কলারোয়ায় কপোতাক্ষ পাড়ের ৩০ গ্রামের ২০ হাজার মানুষ পানিবন্ধী। খাদ্য সংকট


504 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
কলারোয়ায় কপোতাক্ষ পাড়ের ৩০ গ্রামের ২০ হাজার মানুষ পানিবন্ধী। খাদ্য সংকট
জুলাই ২৯, ২০১৫ কলারোয়া ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

কে এম আনিছুর রহমান, কপোতাক্ষ অববাহিকা থেকে ফিরে :
টানা কয়েকদিন ভারি বর্ষনে উজান থেকে নেমে আসা ঢল,কপোতাক্ষের উপছে পড়া পানি এবং তীরের ভেঁড়িবাধ ভেঙ্গে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কপোতাক্ষ ঘেঁষা ৪টি ইউনিয়নের ৩০ গ্রামের বির্স্তীন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ওই এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্ধী হয়ে পড়েছে। পানিতে ডুবে সর্ম্পূন নষ্ট হয়ে গেছে বীজতলাসহ কয়েক হাজার বিঘা জমির আমন ধান। প্রতিদিন পানি বাড়তে থাকায় ওই জনপদের মানুষ ঘরবড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে  এলাকার বিভিন্ন স্কুল-মাদ্রাসাসহ উচু রাস্তার উপর অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে। গত এক সপ্তাহ ধরে ত্রানের অভাবে অভূক্ত আছে ওই এলাকার কয়েক’শ মানুষ। এখনও পর্যন্ত সরকারী অথবা কোন বেসরকারী সংস্থা থেকে পায়নি কোন ত্রান বা সাহায্য। বিশুদ্ধ পানি বা স্যানিটেশনের কোন ব্যবস্থা না থাকায় ওই এলাকার বৃদ্ধ ও শিশুরা সর্দি কাশি,ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানি বাহিত রোগে ভুগছেন।  বুধবার দিনভর কলারোয়ার প্লাবিত এলাকা ঘুরে এসব চিত্র দেখা যায়।
কলারোয়া উপজেলার ১নং জয়নগর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শেখ ফিরোজ হোসেন জানান, পানির চাপে কপোতাক্ষের বেঁড়িবাধ ভেঙ্গে তার এলাকার ধানদিয়া, ক্ষেত্রপাড়া, দক্ষিন ক্ষেত্রপাড়া,বেলেমাঠ ও মোল্যা পাড়ার বাড়ি ঘরে পানি উঠে গেছে। পানিতে ইউনিয়নের প্রায় ৬০০ বিঘা জমিন ফসলসহ ১০-১৫টি বাড়ি ক্ষতি হয়েছে। নদের উপছে পড়া পানিতে তার এলাকার ঐতিহ্যবাহি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরসকাটি ইউনাইটেড মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ডুবে গেছে। এখনও পর্যন্ত প্রতিদিন দুই থেকে তিন ইঞ্চি করে পানি বাড়ছে। পলি জমে নদী ভরাট ও তাতে প্রচুর পরিমানে কচুরি পানা থাকায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘœত হচ্ছে। ফলে নদীর উপছে পড়া পানি নি¤œাঞ্চলসহ লোকালয়ে প্রবেশ করে সৃষ্টি হয়েছে স্থায়ী জলাবদ্ধতার।
দেয়াড়া ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য মতিয়ার রহমান, স্থানীয় সমাজ সেবক ওয়জেদ আলী খাঁ,আব্দুর রব, আতিয়ার রহমান সরদার, আহসান হাবিব মধুসহ অনেকে জানান, টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষনে কপোতাক্ষ তীরের ভেঁড়ি বাধ ভেঙ্গে পানির শো শো শব্দে নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়। তাছাড়া  উজান থেকে নেমে আসা ঢল নাব্যতা হারা কপোতাক্ষ ধারন করতে না পেরে নদের উপছে পড়া পানি কপোতাক্ষের তীর ঘেঁষা ওই সব গ্রামে প্রবেশ করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। বর্তমানে পানিতে তাদের এলাকার দেয়াড়া কাশিয়াডাঙ্গা, মাঠপাড়া, আবাদপাড়া, সানাপাড়া,খাঁনপাড়া কারিগর পাড়া,বাওড় কান্দা,মিরডাঙ্গা ও পাকুড়িয়ার প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনাসহ ঘরের ভিতর পানি ঢুকে পড়েছে ।
দেয়াড়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান প্রভাষক আব্দুল মান্নান জানান, তার ইউনিয়নের ছয়শ’ পরিবারের প্রায় ২৫০০ মানুষ ঘর বাড়ি ছেড়ে অন্যত্রে আশ্রয় নিয়েছে। পানিতে এলাকার ২৫ টির মতো কাঁচা বাড়ি ধসে পড়েছে। ৩০ বিঘা জমির আউশ-আমন ধানের বীজতলা আগাম রোপন করা একশ’বিঘা জমির ধান ও ৫৫ টির মতো মাছ চাষের পুকুরসহ ঘের ভেসে গেছে। গত এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়া এসব অভূক্ত মানুষদের বরাদ্ধ না থাকায় কোন ত্রান সহায়তা প্রদান করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি জলাবদ্ধ এলাকার এসব পানিবন্দি মানুষগুলোকে বাঁচাতে অতিদ্রুত সরকারি সহায়তা প্রদানের আহবান জানান।
দেয়াড়া মাদ্রাসায় আশ্রয় নেয়া টেনু সানার স্ত্রী জেসমিন আরা (৪২), পাকুড়িয়া সরকারী প্রাথমিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়া পচা বিশ্বাস,রাধাপদ বিশ্বাস জানান, তাদের ঘরবড়িতে পানি উঠে যাওয়ায় পরিবাররের সদস্যদের নিয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে তারা এখানে আশ্রয় নিয়েছে। রান্না খাওয়ার জন্য ঘরে চাল ডাল নেই। দুই বেলা শুকনো রুটি খেয়েই থাকতে হচ্ছে। এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কেউ কোন সহায়তার জন্য আসেনি। বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নেয়া গ্রামের গোলাম মোস্তফা, আব্দুস সাত্তার, ইনছার আলী, বাবলূ, আতিয়ার রহমান ওয়াজেদ আলীসহ অনেকেই জানান, এলাকার প্রতিটি বড়ি পানিতে স্থান বিশেষ ৩ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। ঘের ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। মাঠের ফসলও পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। গরু ছাগলসহ সহায় সম্বল নিয়ে তারা ঘর বড়ি ছেড়ে দিয়েছেন। এলাকায় কোন কাজও নেই। কি করে সংসার চলবে সে চিন্তায় তারা এখন দিশেহারা।
জালালাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাস্টার শওকত আলী জানান, গত এক সপ্তাহ টানা বর্ষনে তার ইউনিয়নের শংকরপুর, সিংহলাল, জালালাবাদ, বাটরা,ঘরচালা কাশিয়াডাঙ্গাসহ আশে পাশে গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
যুগীখালী ইউনিয়নের ওফাপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মফিজুল ইসলামসহ কয়েকজন কৃষক জানান,তাদের এলাকার ওফাপুর খালের স্লুইজ গেটের কপাট ভেঙ্গে গত এক সপ্তাহ ধরে কপোতাক্ষের উপচে পড়া পানি কামারালী, তরুলিয়া, তালুন্দিয়া, যুগীখালী, আগুনপুর ও রাজনগর বিলে প্রবেশ করছে। পানির তোড়ে এলাকার প্রায় দুই হজার বিঘা জমিতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এ মৌসুমে এসব বিলের কোন জমিতে আমন ধান রোপন করা যাবে না বলে তারা জানান।
তালা-কলারোয়ার সংসদ সদস্য এ্যাড.মুস্তফা লুৎফুল্লাহ ও কলারোয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ফিরোজ আহম্মেদ স্বপন ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, তারা ইতোমধ্যে ওই সব প্লাবিত অঞ্চল ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এলাকার গরীব ও অসহায় মানুষের পাশে সমাজের বিত্তবানদের দাঁড়ানোর আহবান জানান । এমনকি ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার চিত্রটি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন বলে তারা জানান।