, সামাজিক জাগরণ, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সদিচ্ছা থাকলে এক বছরের মধ্যেই এরকম ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব। উল্টো তারা দুর্বৃত্তদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। নাগরিক সমাজও নিশ্চুপ। কারণ এক সময় নাগরিকদের পরামর্শ নেওয়া হলেও এখন তাদের কেউ ডাকে না।

ভিডিও অপসারণ, নির্যাতিত নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ: নির্যাতনের শিকার ওই নারী ও তার পরিবারের জন্য সব ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে নোয়াখালীর পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ওই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি সরিয়ে ফেলতে বিটিআরসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই ভিডিওটি সিডি বা পেনড্রাইভে কপি করে আদালতকে দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মহিউদ্দিন শামীমের ভার্চুয়াল বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন। ওই ঘটনায় পুলিশের কোনো অবহেলা আছে কিনা, তা অনুসন্ধান করতে একটি কমিটিও করে দিয়েছেন আদালত। ১৫ দিনের মধ্যে এর প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।