কলারোয়ায় মাইক বাজিয়ে কলাগাছে দেবদারুর পাতা ও রঙিন কাগজ সাজিয়ে হালখাতা প্রচলন বিলুপ্তির পথে


761 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
কলারোয়ায় মাইক বাজিয়ে কলাগাছে দেবদারুর পাতা ও রঙিন কাগজ সাজিয়ে হালখাতা প্রচলন বিলুপ্তির পথে
মে ২৭, ২০১৬ কলারোয়া ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

কে এম আনিছুর রহমান, কলারোয়া :
সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌর সদরসহ উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে চলছে ‘হালখাতা’র মৌসুম। কিন্তু দোকানের সামনে কলাগাছে দেবদারুর পাতা জড়িয়ে, মাইক বাজিয়ে, জড়ি ও রঙিন কাগজে সাজিয়ে হালখাতার প্রচলন নেই বললেই চলে । এমনকি সেটা এখন বিলুপ্তির পথে।
বাকী পাওনা আদায়ের লক্ষ্যে ব্যবসায়ীরা বছরে একবার অথবা দুইবার ‘হালখাতা’র আয়োজন করেন। বাংলা সন হিসেবে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে সাধারণত হালখাতা করার প্রচলন দেখা যায়। তবে অনেক ব্যবসায়ীরা শীত মৌসুমেও দ্বিতীয় দফায় হালখাতা করে থাকেন। তাছাড়া ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে কৃষকদের ইরি-বোরো ধান কাটা,ঝাড়া,পরিষ্কার ও সিদ্ধ শেষ হওয়ার পর হালখাতা শুরু করেন । সে মোতাবেক  এখন চলছে হালখাতা’র মৌসুম। গ্রাম্যঞ্চল থেকে শুরু করে শহরাঞ্চলের বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বকেয়া-বাকী পরিশোধের প্রত্যয়ে ব্যবসায়ীরা হালখাতা করছেন পুরোদমে। এমনকি পাওনা আদায়ের পাশাপাশি ক্রেতাদের আপ্যায়নও করা হচ্ছে।
বিগত বছর গুলোর চেয়ে বর্তমানে ‘হালখাতা’র জৌলুশ অনেকটা হ্রাস পাচ্ছে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। বকেয়ার পুরোটাই যেমন পরিশোধিত হচ্ছে না তেমনি পুরো বছরের বাকীও একেবারে পরিশোধ না করে অনেক ক্রেতারা মাসে মাসে কিস্তি আকারে বাকীর খাতায় কিছু টাকা জমা করে থাকেন। ফলে ‘হালখাতা’র জৌলুশ অনেকটা হ্রাস পাচ্ছে।
মূলত: নতুন বর্ষকে বরণ করে নেয়া এবং পুরনো হিসেব নিকেশ চুকিয়ে নতুন হিসাব খোলার জন্য ব্যবসায়ীদের অন্যতম একটি বিষয় হচ্ছে হালখাতা। কিন্তু ডিজিটাল যুগের ছোঁয়ায় সেই হালখাতার প্রচলন আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হাতে লেখা খাতা থেকে অনেককে দুরে রেখেছে। কয়েক বছর আগেও আড়ত ও খুচরা এবং পাইকারী দোকানগুলোতে হালখাতার যে জাঁকজমক অনুষ্ঠান দেখা যেতো, তা এখন তেমনটা চোখে পড়ে না। আগে ব্যবসায়ীরা মুখের কথায় বিশ্বাস করে লাখ লাখ টাকা বাকি দিতেন। তার বেশিরভাগই উসুল হতো হালখাতার দিনে। এখন লেনদেনটা অনেকে ব্যাংকের মাধ্যমে চুকিয়ে নেন। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে আয়োজনের ধরণও। সেই দিন আর নেই। নেই সেই জাঁকজমক হালখাতা উৎসবও। অথচ এককালে সর্বজনীন উৎসব হিসেবে ‘হালখাতা’ ছিল বাংলা নববর্ষের প্রাণ। তবে গ্রামগঞ্চের হাট বাজারে চোখে না পড়ার মতো দুই একটি দোকানে  দেখা যায় কলাগাছে দেবদারুর পাতা জড়িয়ে, মাইক বাজিয়ে, জড়ি ও রঙিন কাগজে সাজিয়ে হালখাতার চলছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, সনাতন হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারোটি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো।
ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, মুঘল স¤্রাট আকবরের সময়কাল থেকে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। আর এর সাথে স¤্রাট আকবরের প্রচেষ্টায় শুরু হয় বাংলা সনের প্রথম দিনে খাজনা আদায় এবং দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়াও। মোগল আমল থেকেই পয়লা বৈশাখে অনুষ্ঠান করা হতো। প্রজারা চৈত্র মাসের শেষ পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করতেন। পয়লা বৈশাখে জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টিমুখ করানোর পাশাপাশি আনন্দ উৎসব করতেন ।
আর বর্তমানে চির চেনা লাল কাপড় বা কাগজে মোড়ানো হিসাবের ‘হাতে লেখা’ খাতার ব্যবহারও হ্রাস পেতে শুরু করছে। দোকানে বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার বা মোবাইলের মাধ্যমে পণ্য বেচাকেনার হিসাব রাখা হচ্ছে। ‘হালখাতা’র রেওয়াজটা-ই আজ ‘শুভ হালখাতা’য় অনেকটা পরিণত হচ্ছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
এ ব্যাপারে কলারোয়া বাজারের ওয়েলডিং দোকান মালিক রবিউল ইসলাম,মুদি দোকানদার আব্দুর ররিম,সরসকাটি বাজাররের আনন্দ মোহন সাহাসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, আগে ক্রেতাদের মুখের কোথায় লাখ লাখ টাকা বাকি দেওয়া হতো, বর্তমানে তেমন বাকি ব্যবসা করা হয় না। কারণ বাকি দিলে ক্রেতারা সময়সত টাকা দিতে চাই না। তার পরেও যা বাকি দেওয়া হয় সেটা লেন-দেন করা হয় ব্যাংকের মাধ্যমে। বিধায় হালখাতার প্রচলণ কমে যাচ্ছে।