কাঁকড়ার আন্তর্জাতিক বাজার চলে যাচ্ছে বে-দখলে : হুমকির মুখে সম্ভাবনাময় কাঁকড়া শিল্প


820 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
কাঁকড়ার আন্তর্জাতিক বাজার চলে যাচ্ছে বে-দখলে : হুমকির মুখে সম্ভাবনাময় কাঁকড়া শিল্প
মার্চ ২২, ২০১৭ খুলনা বিভাগ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

এস,এম, আলাউদ্দিন সোহাগ ::

হিমায়িত চিংড়ির পর এবার নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত কাঁকড়া শিল্প। অবাস্তব রপ্তানি নীতিমালা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে অযথা হয়রানি সহ নানাবিধ প্রতিবন্ধকতায় রপ্তানি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরী হওয়ায় রীতিমত হুমকির মুখে পড়েছে সম্ভাবনাময় এ শিল্পটি।

বাংলাদেশ লাইভ এন্ড চিল্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন ও তৃণমূলের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, ১৯৮৭ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে জীবিত কাঁকড়া ও কুঁচে রপ্তানি শুরু হয়। বর্তমানে ১৪৩টি প্রতিষ্ঠান কার্গো বিমানের মাধ্যমে প্রতিদিন ২৫/৩০ টন জীবিত কাঁকড়া ও কুঁচে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে থাকে। এর আগে বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ আইনের আওতায় ১৯৯৮ সালে সময়ের প্রয়োজনে এ নিয়ে তৈরী হয় একটি প্রাণী রপ্তানি নীতিমালা। যাতে বলা হয়েছে, পূরুষ কাঁকড়া প্রতিটি ২শ’ গ্রাম ও স্ত্রী কাঁকড় কোন ভাবেই ১শ’৩০ গ্রামের নীচে রপ্তানি করা যাবেনা। নীতিমালানুযায়ী শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সম্প্রতি প্রায় ৩ হাজার কেজির দু’টি কাঁকড়ার চালান আটক করে লাইভ এন্ড চিল্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের কাছে হস্তান্তর করে। পরে এসোসিয়েশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আটককৃত কাঁকড়া পরীক্ষা করে দেখেন দু’টি চালানের মোট ৫/৬ ভাগ কাঁকড়া প্রতিটি ৫/১০ গ্রাম করে কম আছে। এছাড়া টানা হেঁচড়া ও সময়ক্ষেপনের ফলে মোট কাঁকড়ার প্রায় ৩০ শতাংশ বিমান বন্দরের কার্গোতেই মারা যায়। পরে তা চীনে রপ্তানি করলে দেখা যায়, সেখানে আরো ৩০ শতাংশ কাঁকড়া মারা যায়। ফলে চীন থেকে ফেরৎ পাঠানো হয় পুরো শিপমেন্ট। বিষয়টি অন্যান্য দেশের বায়াররাও সহজেই অবগত হয়। আর এতে করে গত এক মাসে বিরুপ প্রভাব পড়েছে কাঁকড়া রপ্তানির উপর।

এব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কাঁকড়া ব্যবসায়ী পাইকগাছার ডিকে এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী দেব কুমার হোড়, একই এলাকার এক্সপোর্টার্স নয়ন এন্টাপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী শেখ আনারুল ইসলাম বলেন, কাঁকড়া সাধারণত উপকূলীয় এলাকা সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও খুলনা অঞ্চলে চাষাবাদ হয়ে থাকে। ঐসব এলাকা থেকে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় তা ঢাকায় নেয়ার পর কাঁকড়ার প্রাকৃতিকভাবে পানিশূণ্যতা দেখা যায়। অনেক সময় দেখা যায় অঙ্গহানির ফলে কাঁকড়া প্রতি ৫/৬ গ্রাম কমে যায়। তারা আরো বলেন, বর্তমানে ফিমেল বা স্ত্রী কাঁকড়ার ৪টি গ্রেড যথাক্রমে ডাবল এফ-১ ১শ’৯৫ গ্রাম, সিঙ্গেল এফ-১ ১শ’৭০ গ্রাম, এফ-২ ১শ’৪০ গ্রাম, এফ-৩ ১শ’ গ্রাম, মেল বা পূরুষ কাঁকড়ার ৪টি গ্রেড যথাক্রমে ডাবল এক্স এল ৪শ’৭০ গ্রাম, সিঙ্গেল এক্স এল ৩শ’৭০ গ্রাম,ডাবল এম এল ২শ’৭০ গ্রাম, এম এস ১শ’৭০ গ্রাম ও ডাবল এল ১শ’ গ্রাম ওজনের কাঁকড়া তারা ক্রয় করে রপ্তানি করছেন।
এদিকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিদেশের বাজারে ২শ’ ও ১শ’৩০ গ্রাম কাঁকড়ার চাহিদা আশংকাজনকভাবে হ্রসি পেয়েছে। বাংলাদেশের কাঁকড়ার বাজার চীন, জাপান, তাইওয়ান কিংবা থাইল্যান্ডে এর চেয়ে কম ওজনের কাঁকড়ার চাহিদাই বেশী। অন্যদিকে ওজন সংশ্লিষ্ট কোন নীতিমালা না থাকায় এই সূযোগে আমাদের প্রতিযোগী দেশ ভারত, মিয়ানমার সহ অন্যান্য দেশগুলো বিদেশে বাংলাদেশের কাঁকড়ার বাজারগুলো দখল করছে অতি সহজেই। শুধু বাজার দখলই নয়। সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ থেকে আশংকাজনক হারে ভারত সহ পাশ্চাত্য দেশগুলোতে পাচার হয়ে যাচ্ছে কাঁকড়া। দেশের কাঁকড়া সংশ্লিষ্টদের আশংকা, রপ্তানি নীতিমালার ঠুনকো অজুহাতে এভাবে কাঁকড়ার চালান আটক অব্যাহত থাকলে পাট, চায়ের মত সম্ভাবনাময় কাঁকড়া-কুঁচে রপ্তানি খাতটিও ক্ষতিগ্রস্থ হবে অতি সহজেই।
জানাগেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে ৫০ থেকে ১২০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়ার চাহিদা ভাল। এ চাহিদাকে সামনে রেখে দেশের কক্সবাজার ,সাতক্ষীরা, খুলনা, পাইকগাছা সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রসেস করে ৫০/১২০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়া চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের মাধ্যমে রপ্তানি করা হচ্ছে। চিংড়ির থেকে কম সময় ও খরচে ভাল ফলাফল পাওয়ায় অনেকেই এখন কাঁকড়া চাষে ঝুঁকছেন। অনেকে কাঁকড়া চাষে স্বর্ণ পদকও লাভ করেছেন। তবে মাঝ পথে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতায় বাজার হারানোর পাশাপাশি কাঁকড়া চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকেই।

কাঁকড়া  আহরণ ও ব্যবসা সংশ্লিষ্টরা বলেন, বাংলাদেশে কাঁকড়ার চুড়ান্ত প্রজননকাল মে-জুন মাস। অথচ রপ্তানি নীতিমালায় কাঁকড়ার প্রজননকাল জানুযারি-ফেব্রুয়ারি মাস উল্লেখ করে ঐ সমযে বনবিভাগ থেকে কাঁকড়া আহরণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে। যার বিরুপ প্রভাবও খাতটির উপর জেঁকে বসেছে। কঁকড়া রপ্তনিকারকরা জানান,সাধারনত  কাঁকড়া উৎপাদন ও রপ্তানির বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তবে সুন্দরবন এলাকায় কাঁকড়ার চাষ করলে তা নিয়ন্ত্রণ করে বন বিভাগ। ফলে দ্বৈত শাষণের যাতাকলে পিষ্ঠ হচ্ছে দেশের বর্তমান সময়ের সম্ভাবনাময কাঁকড়া শিল্পটি।
সর্বশেষ উপকূলীয় লবণ পানির এলাকায়  গত ৩ দশকে কাঁকড়া শিল্পের সাথে নিজেদের ভাগ্য জড়িয়ে অনেকেই যখন সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখছেন ঠিক তখনই নানাবিধ সংকট সম্ভাবনাময় শিল্পটিকে গলাটিপে ধরেছে। সংশ্লিষ্ট সকলের দাবি, সকল প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে শিল্পের উপর ভর করে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের পাশাপাশি দেশ এগিয়ে যাক নতু উদ্যমে।