ঐতিহাসিক সফর : প্রধানমন্ত্রী আজ ভারত যাচ্ছেন


287 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
ঐতিহাসিক সফর : প্রধানমন্ত্রী আজ ভারত যাচ্ছেন
এপ্রিল ৭, ২০১৭ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::
সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এক ঐতিহাসিক সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ শুক্রবার সকালে ভারত সফরে যাচ্ছেন। তার চার দিনের এ সফর ঘিরে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে প্রত্যাশার বাতাবরণ। মহলবিশেষের সমালোচনাও রয়েছে। সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ দুর্যোগ-দুঃসময়ের বন্ধু নিকটতম এই প্রতিবেশী দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বার্থে সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করবেন বলেই দেশবাসীর বিশ্বাস। এবার তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর হলে আমরা প্রাণভরে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারতাম। কারণ, এ পানিতেই রয়েছে বাংলাদেশের প্রাণস্পন্দন। তিস্তা থেকে সীমিত পানিপ্রবাহের কারণে পদ্মার ঢেউ হারিয়ে যাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে ধু-ধু বালুচর। এ চুক্তি সম্পাদনে দিলি্ল মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যাকে শেখ হাসিনাসহ আমরাও উচ্ছ্বাসভরে ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করেছি। এ দৃষ্টান্ত নজিরবিহীন। ২০১১ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরকালে তিস্তা চুক্তি সম্পাদনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয়েছিল। তখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে চুক্তিটি হলো না। পাক্ষিক ‘দেশ’-এর রাজনৈতিক ভাষ্যকার সুমন সেনগুপ্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুণকীর্তনে উচ্ছ্বসিত হয়ে লিখেছিলেন :খরতাপবাহী রৌদ্রের মতো তেজি দুটি চোখে অফুরান শক্তির সম্ভাবনা। তিস্তা চুক্তিতে বাদ সেধে সেই ‘অফুরান শক্তিই’ প্রদর্শন করলেন দিদি? শেষ মুহূর্তে জানা গেল_ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির আমন্ত্রণে শেখ হাসিনার সম্মানে প্রদত্ত নৈশভোজে যোগ দেবেন। হাসিনা-মোদি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও উপস্থিত থাকবেন। সর্বশেষ খবরে মোটামুটি স্পষ্ট হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকালে তিস্তা চুক্তি হচ্ছে না। স্বভাবতই আমরা হতাশ, ক্ষুণ্ন।

ভারতের সঙ্গে কি প্রতিরক্ষা চুক্তি হবে, না সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর হবে? এই ‘মিলিয়ন ডলার’ প্রশ্ন নিয়ে গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় চলছে। ভারত-বিরোধিতায় যাদের সাতিশয় উৎসাহ, তারা বলছেন, ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি তো নয়ই; সমঝোতাপত্রও স্বাক্ষর করা যাবে না। কারণ, এ চুক্তি কিংবা সমঝোতাকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে ভারত বাংলাদেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করবে। অনেকে প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরের আগে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ জরুরি বলে মনে করেন। তাদের বক্তব্য :ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।

প্রতিরক্ষা চুক্তি কিংবা সমঝোতা নিয়ে ‘আলোড়ন, উত্তেজনা, উদ্বেগে’র প্রেক্ষাপটে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো চুক্তি করবেন না তিনি। স্বভাবসুলভ দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বলেছেন, নিজের বিবেক যদি ঠিক থাকে, দেশপ্রেম থাকে, তাহলে দেশের ক্ষতি হবে এমন কোনো কিছু করা যায় না।

প্রধানমন্ত্রীর এমন সুস্পষ্ট বক্তব্যের পরও অনেকে চায়ের কাপে তুফান তুলবেনই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বাস করেন, ‘জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের মতো গরীয়সী।’ পাকিস্তানের কারাগারে মৃত্যুর মুখ থেকে সদ্য স্বাধীন প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে বাংলাদেশ থেকে সকল ভারতীয় সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার আহ্বানে ত্বরিত সাড়া দেন ইন্দিরা গান্ধী। বাংলাদেশ থেকে সব ভারতীয় সৈন্যকে ফিরিয়ে নেন তিনি। শেখ হাসিনা এমন দেশপ্রেমিক পিতারই সন্তান।

চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের দুটি সাবমেরিন সংগ্রহকে কেন্দ্র করে ভারতে যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা বলা বাহুল্য। এ ঘটনার পরপরই ভারতের সদ্য সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের বাংলাদেশ সফর তারই ইঙ্গিতবহ। খসড়ার সবকিছুই নানা সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে উৎকণ্ঠার কী থাকতে পারে? আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও চীন এখন আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। জীবনানন্দ দাশ ‘হৃদয় খুঁড়ে’ বেদনা না জাগানোর যে পরামর্শ দিয়েছেন, তাই আমাদের শিরোধার্য।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে স্বাক্ষরের জন্য ৩৩টি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও এসওপির (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর) খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরমাণু সহযোগিতাবিষয়ক চারটি চুক্তি এবং নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতার সমঝোতা স্মারক থাকছে ১২টি। বাণিজ্য বিষয়ে ১৪টি এবং স্যাটেলাইট ব্যবহার নিয়ে থাকছে আরও তিনটি চুক্তি। এবারের সফরে পরমাণুবিষয়ক চারটি চুক্তিই দুই দেশের যৌথ স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারকের বিষয়টি হঠাৎ আসেনি। গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময়ই দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের ব্যাপারে কিছু বিষয়ে ঐকমত্য হয় এবং এর দিকনির্দেশনার আলোকেই এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই করার বিষয়টি সামনে আসে।

যে প্রতিরক্ষা চুক্তি/সমঝোতাপত্র নিয়ে এত হৈচৈ, তার খসড়ায় কী রয়েছে দেখা যাক।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে সামরিক সদস্যদের সফর বিনিময়, বিশেষজ্ঞ তথ্যবিনিময় ও প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে যৌথ অনুষ্ঠান আয়োজন। এর বাইরে মহাকাশ কারিগরি সহায়তা, সামুদ্রিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় যৌথ টহলের কথা রয়েছে। সমঝোতা স্মারকে আরও রয়েছে_ সমঝোতা ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি), সমুদ্রে আন্তঃরাষ্ট্রীয় অবৈধ কার্যক্রম রুখতে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড এবং ভারতীয় কোস্টগার্ডের মধ্যে এসওপি, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও ভারতীয় নৌবাহিনীর মধ্যে যাত্রাকালীন তথ্যবিনিময়, দুই দেশের প্রতিরক্ষা স্টাফ কলেজের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি, দুই দেশের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং ডিফেন্স ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্স টেকনোলজির মধ্যে সমঝোতা। খসড়া সমঝোতার শর্তে আরও বলা হয়, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আওতায় যেসব গোপনীয় তথ্যবিনিময় হবে, সেগুলো যাতে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার না হয় তা দু’পক্ষ নিশ্চিত করবে। কোনো পক্ষই নিজ সরকার কর্তৃক নিরাপত্তা ছাড়পত্র প্রদানকৃত সদস্য ছাড়া অন্য কারও কাছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আওতায় প্রাপ্ত গোপনীয় তথ্য প্রকাশ করতে পারবে না। এই অনুচ্ছেদের শর্তগুলো সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কার্যকর থাকবে। উভয় পক্ষের লিখিত সম্মতিতে এ সমঝোতা স্মারকের পূর্ণাঙ্গ বা আংশিক সংশোধন করা যাবে। সমঝোতা স্মারকটি পর্যবেক্ষণ, পরিচালনা ও বাস্তবায়নে প্রতিরক্ষা সচিব এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার পর্যায়ে বার্ষিক সংলাপ হবে। এ সংলাপ পর্যায়ক্রমে একবার বাংলাদেশ ও একবার ভারতে হবে। এই সমঝোতা স্মারকে যেসব সহযোগিতার কথা রয়েছে, তার অনেকগুলো এখনও কার্যকর রয়েছে। ভারত সরকার ও ভারতের জনগণও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন। সেখানকার গণমাধ্যমে তার স্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে।

ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি সব প্রচলিত রীতি উপেক্ষা করে রাষ্ট্রপতি ভবনের ‘দ্বারকা স্যুইটে’ রাত্রিযাপনের জন্য শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এ এক বিরল সম্মান। একদা এই স্যুইটে লর্ড মাউন্টব্যাটেন থেকেছেন। থেকেছেন যুবরাজ চার্লস ও প্রিন্সেস ডায়ানা, নেলসন ম্যান্ডেলা, মিখাইল গর্বাচেভ প্রমুখ।

এবার অতীতে ফিরে যাই। এখন থেকে সাত বছর আগে ২০১০ সালের জানুয়ারি। সে সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকে ‘সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ’ বিবেচনা করা হয়েছিল। তখনও বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। সে চুক্তির অনেক কিছুই এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। তখন শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রপতি ভবনে এক জমজমাট অনুষ্ঠানে প্রদান করা হয়েছিল ‘ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার’। এবারের মতো তখনও আমার প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। মনে পড়ে, ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিলের হাত থেকে ‘ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার’ গ্রহণকালে আবেগাপ্লুত শেখ হাসিনা বলেছিলেন, দু’দেশের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। স্বাধীনতা, শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে দু’দেশকে সমমর্যাদায় সামনে এগিয়ে যেতে হবে। এ লক্ষ্যে আমার অভিযাত্রা আমৃত্যু। বক্তব্য শেষে তিনি কবিগুরুর বিখ্যাত কবিতার কয়েকটি চরণ উদৃব্দত করেন, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির…।’