” কর্মজীবী নারী ”


320 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
” কর্মজীবী নারী ”
নভেম্বর ৮, ২০২০ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

কর্মজীবী নারী
-ইয়াসমিন নাহার, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাতক্ষীরা।

===========================================-=============
কাজের চাপের কারণে কয়েকদিন যাবত লেখা হয় না। সেদিন দুপুরের দিকে আমার অফিসে একজন দেখা করতে এলো। আমি তাঁকে ঠিক চিনি না কিন্তু তিনি আমার সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, ‘আপনাকে একটু দেখতে এলাম, আপনার লেখা খুবই ভালো লাগে।বেশ কয়েকদিন আপনার লেখা পাচ্ছি না।’ প্রায় ষাট ছুঁইছুঁই প্রাক্তন এই কলেজ শিক্ষকের এই মন্তব্য সত্যিই আমার হৃদয় স্পর্শ করেছে। আমি আবেগ আপ্লুত, দারুণভাবে অনুপ্রাণিত। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আমি যা লিখি তা সত্য কিনা, তাঁকে এবং সবাইকেই আশ্বস্ত করতে চাই, মানুষের জীবন থেকেই আমি লিখি সেটা অনেক সময় নিজের জীবন বা অন্যের জীবন থেকে নিয়ে। কয়েকদিন ধরেই ভাবছি কর্মজীবী নারীদের নিয়ে কিছু লিখবো। নারীরা কেন জীবিকা উপার্জের সাথে যুক্ত হন- সে কি অর্থ উপার্জনের জন্য নাকি সম্মানের জন্য নাকি স্বাধীনতার জন্য, সে বিতর্কে আমি যাবো না কিন্তু বাস্তবতা হলো কারো জীবনে তার মতো যাপন না করলে ঠিক বোঝা যায় না তার সমস্যা কি এবং সে কেন এরূপ জীবন যাপন করছে। এজন্য একজন নারী কেন ঘরের পাশাপাশি তার কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে তা তার জীবনে প্রবেশ না করলে একদমই বোঝা যাবে না। দৃষ্টি আমাদের অনেকক্ষেত্রেই ধোঁকা দেয়, দূর থেকে মনে হয় রেলপথ একসাথে মিলেছে কিন্তু বাস্তবে তা নয়, তাই দেখার দৃষ্টিই যে সব সময় সঠিক হবে তা কিন্তু নয়। তাই নারী কেন ঘর ছেড়ে বাইরে তা মোটা দাগে বলা সম্ভব না বলাটা ঠিকও না। এখন ধরলাম, যে কোন কারণেই নারী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করলো, তার ঘর থেকে প্রথমেই যে শর্ত আরোপিত হবে, তা হলো ঘর – সংসার বাঁচায়ে তারপরে যেন চাকরি করে। এটা যে একজন কর্মজীবী নারীর জন্য কতো বড় চাপ সেটা ভুক্তভোগী নারী মাত্রই জানেন। এদিকে কর্মক্ষেত্রে কি হয়? নারীকে তার সকল সহকর্মীদের সাথে সমান পাল্লা দিয়ে কাজ করতে হয়। কোন কারণে যদি সন্তানের অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে একটু ছুটি বা কাজ থেকে সাময়িক বিরতি নিতে হয় তাহলে শুরু হয় গুঞ্জন ফিসফিসানি-‘মহিলা মানুষ নিয়ে এই এক জ্বালা, কাজ করতে গেলেই খালি ছুটি খোঁজে ছুটি নেয়ার, কেন যে এরা চাকরি করতে আসে? ঘর-সংসার করলেই তো পারে!! ‘ আমি বলছি না সবাই একথা বলে কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বলে। অপরদিকে যারা এইসব কথা বলে, তারাই ঘরে ফিরে নিজের স্ত্রীকে বলে, ‘সারাদিন কি যে করো? চাকরি-বাকরি তো করো না, দুটো রান্না ছাড়া আর কি কাজ যে করো ঠিক বুঝি না! ‘আবার নারী শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে সমান পারিশ্রমিক পায় না শুধু নারী বলে! প্রতি বছর মে দিবস আসলে পত্রিকার প্রথম পাতায় নারী শ্রমিকের ছবি দেখা যায় আর দেখা যায় সেই নারী শ্রমিকের পিঠে বা বুকে ঝুলতে থাকা দুগ্ধপোষ্য শিশুর ছবি, সে ছবি যে কত বেদনার, কত কষ্টের তা যিনি মা তিনিই বুঝবেন। মাতৃত্ব যেমন গৌরবের ঠিক তেমনি চরম কষ্টের, বহমান বেদনার। শিশুর অস্তিত্ব মায়ের শরীরে জানান দেয়া থেকে এই কষ্টের শুরু, তারপর জন্মদানের কষ্ট সর্বোপরি লালন – পালনের প্রতিনিয়ত কষ্ট। মা যদি কর্মজীবী হন, তাহলে এই কষ্ট যে কতগুণ তা শুধু সেই মা ই জানেন। নিজের দিয়েই বিচার করি, আমি যখন চাকরিতে প্রবেশ করি তখন আমার ছেলের বয়স দেড় বছর। আমি চুরি করে অফিসের জন্য রেডি হতাম এরপর ছেলের সাথে দেখা না করে চলে আসতে মন সাই দিত না, দেখা করে যতই বুঝাতাম ছেলেকে ততোই দুই হাত বাড়ায়ে কি যে কান্না! ছেলেও কাঁদতো আমিও চোখ মুছতে মুছতে অফিসের গাড়িতে উঠতাম। ছেলে এখন অনেকটা বড় হয়েছে আর কাঁদে না, তবুও রাতের বেলা গলা জড়ায়ে ধরে শোনে-মা, কাল কি তোমার অফিস আছে? যদি বলি কাল তো শুক্রবার, অফিস বন্ধ।ছেলে আমার লাফ দিয়ে উঠে বলে,ইয়া হু…..আমার বড় বোনের অবস্থা আরো করুণ। তার ছোট মেয়ে হওয়ার মাত্র নয়দিন পরে চাকরিতে যোগদান করতে হয়। আইনের মারপ্যাঁচে মাতৃত্বকালীন ছুটি মেলেনি আপুর। সদ্য সিজার হওয়া মা, সদ্য ভুমিষ্ঠ দুগ্ধজাত শিশু গ্রামের এবড়োথেবড়ো রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতো, আর আমার মা ভয় পেত না জানি ওর সেলাই এর স্থানে কোন ক্ষতি হয়! সকালে স্কুলের চাকরি, রাতে শিশুর কান্নায় ঘুম না হওয়া আমার বোন এক পর্যায়ে বলে বসলো, আমি আর চাকরি করবো না! কিন্তু আমি তো জানি, ঘর সংসারের পাশাপাশি কত কষ্ট করে চাকরির জন্য পড়েছে, পরিশ্রম করেছে। তাই সবাই মিলে তাকে বুঝানো হলো, তাকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য মা প্রায় দুই বছর সকালে বোনের বাসায় যেত আর সারাদিনের রান্না বান্না যাবতীয় কাজ করে রাতে ফিরতো। মা পাশেই ছিল বলে এই সহযোগিতা পেয়েছে কিন্তু তারপরেও আপু যখন একটু ঘুমাতো মনে হতো কত ক্লান্ত তার চোখ-মুখ। আমার সার্ভিসের আরেক আপু বাচ্চা হওয়ার ছয় মাস পরে যখন কোর্টে ফিরে আসলো, তাঁর কষ্ট দেখে এতো খারাপ লাগতো তা বলার না। আপু যখন এজলাসে উঠতো আপুর ছয় মাস বয়েসি মেয়েটা তারস্বরে কান্না জুড়ে দিত। সাহায্যকারী মেয়েটা বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বারান্দার এপাশ ওপাশ ঘোরাঘুরি করতো। আমার খালি মনে হতো আপুর কি এজলাসে মন বসে? কিন্তু মাস শেষে আপুর কাজের পরিসংখ্যান দেখে হতবাক হতে হতো। উনার সম মর্যাদার কোন অফিসারের থেকে তাঁর কাজ কোন অংশেই কম নয়। শুধু কাজ শেষ করার জন্য উনি মাঝে মাঝে ছুটি নিতেই। এই হচ্ছে কর্মজীবী নারী, কর্মজীবী মা। এরপরেও খারাপ লাগে যখন অফিসে বাচ্চা নিয়ে আসার কারণে অনেক উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিরক্ত হন, আবার এদিকে অফিসে মিটিং বা কোন কাজ থাকার কারণে ফিরতে দেরি হলে ঘরের লোকজন যারপরনাই বিরক্তি প্রকাশ করে। কোথায় যাবে একজন কর্মজীবী নারী? অফিসের লোকেরা ভাবে কর্মজীবী নারী খালি অজুহাত দেয় আর ঘরের লোকেরা ভাবে অফিসে বসে আড্ডা দেয়! অথচ একজন কর্মজীবী নারীকে তিন রকম কাজ করতে হয়ঃ এক. কর্মস্থলের কাজ। দুই. ঘরের কাজ। তিন. দুই কাজের মাঝে সমন্বয় সাধনের কাজ। ছুটির দিনের জন্য কর্মজীবী নারীর বিশাল কর্মতালিকা থাকে- কাপড় ধোয়া, ঘর গুছানো, সপ্তাহের রান্না করা আর লোক লৌকিকতা, সমাজ-সামাজিকতা তো আর কর্মজীবী বলে বাদ দেয়া যাবে না! সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগে যখন দেখি নারীরাই কর্মজীবী নারীর বেশি মাত্রায় অবমূল্যায়ন করে। ভাবখানা এমন যে, কে বলেছিল এসব চাকরি করে কষ্ট বাড়াতে, কই বাপু আমরা তো বেশ আছি। আমরা সন্তানদের সময় দিয়ে মানুষ করতে পারছি! মায়েরা চাকরি করলে যে সন্তান নষ্ট হয়ে যায়, এরকম পরিসংখ্যান কিন্তু নেই তবে হ্যাঁ সন্তানেরা অনেকাংশে বঞ্চিত হয়। কিন্তু এই সন্তান কিন্তু আজীবন মায়ের আঁচলের তলে থাকে না বরং একটু বড় হলেই নিজের জীবন নিয়ে খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই কর্ম করলেই যে মায়ের আসন থেকে ছিটকে পড়বে এটা ভাবা ভুল বরং কর্মজীবী মায়েরা চেষ্টা করেন সন্তানকে স্বাবলম্বী করতে যা জীবন চলার পথে খুবই প্রয়োজন। আসলে আমি মনে করি প্রতিটা মা-ই কর্মজীবী, কেউ নিয়মিত বেতন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন আর কেউ বিনা বেতনে পরিশ্রম করে চলেন। আমার মা কোন কথিত কর্মজীবী নারী নন কিন্তু এই ষাটের কাছাকাছি বয়সেও তিনি একটু স্থির হয়ে বসতে পারেন না। টুকটাক কাজ করতেই থাকেন, আমরা বেড়াতে আসলে এই কাজ কয়েকগুণে বেড়ে যায়। আমার মায়ের মত বাংলাদেশের বেশিরভাগ মা সারাদিন সংসারের কাজে প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকেন, নিজেদের জীবন বিসর্জন দেন সন্তান-সংসারের পেছনে। এই মায়েদের অবদান অস্বীকার করা যেমন অনৈতিক ঠিক তেমনি কর্মজীবী নারীদের অসম্মান করাও ভীষণ রকম অনৈতিক। আমি মাঝে মাঝেই খুব আফসোস করে বলি, আমরা ‘লেডি অফিসার’রা না লেডি না অফিসার। চাকরি কালে নারী বলে যেমন সম্মান, ভক্তি পাই না তেমনি অফিসার বলে নারীর প্রাপ্য সম্মানটুকুও পাই না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পদমর্যাদার পুরুষ কর্মকর্তার সহধর্মিণীদের একধাপ বেশি পদমর্যাদা দেয়া হয় কিন্তু আমাদের স্থান তো তথৈবচ। কতদিন এমন হয়েছে সহধর্মিণীগণ কত আরামে মেহমান হয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করছেন আর নারী কর্মকর্তাগণ চোখের কালি, নাকের পানি মুছে অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা করছেন। কর্মজীবী নারী, না পায় সম্মান, না পায় আরাম। উঠতে বসতে ঘরের কথা, পরের কথা শুনতে হয়। এই অবস্থার পরিবর্তন আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় তখনই সম্ভব যখন সব নারীদের কষ্ট নিজের কষ্ট হিসেবে দেখা হবে। একজন পুরুষ অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত হয়ে তার কর্মজীবী সহধর্মিণীকে চা এর আদেশ দেয়ার পূর্বে তাকে ভাবতে হবে উনিও সারাদিন পরে সেই অফিস করেই ফিরেছেন। অন্যের কষ্ট দুঃখ সমান অনুভূতি দিয়ে অনুভব একজন প্রকৃত মানুষই করতে পারেন আর তিনিই পারেন। একজন নারীকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে তা সে কর্মজীবী হোক বা না হোক..