‘ওরা প্রথমে আমাকে মারবে, তারপর তোমাকে…’


700 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
‘ওরা প্রথমে আমাকে মারবে, তারপর তোমাকে…’
আগস্ট ৮, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকম ডেস্ক :
.বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কী দৃষ্টিতে দেখেছেন, দেখছেন পাকিস্তানের রাজনীতিক, সামরিক–বেসামরিক আমলা, লেখক–শিল্পী, বুদ্ধিজীবীরা। তা নিয়ে ইতিহাসের তথ্য–উপাত্তের ভিত্তিতে প্রথম আলোর ধারাবাহিক রচনা ‘পাকিস্তানিদের চোখে শেখ মুজিব’

জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানবাঙালি নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে পাকিস্তানিদের মধ্যে মিশ্র ধারণা রয়েছে। কট্টর পাকিস্তানবাদীরা তাঁকে দেখে একজন উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে, তারা পাকিস্তান ভাঙার জন্য তাঁকেই দায়ী করে। পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক আমলাদের দৃষ্টিতে তিনি (শেখ মুজিব) মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি। অন্যদিকে দেশটির উদারপন্থী ও বাম ঘরানার লেখক-কবি-বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকেরা শেখ মুজিবকে দেখেন অধিকারবঞ্চিত মানুষের ত্রাতা হিসেবে। বিশেষ করে পাকিস্তানের ছোট প্রদেশগুলোর নেতারা মনে করেন, শেখ মুজিবের ছয় দফা বাস্তবায়িত হলে সিনধ, বালুচ ও পাকতুন আন্দোলনও কামিয়াব হতো এবং তারা পাঞ্জাবি আধিপত্য থেকে মুক্তি পেতেন। সেখানে এখনো ক্ষুদ্র ও দুর্বল জাতিসত্তার আন্দোলন চলছে। সম্প্রতি বেলুচিস্তানের জাতীয়তাবাদী নেতারা বঙ্গবন্ধুর আদলে ছয় দফা কর্মসূচি পেশ করেছেন।
মীর গুল খান নাসির ছিলেন বেলুচিস্তানের নামকরা কবি (১৯১৪-১৯৮৩)। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিহত হন, তখন তিনি হায়দরাবাদের কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী। কারাগারে বসে, বঙ্গবন্ধু হত্যার ১৪ দিন পর ২৯ আগস্ট মীর গুল খান নাসির ভোর কোথায় শিরোনামে একটি কবিতা লেখেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দেশে–বিদেশে অনেকেই কবিতা লিখেছেন। সম্ভবত মীর গুল খান নাসিরের কবিতাটি প্রথম। এ কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি এখানে তুলে দিচ্ছি:
চিৎকার, ক্রন্দন আর শশব্যস্ত আহ্বানের মাঝে
উল্লাস করছে অন্ধ জনতা।
ওরা বলে, ‘এখন ভোর’, কিন্তু জীবনপানে তাকিয়ে
আমি দেখি রাত্রি, ঘোর অমানিশা।
বিদ্যুৎ চমকানো আর বজ্রপাতে মনে হয় দূরে বৃষ্টি হচ্ছে,
কিন্তু বাতাসে বৃষ্টির নাম-গন্ধ নেই
রক্তের ধারা বইছে প্রবল।
………………………….

সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা আবারও জ্বালিয়ে দিচ্ছে গ্রাম-নগর,
মহান দেশপ্রেমিক মুজিব নিজ রক্তের সাগরে শায়িত
সাম্রাজ্যবাদের অভিশপ্ত সেবাদাসেরা তাঁকে
রক্তের জামা পরিয়ে দিয়েছে এবং বিদ্ধ করেছে বুলেটে
মুক্তির শিখা কোথাও জ্বলে উঠলে এরা তা নিভিয়ে দেয় দ্রুত
বঙ্গবন্ধু মুজিব সপরিবারে নিহত ওদের হাতে
আবারও, স্বাধীনতার পতাকা অর্ধনমিত।
(অনুবাদ: রিজওয়ান উল আলম)

দুই.
পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা ওয়ালি খান একাত্তরের মার্চে ঢাকায় এসেছিলেন। পাকিস্তান ফিরে গিয়ে শেখ মুজিবের অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কে মন্তব্য করেন: ‘মহাত্মা গান্ধী আজ বেঁচে থাকলে বিস্মিত হতেন। সে সময় শেখ মুজিব ছিলেন বিস্ময়। বিদেশি সাংবাদিক যাঁরাই পেশাগত দায়িত্ব পালনে ঢাকায় এসেছিলেন, তাঁরা অবাক হয়ে লক্ষ করেছেন বঙ্গভবন নয়, সচিবালয় নয়, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের দোতলা বাড়িটি থেকে শেখ মুজিব দেশ পরিচালনা করছেন। মহল্লার অপরিচিত কোনো রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে হাইকোর্টের বিচারকরা পর্যন্ত সেখানে এসে তাঁর পরামর্শ নিচ্ছেন।’
একাত্তরে ঢাকায় মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেল ছিলেন আর্চার কে ব্লাড। তিনি সে সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে যে রিপোর্ট পাঠিয়েছিলেন পররাষ্ট্র দপ্তরে, তাতে স্পষ্টত বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রামের প্রতি জোরালো সমর্থন ছিল। রিপোর্টের একাংশে বলা হয়:
‘পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা এখন অপরিহার্য। অখণ্ড পাকিস্তানের কাঠামোর ভেতরে অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য যে আন্দোলন শুরু করেছিল, পূর্ব পাকিস্তানি জনসাধারণের ওপর সামগ্রিক লাঞ্ছনার জন্য শিগগিরই তা স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপান্তরিত হবে—বাংলাদেশ এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। এখানকার বর্তমান সংঘর্ষের পেছনে অর্থনৈতিক ও রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতি, ভাষা ও সামাজিক চালিকাশক্তিগুলোর প্রশ্ন নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে।
শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগের নীতিমালা গত নির্বাচনে জনগণের দ্বারা প্রচণ্ডভাবে সমর্থিত হয়েছে। এই ঘটনা অর্থনৈতিক নীতির ওপর প্রদেশের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে হস্তান্তরিত ক্ষমতার সংশোধনকেই জোরদার করেছে—যার প্রতিক্রিয়ায় ইয়াহিয়া সরকার একটি আতঙ্কের রাজত্ব স্থাপন করতে যাচ্ছে, এতে পুরো চেহারা ধীরে ধীরে সবার কাছেই উন্মোচিত হবে।’
সে সময় পাকিস্তানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন ফারল্যান্ড। সামরিক শাসক ইয়াহিয়ার সঙ্গেও তাঁর দোস্তি ছিল। শুরুতে তিনিও শেখ মুজিবের সঙ্গে পাকিস্তানি শাসকদের একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন। যদিও তাঁর সে চেষ্টা সফল হয়নি। তবে ফারল্যান্ড দাবি করেন যে শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে না ঝোলানোর ব্যাপারে ইয়াহিয়া খানকে তিনি প্রভাবিত করেছিলেন।

তিন.
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আগস্ট মাসে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানি কারাগারে আটক বাঙালি নেতা শেখ মুজিবের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেন। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। বিচার চলে সামরিক আদালতে এবং গোপনে। এর আগে ২৬ মার্চ বেতার-টিভিতে দেওয়া ভাষণে তিনি শেখ মুজিবকে বিশ্বাসঘাতক অভিহিত করে বলেছিলেন, এই ব্যক্তি ও তাঁর দলকে শাস্তি পেতেই হবে। তিনি দেশের আইনানুগ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।
২ আগস্ট প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের সদর দপ্তর থেকে প্রচারিত প্রেসনোটে বলা হয়: ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ও অন্যান্য অপরাধের জন্য বিশেষ সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের বিচার করা হবে। ১১ আগস্ট রুদ্ধদ্বার কক্ষে বিচারকাজ শুরু হবে এবং কার্যবিবরণী সেখানে রাখা হবে। অভিযুক্তকে তার পক্ষে সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হবে এবং নিজ পছন্দ অনুযায়ী কৌঁসুলি নিয়োগের (অবশ্যই তাঁকে পাকিস্তানি নাগরিক হতে হবে) সুযোগসহ নিয়ম অনুযায়ী অন্য সব সুবিধা দেওয়া হবে।’
নিউইয়র্ক টাইমস–এ পেগি ডারডিন লিখেন: কিন্তু এই ভীতি বা বিদ্বেষ আশ্চার্যজনকভাবে শেখ মুজিবের কড়া হুকুমে এবং ঐকান্তিক ব্যবস্থায় মিইয়ে যায়। একজন রাজনৈতিক নেতার নির্দেশাবলি জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে নিচ্ছে। এই নির্দেশাবলি প্রয়োগের জন্য এই নেতার কোনোই বাহিনী বা প্রশাসন ছিল না। আওয়ামী লীগের অসংগঠিত কর্মীগোষ্ঠী এখানে–সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কোথাও অনুনয় করছে, আবার কোথাও নেতার হুকুম মানতে বলছে; কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত এই নির্দেশ মানার পেছনে ছিল পারস্পরিক বিশ্বাস এবং বাঙালি জাতির ও নেতার মধ্যে একটি অলিখিত অথচ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠার অঙ্গীকার।
বি জেড খসরু মিথ অ্যান্ড ফ্যাক্টস অব লিবারেশন ওয়ার অব বাংলাদেশ বইয়ে মার্কিন দলিলের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১, শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য আমেরিকার সহায়তা চেয়েছিলেন। ১০ মার্চ ১৯৭১, শেখ মুজিবুর রহমান মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডকে গোপন বার্তা পাঠান যে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের সংকট নিয়ে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনায় রাজি আছে। শেখ মুজিব ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ডকে বলেছেন, আওয়ামী লীগ নেতা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করার পক্ষপাতী। যদিও তিনি (মুজিব) পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেছেন।
যে আগস্ট মাসে ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের বিচারকাজ শুরু করেছিলেন, সেই আগস্ট মাসেই ঘাতকদের হাতে শেখ মুজিবকে জীবন দিতে হলো। তবে সেটি একাত্তরে নয়, পঁচাত্তরে। আর তিনি পাকিস্তানি কোনো সেনার হাতে জীবন দেননি। জীবন দিয়েছেন তাঁরই হাতে গড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী বাঙালি সেনার হাতে।
আমরা মার্কিন লেখক-গবেষক স্ট্যানলি উলপার্টের জুলফি ভুট্টো অব পাকিস্তান বই থেকে জানতে পারি যে, ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ তৎকালীন গভর্নর হাউসের লনে পায়চারি করতে করতে পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে আলাপকালে বঙ্গবন্ধু তাঁকে বলেছিলেন, সেনাবাহিনীকে বিশ্বাস কোরো না। ওরা প্রথমে আমাকে হত্যা করবে। এরপর তোমাকে হত্যা করবে। সেই মার্চের প্রথম সপ্তাহে আরেক পাকিস্তানি নেতা এম আসগর খান যখন বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চাইলেন, এর পর কী ঘটবে? তিনি বললেন, প্রথমে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসবেন। তারপর আসবেন পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান এন এম আহমেদ। তাঁকে অনুসরণ করবেন ভুট্টো। এরপর ইয়াহিয়া সেনাবাহিনীকে অভিযান চালানোর হুকুম দেবেন এবং পাকিস্তান শেষ হয়ে যাবে।
বাস্তবে তা-ই ঘটেছে। কেন ঘটল, কারা ঘটালেন, সেসব পরের কিস্তিতে।
আগামীকাল : মুজিবকে শান্তিতে থাকতে দেননি ভুট্টো ।—সুত্র প্রথম আলো