কলারোয়ায় বিলুপ্তির পথে বাঁশ শিল্প


544 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
কলারোয়ায় বিলুপ্তির পথে বাঁশ শিল্প
নভেম্বর ১০, ২০১৬ কলারোয়া ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

কে এম আনিছুর রহমান :
সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় এক সময় শহর ও গ্রাম বাংলার সবখানে বাঁশের তৈরী মোড়া,মিটসেফ,দোলনার,ডালা,মাছ ধরার বিভিন্ন জাতের ফাঁদের ব্যবহার ছিল সচারচোর।

বিশেষ করে বাড়িতে মেহমান আসলে মোড়ায় বসতে দেওয়ার দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না। এখানকার মানুষ এগুলোকে সেকেলে ভাবে। বর্তমানে প্লাস্টিকের চেয়ার দখল করেছে মোড়ার স্থান। রান্না ঘরেও ঢুকেছে বাঁশের পরিবর্তে লোহার পাত দ্বারা তৈরী মিটসেফ।

এক সময় গ্রামে বাশেঁর তৈরী ঝুড়ি, ধামা মোড়া কুলা, মাছ ধরার নানা জাতের ফাঁদ,ধান রাখার ডোল, গোলা ইত্যাদি ব্যবহার করা হতো। কালের আবর্তে আধুনিক সভ্যতার উৎকর্ষতায় হারিয়ে যেতে বসেছে এ সবের ব্যবহার। কেবল হারায়নি গভীর দরদে সুনিপন হাতের ছোঁয়ায় যারা এ সকল জিনিসপত্র তৈরী করতেন সেই সকল শিল্পিরা। পূর্ব পুরুষদের শেখানো এ সকল কাজ এখনও করে যাচ্ছেন তারা। তবে বানিজ্যিক ভাবে নয় নিজের ব্যবহারের জন্য ও খুচরা দু’একটি বিক্রির উদ্দেশ্যে।

উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের বাঁশ শিল্পি মৃত বিহারী মন্ডলের ছেলে কার্তিক মন্ডল ও ভোলানাথ মন্ডলের ছেলে পরিতোষ বশ্য বলেন, বর্ষাকালে আগের মতো পানি না হওয়ায় এবং কৃষিতে কীটনাশকের মাতাতিরিক্ত ব্যবহারে খাল-বিলে মাছ না থাকায় মাছ ধরার দৈড়,ঘুনি, হেলি দৈড়, বুচনে,পলো,পাটাসহ নানা জাতের ফাঁদ তৈরী বাদ দিয়েছেন অনেক আগে। এদিকে কৃষকরা আর গোলা ভরা ধানও রাখতে

পারেন না, কারণ ধান উঠার সাথে সাথে বিক্রি করে উৎপাদন ব্যয় পরিশোধ করতে হয়। কাজেই ব্যবহার কমেছে গোলা আর ডোলের। তাই এখন ঝুড়ি,টেপারী ও চাটাইয়ের মধ্যে  সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে কলারোয়ার বাঁশ শিল্প। অথচ এক সময় ছিল কি শহর কি গ্রাম,প্রতিটি বাড়িতে বাঁশের তৈরী জিনিসপত্র ছাড়া যেন কল্পনাও করা যেত না। কিন্তু কালের আবর্তে তাদের বাঁশ শিল্প এখন মৃতপ্রায়।

তারা আরো বলেন, তাদের ছেলেরা এখন আর বাঁশ শিল্পের কাজ করে না।তারা  ফার্নিচারসহ বিভিন্ন পেশোর কাজ করে।পূর্বপুরষদের পেশা ছাড়তে তাদের কষ্ট হয়,তাই তারা দুজন বাড়িতে বসে ঝুড়ি,টেপারী ও চাটাই তৈরী করেন। প্রতিদিন তারা দুটি ঝুড়ি,দুটি টেপারী ও দুটি চাটাই তেলী করেন। একটা করে ঝুড়ি তারা বিক্রি করে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত আর চাটাই বিক্রি করেন ২০০ টাকায়। খরচ বাদে ঝুড়িতে ৪০ টাকা এবং চাটাইতে ১৪০ টাকা লাভ হয় বলে তারা জানান।

এদিকে অনেক ঋষি পরিবারের পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে চলে গেছে অন্য পেশায় কিন্তু এখনও এ পেশায় আটকে আছেন পোড় খাওয়া স্বল্প সংখ্যাক শিল্পী। যারা পূর্বপুরুষের শেখানো কাজের ওপর মেধা ও শ্রম দিয়ে ঠিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন মৃতপ্রায় এ শিল্পটাকে।

উপজেলার শাকদাহ গ্রামের বাঁশশিল্পী সুপদ,শুম্ভ কুমার,মানিকসহ কয়েকজন জানান, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে তারা এ পেশায় আছেন। লাভ কম হলেও মাঠে কৃষি জমি না থাকায় এখনও এ পেশায় জড়িত থাকতে হয়েছে তাদের।

কামারালী গ্রামের  রঞ্জন ও তার স্ত্রী চম্পা দাস জানান,তারা স্বামী স্ত্রী দু’জন মিলে ৪/৫টি টেপারী তৈরী করেন।  প্রত্যেকটি টেপারী ৩৫ টাকা দরে বিক্রি করেন। এতে টেপারী প্রতি ১৫ টাকা করে লাভ থাকে।  এ দিয়ে কোন রকমে চলে তাদের সংসার।  তবে বছরে কয়েকদিন টানা বর্ষা হওয়ায়  মাছ ধারার ফাঁদ তৈরী করে বেশ কিছু বাড়তি আয় হয়েছে।

প্রশান্তি ভরা নিঃশ্বাস ছেড়ে চম্পা দাস বলেন,ভগবান যদি প্রতিবছর এ রকম বৃষ্ঠি দিতো তাহলে দু’মুঠো খেয়ে পরে ছেলে মেয়েদের নিয়ে বেঁচে থাকতে পারতাম। অন্য জিনিসের চাহিদা কম থাকায় তারা এখন ঝুিড় ও টেপারীর উপর নির্ভর হয়ে পড়েছেন। এ শিল্পের চাহিদা কমতে থাকায় অনেক পরিবার বর্তমানে পূর্ব পুরুষের পেশা ছেড়ে এখন অন্য পেশায় গেছেন।

জালালাবাদ গ্রামের উত্তম জগোসহ কয়েকজন জানান, তারাসহ তাদের চাচা ও ভাইরা এখন সেলুনকাজসহ বিভিন্ন কাজ করেন।
ক্ষেত্রপাড়া গ্রামের ফিলিপ্স জানান, বর্তমানে বাশেঁর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আগের মতো লাভ হয়না।

ধানদিয়া গ্রামের ফটিক,ম্যানুয়েল,পরিতোষসহ কয়েকজন জানান, ঋষিরা এখন অধিকাংশ খ্রীষ্টান হয়ে গেছে, বিধায় তারা এখন বাঁশ শিল্পের কাজ করে না। আবার কেউ কেউ এ পেশায় থাকলেও পুঁজি বেশী না থাকায় তাদের লাভ কম হয়। পুঁজি থাকলে একবারে অনেক মাল তৈরী করতে পারতেন তাতে লাভও বেশী হতো বলে তারা মনে করেন।

বর্তমানে ঢাকা, রাজশাহি, খুলনা, বরিশাল,চট্টগ্রাম,মুন্সিগঞ্জ,কুমিল্লা ও যশোরসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বাঁশের তৈরী বাহারী সৌখিন জিনিসপত্রের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। শহরে, পরিবারে, অফিস ও রেস্তেরায় রঙ তুলির ব্যবহার করা বাঁশ ও বেতের তৈরী জিনিস শো-পিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিদেশের বাজারেও এর চাহিদা রয়েছে বেশ। এতে ভালো মুনাফাও পাওয়া যায় বলে জানতে পেরেছেন এ অঞ্চলের বাঁশ শিল্পিরা।

কিন্তু রং তুলি দিয়ে কিভাবে বাহারী জিনিসপত্র কিভাবে তৈরী করতে হয় সে কৌশল জানা নেই তাদের। কলারোয়ার বাঁশ শিল্পিরা চান তাদের তৈরীকৃত জিনিসপত্রে শৈল্পিক রুপ দিতে। এ জন্য কলারোয়ার বাঁশ শিল্পিরাও সরকারী বা বেসরকারীভাবে তাদের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা এবং সুদ মুক্ত ঋণ দিতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানান। অন্যদিকে শিল্প প্রেমীরা চান কোনভাবেই যাতে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই বাঁশ শিল্প কালের আবর্তে হারিয়ে না য়ায়।

##