কলারোয়ায় ‘ফোর মার্ডার’ রহস্য উদঘটনে মাঠে নেমেছে পুলিশের একাধিক টিম


2448 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
কলারোয়ায় ‘ফোর মার্ডার’ রহস্য উদঘটনে মাঠে নেমেছে পুলিশের একাধিক টিম
অক্টোবর ১৫, ২০২০ কলারোয়া ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

এম কামরুজ্জামান, ঘটনাস্থল থেকে ফিরে

সাতক্ষীরার কলারোয়ায় দুই শিশুসহ একই পরিবারের চার জনকে কুপিয়ে ও জবাই করে হত্যা করেছে দূর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার ভোররাতে উপজেলার হেলাতলা ইউনিয়নের খলসি গ্রামে এ ঘটনাটি ঘটে।

নিহতরা হলেন, খলসি গ্রামের শাহাজান আলীর ছেলে হ্যাচারি মালিক শাহিনুর রহমান (৪০), তার স্ত্রী সাবিনা খাতুন (৩০), ছেলে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র সিয়াম হোসেন মাহি (৯) ও মেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী তাসনিম (৬)।

নিহত শাহিনুর রহমানের ছোট ভাই রায়হানুল ইসলাম জানান, বাড়িটিতে তাঁর মা ও বড় ভাইয়ের পরিবারের চারজনসহ তাঁরা সাত জন থাকতেন। তাঁদের মা গতকাল (বুধবার) এক আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলেন। তিনি (রায়হানুল) ছিলেন পাশের ঘরে। আজ (বৃহস্পতিবার) ভোরে পাশের ভাইয়ের ঘর থেকে তিনি গোঙানির শব্দ শুনতে পান। তিনি গিয়ে দেখেন, ঘরের বাইরে থেকে দরজা আটকানো। দরজা খুলে দেখতে পান বীভৎস দৃশ্য। তখনো জখম অবস্থায় একটা শিশু বেঁচে ছিল। সে কিছুক্ষণ পর মারা যায়। তিনি জানান, ৪ মাস বয়সী শিশু মারিয়া খাতুন বাদে বাকী ৪ জনকেই হত্যা করা হয়েছে।

এদিকে এই মর্মান্তির ফোর মার্ডার এর ঘটনায় বেঁচে যাওয়া চার মাসের শিশু কন্যা মারিয়া খাতুনকে বৃহস্পতিবার দুপুরে স্থানীয় মহিলা মেম্বর নাসিমা খাতুনের জিম্মায় রাখা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, তাদের সাথে জমি জায়গা নিয়ে প্রতিবেশি আকবর হোসেনের সাথে বিরোধ চলছে। মাত্র তিন দিন আগে এনিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে শালিস বৈঠক হয়। কিন্তু মিমাংসা হয়নি। তবে কারা এ ঘটনা ঘটালো তা এখনই বুঝতে পারছেননা বলে তিনি আরো জানান।

এদিকে, একই পরিবারের ৪ জনকে হত্যার ঘটনায় পরিবারের স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম। গোটা উপজেলা ব্যাপী নেমে এসেছে শোকের ছায়া ।

বৃহস্পতিবার সকালে বিভৎষ্য এই হত্যাকান্ডের ঘটনা জানাজানি হলে বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার নারী-পুরষ একনজর দেখার জন্য ওই বাড়িতে ভীড় জমায়। সাতক্ষীরা-যশোর আঞ্চলিক সড়কের ধারেই নিহতদের বাড়ি। মানুষের ভীড়ে সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশ সড়কের উপর থেকে মানুষদের সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করে।

স্থানীয় হেলাতলা ইউপি চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন জানান , নিহত শাহিনুর রহমান খুবই সাদামাঠা জীবন যাপন করতো। এলাকার একজন নীরিহ মানুষ। তার তেমন কোন শক্রু নেই। তবে জমিজমা নিয়ে প্রতিবেশি আকবরের সাথে তার বিরোধ চলে আসছিল। শাহিনুর বাড়ির পাশ্ববর্তী একটি পুকুর লীজ নিয়ে সেখানে মাগুর মাছের চাষ করতো শাহিনুর। তিন ভাই এর মধ্যে সবার বড় শাহিনুর। সবার ছোট ভাই বিদেশে থাকে। মেজ ভাই একই ভীটেতে অন্য ঘরে বসবাস করে।

কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্বে-ওসি) হারান চন্দ্র পাল জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে হেলাতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন পুলিশকে খবর দেন। তিনি জানান, ইউনিয়ন পরিষদের পাশের এক বাড়িতে রাতে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতেরা একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করেছে। এ খবর পেয়ে তিনি (ওসি) কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। তিনি জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে চারজনের লাশ দেখতে পায়। চারজনকেই কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, বাড়ি থেকে কোনো জিনিসপত্র খোয়া যায়নি।
ওসি হারান পাল আরো জানান, কী কারণে এই হত্যাকান্ড ঘটেছে, কারা এই ঘটনা ঘটাল, তা প্রাথমিকভাবে জানা যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ডাকাতি করার জন্য নয়, পরিকল্পিতভাবেই এই হত্যাকান্ড ঘটানো হয়েছে। তাদের হাত ও পা বাধা ছিল।

এদিকে যে বাড়িতে এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে একতলা সেই বাড়িতে কিভাবে দুর্বৃত্তরা প্রবেশ করলো তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি আই শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কারন বাড়ির বারান্দার গ্রীলে তালা লাগানো অবস্থায় ছিল। তবে সাদের সিঁড়ির দরজা খোলা ছিল । পুলিশ ধারনা করছে দুর্র্বত্তরা প্রথমে ছাদের উপর উঠে সাদের সিঁড়ি বেয়ে নীচের ঘরে চলে আসে এবং এই হত্যাকান্ড ঘটায়। হত্যার পর ওই সিঁড়ি বয়েই আবার তারা পালিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ধারনা করা হচ্ছে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। কি কারণে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে^ তা খতিয়ে দেখার জন্য পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। প্রতিবেশি একজনের সাথে জমিজমা নিয়ে বিরোধ ছিল । সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে একনো পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি। তিনি বলেন, বেলা একটার দিকে নিহত চার জনের মরাদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়না তদন্ত শেষে তাদের দাফনের ব্যবস্থা করা হবে। লাশ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। হত্যাকান্ডের বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। হত্যাকান্ডে ব্যবহ্নত ধারালো অস্ত্র সনাক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন এখনো মামলা করা হয়নি। তবে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

এদেিক নৃশংস হত্যাকান্ডের পর খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনার অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম) এ কে এম নাহিদুল ইসলাম ও সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

#