কমছে সৃজনশীলতা !


89 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
কমছে সৃজনশীলতা !
আগস্ট ১৭, ২০১৯ ফটো গ্যালারি শিক্ষা
Print Friendly, PDF & Email

তারুণ্যের সুযোগ তারুণ্যের বাধা (১)

অনলাইন ডেস্ক ::

দেশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বয়স ১৪ থেকে ৩০ বছর। তাদের কিশোর কিংবা তরুণ বলা হয়। রবীন্দ্রনাথের ছুটি গল্পের মূল চরিত্র ফটিক চক্রবর্তীর বয়স ১৪ বছরই ছিল। এখন শুধু শহর নয়, গ্রামেও তরুণদের অবস্থা ফটিকের মতো। রবীন্দ্রনাথের ফটিক চরিত্রে কৈশোর নানা বেড়াজালে বন্দি। ফলে অধিকাংশ তরুণ এখন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে পিছিয়ে পড়েছে। তরুণদেরও যে বিনোদন প্রয়োজন, তাদেরও যে একটা অবসরজগৎ আছে, সেই খোঁজ অনেকে রাখেন না। এক সময় তরুণদের অবসর সময় কাটত বই পড়া, খেলাধুলা, বিতর্কচর্চা, দেয়াল লিখন, আবৃত্তি, সাহিত্যচর্চা, লেখালেখি, সংগঠনসহ নানা সৃজনশীল কাজ করে। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতায় সেসব কাজ এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।

পাঠাগার আছে পাঠক নেই :বই কেন? পড়ার জন্য তো? নোয়াখালীর প্রাচীনতম পাবলিক লাইব্রেরি দেখলে কে বলবে সে কথা? অযত্নে পড়ে আছে বই। খোলা র‌্যাকে যেমন-তেমন করে রাখা। কোথাও মাকড়সার জাল। ধূলিধূসর পরিবেশ। ভবনের ছাদের কিছু অংশ ভেঙে পড়ছে। মুখ ফিরিয়েছে পাঠকও। নোয়াখালীর এ গ্রন্থাগারে বসে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা, সেমিনারের পাঠ কবেই উঠে গেছে। অথচ এক সময় লাইব্রেরি কেবল পড়ার জায়গা ছিল না, ছিল সামাজিক মেলামেশার জায়গা। পাড়ার পাঁচজন মিলে সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ, মেয়েদের গল্পের আসর, শিশুদের ক্লাব, তরুণ-বৃদ্ধদের আড্ডা- সবার গন্তব্য ছিল লাইব্রেরি। লাইব্রেরি আজও আছে। কিন্তু ‘আছে’ বললে হয়তো ভুল হয়। বলা চলে, নোয়াখালী পাবলিক লাইব্রেরির মতো কোনোমতে টিকে আছে। গ্রন্থাগারিক এবং কর্মীর অভাবে বহু লাইব্রেরি ঝাঁপ ফেলে দিয়েছে।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রকাশনা ‘বেসরকারি গ্রন্থাগার নির্দেশিকা’ অনুযায়ী (১৯৯৫-২০১৪ সাল পর্যন্ত) দেশে বেসরকারি পাঠাগারের সংখ্যা ১ হাজার ৭০টি। বাংলাদেশ বেসরকারি গণগ্রন্থাগার সমিতির তথ্য অনুসারে দেশে পাঠাগারের সংখ্যা প্রায় দুই হাজারের কাছাকাছি। দেশে সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোকে দেখভালের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে মাত্র দুটি। অথচ সরকারি গ্রন্থাগারই রয়েছে ৭১টি। গ্রন্থাগার অধিদপ্তর দেশের ৭১টি গ্রন্থাগারকে দেখভাল করেই ক্লান্ত। ফলে অধিকাংশ গ্রন্থাগারে স্থায়ী গ্রন্থাগারিকই নেই। কর্মীও নেই। সবচেয়ে বড় কথা, বই পড়ার কেউ নেই। অথচ বইয়ের জন্য বছর বছর সরকারি বরাদ্দও হয় যথেষ্ট। বইমেলা থেকে বই কেনা গ্রন্থাগারের জন্য বাধ্যতামূলক। ক্লিকে বিশ্বকে মুঠোর মধ্যে আনার যুগে গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তাই যেন এখন প্রশ্নের মুখে।

গত দুই মাসে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার অন্তত ১০টি পাঠাগারে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগেরই অবস্থা সংকটাপন্ন। একসময় ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৩টি পাঠাগার ছিল। বর্তমানে তা ৭টিতে নেমে এসেছে। সেগুলোও নিয়মিত খোলে না। নতুন বই কেনা হয় না বহুদিন।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, গ্রন্থাগার বাড়লেও সেগুলোর আধুনিকায়ন হয়নি, লাগেনি প্রযুক্তির ছোঁয়া। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও নগণ্য। পাঠককে পাঠাগারমুখী করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে তা ঝিমিয়ে পড়ে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ মনে করেন, প্রযুক্তিবান্ধব তরুণ প্রজন্মকে বইমুখী করতে গ্রন্থাগারগুলোকে আধুনিক করতে হবে, বইকে তাদের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

শিক্ষাঙ্গনেও আগের পরিবেশ নেই :শিক্ষাঙ্গনে একসময় সংস্কৃতিচর্চা ও খেলাধুলার সুযোগ ছিল অবারিত। প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নাটক, আবৃত্তি, সঙ্গীত, বিতর্ক, অভিনয়, পাঠচক্র, রচনা প্রতিযোগিতাসহ নানা রকম সৃজনশীল কাজ চলত। প্রকাশ হতো ম্যাগাজিন, দেয়ালপত্রিকা। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা প্রকাশ পেত এগুলোতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। আর স্কুল-কলেজে ছাত্র সংসদ, হল সংসদ ও বিভিন্ন সংগঠন আয়োজন করত ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। ফলে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ার পাশাপাশি অবসর সময়ে কেউ নাট্যচর্চা, কেউ সঙ্গীতচর্চা, কেউ-বা বিতর্কচর্চা, আবার কেউ কেউ সাহিত্যচর্চায় নিজেদের ব্যস্ত রাখত। কিন্তু এখন দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেই পরিবেশ নেই। শিক্ষার্থীদের আড্ডা দেওয়া কিংবা গল্প করার মতো জায়গাও তেমন নেই। সংস্কৃতিচর্চা, খেলাধুলা আর বিতর্ক প্রতিযোগিতা হয় না বললেই চলে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নামমাত্র ক্লাব থাকলেও তাতে যুক্ত নেই ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী। ফলে তরুণদের মাঝে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। মোবাইল ফোন-ভিডিও গেম-ফেসবুক তাদের অবসরের সঙ্গী। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এতে তাদের জীবনধারা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধে নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে।

ঢাকা মহানগরীর ৬৪ শতাংশ স্কুলে খেলাধুলার কোনো ক্লাসই নেওয়া হয় না। বেশিরভাগ স্কুলেই খেলার মাঠ নেই। এর বিপরীতে এখন ঢাকায় গড়ে উঠেছে স্নুকার, বিলিয়ার্ড ক্লাব, সাইবার ক্যাফে, ফাস্টফুড, ফুডকোর্ট, করপোরেট জিমনেশিয়াম। এ ছাড়া শহর ও গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় রয়েছে ভিডিও গেমের ব্যবসা। ইদানীং তরুণদের একাংশের মাঝে সিসা বারের দিকেও ঝোঁক দেখা যাচ্ছে।

সামাজিক উদ্যোক্তাবিষয়ক যুব সংগঠন ইয়ুথ স্কুল ফর সোশ্যাল এন্ট্রাপ্রেনার্সের (ওয়াইএসএসই) সভাপতি শেখ মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, একসময় পাড়া বা মহল্লাকেন্দ্রিক নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হতো। এলাকাভিত্তিক জমজমাট পাঠাগার, ক্লাব, শিশু-কিশোর সংগঠনসহ বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল। দাবা খেলা হতো। ফুটবল আর ক্রিকেট খেলা হতো। নাটক, থিয়েটারের ব্যবস্থা ছিল। আয়োজন করা হতো নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। তরুণরা অংশ নিত। আয়োজন করত। অনেক সামাজিক উদ্যোগ তাদের মাধ্যমেই হতো। কিন্তু এখন আর হয় না। তখন নানাভাবে নেতৃত্ব গড়ে উঠত, উদ্যোক্তা বেরিয়ে আসত। এখন এর বিপরীতে বাড়ছে নেশার জগৎ।

শিশুসাহিত্যিক ও সংগঠক আলী ইমাম বলেছেন, বেঁচে থাকার জন্য অনেক বলিষ্ঠ উপকরণ রয়েছে। নৃত্যের মাধ্যমে হোক, সঙ্গীতের মাধ্যমে হোক, পাঠচক্রের মাধ্যমে হোক- সবকিছু মিলিয়ে নিজেকে গড়ে তোলা। এই গড়ে তোলাটাই এখন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কিশোর-তরুণরা এখন তন্দ্রার মধ্যে পড়ে আছে। তারা এখন আর স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে কথা বলতে পারছে না, চিৎকার করতে পারছে না, স্বপ্ন দেখতে পারছে না। তরুণদের আনন্দময় পরিবেশে মুক্তি দিতে হবে।

বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, তরুণদের মধ্যে উচ্ছৃঙ্খলতা, নিজেদের মধ্যে মারামারির ঘটনা বাড়ছে, এমনকি একজন আরেকজনকে খুনও করছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আরও সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক লেখাপড়ার বাইরে যেসব সহশিক্ষা কার্যক্রম হয়, সেগুলো পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব এটিএম আতাউর রহমান বলেছেন, তরুণরা ভালো কাজের পরিবেশ পেলে নিজেদের ভালো কাজে জড়ায়, আর তা না হলে অন্য কাজে জড়াবেই। তিনি বলেন, আমরা ছেলেমেয়েদের বাধ্যবাধকতার সঙ্গে গড়ে তুলি। ফলে তারা নিজেদের মতো করে তৈরি হয় না। তৈরি হয় আমাদের অভিভাবকত্ব দিয়ে, অনুশাসনের মাধ্যমে। এটা তাদের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি সমাজের জন্যও।