কালিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাড়ে চার লাখ মানুষের একজন চিকিৎসক


196 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
কালিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাড়ে চার লাখ মানুষের একজন চিকিৎসক
অক্টোবর ২৯, ২০১৯ কালিগঞ্জ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

কে এম আনিছুর রহমান ::

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল না থাকায় চিকিৎসা সেবা স্থবির হয়ে পড়েছে। এই হাসপাতালের অধিনে (উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র) ২১জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও তিনজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে উপজেলার সাড়ে চার লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবা একবারে ভেঙ্গে পড়েছে । দুর-দুরন্ত থেকে আসা রোগিরা চিকিৎসা সেবা না পেয়ে ক্লিনিক বা অন্যান্য স্থানে চিকিৎসা সেবা নিতে যেয়ে আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ও প্রতারণার শিকার হচ্ছে।

হাসাপাতাল সূত্রে জানা যায়, কেবলমাত্র উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯টি পদের বিপরীতে কাগজ কলমে ইউএইচপিও ডাঃ শেখ তৈয়েবুর রহমান ও মেডিকেল অফিসার ডাঃ অসীম কুমার সরকার চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করছেন। এরমধ্যে মেডিকেল অফিসার অসীম কুমারকে ৭/৮ মাস পূর্বে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতলে পেষনে পাঠানো হয়েছে। বাকি সাত চিকিৎসকের পদশূণ্য থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা সেবা একবারে ভেঙ্গে পড়েছে। সাতটি পদ শূণ্য রয়েছে। শূণ্য পদ গুলো হলো আরএমও, জুনিয়ার কনর্সালটেন্ড, সার্জারী, মেডিসিন, এ্যানেসথেসিয়া, গাইনি এবং ডেন্টালসার্জন।
উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে চারটি, কালিগঞ্জ সদর, বাঁশতলা, ধলবাড়িয়া ও নলতা। এসব সাব-সেন্টার গুলোতে চারজন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কেবলমাত্র বাঁশতলা কেন্দ্রে সুকান্ত বিশ্বাস নামের একজন মেডিকেল অফিসার দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি তিন কেন্দ্রে চিকিৎসকের পদ শূণ্যই রয়েছে দীর্ঘদিন যাবৎ।

পরিসংখ্যানবীদের পদটি শূণ্য রয়েছে ২০১১ সাল থেকে। তার স্থলে সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ঝর্ণা সরকার দায়িত্ব পালন করছেন। দুইজন (নাইটগার্ড) নিরাপত্তা প্রহরীর পদ শূণ্য রয়েছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রেডিওগ্রাফার পদটিও শূণ্য। তাছাড়া দীর্ঘ চার বছর ধরে এক্সরে মেশিন নষ্ট থাকায় এক্সরে-করার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির অন্ত নেই। এই পদটিও শূণ্য রয়েছে।

ইউনিয়নের প্রান্তিক জনগোষ্টির স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে আটটি। কৃষ্ণনগর, বিষ্ণপুর, তারালী, চাম্পাফুল, ভাড়াশিমলা, মথুরেশপুর, রতনপুর ও মৌতলা। এরমধ্যে ভাড়াশিমলা উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডাঃ জিয়াউর রহমানের দায়িত্ব থাকলেও চিকিৎসক সংকটের কারণে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে। ফলে এসব ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক না থাকায় সাতটি পদ শূণ্য হয়ে পড়ে আছে। ইসিজি ও আলট্রাসোনোগ্রাম মেশিন নষ্ট, টেকনিশিয়ানও নেই। জুনিয়ার ম্যাকানিকের পদটি দীর্ঘদিন যাবৎ শূন্য রয়েছে। হাসপাতালে রোগিদের আনা নেওয়ার ক্ষেত্রে দুইটি এ্যাম্বুলেন্স থাকলেও সেটিও নষ্ট।
ওয়ার্ড বয়ের তিনটি পদের বিরপীতে দায়িত্ব পালন করছে দুইজন। এরমধ্যে আগামি মাসে একজন অবসরে যাবেন বলে জানা গেছে। ফলে দুইটি পদ শূণ্যই থাকছে। আয়ার দুইটি পদ থাকলেও সেখানে দায়িত্ব পালন করছে একজন। একটি মালির পদ অনেক দিন ধরে শূণ্য রয়েছে। দুইজন কুক-মশালী (বাবুচির) পদ থাকলেও একটি পদে দীর্ঘ কাল ধরে শূণ্য থাকায় রোগিদের রান্না ও খাওনোর ক্ষেত্রে নানান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। জরুরী প্রসূতিসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও চিকিৎসক না থাকায় অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে।
হাসপাতালের পরিবেশ সুন্দর ও রোগিদের নানা ধরণের সুযোগ সুবিধা প্রদানের জন্য ইতিমধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ব্যতিক্রমর্ধী উদ্যোগ গ্রহন করেছে। এরমধ্যে রয়েছে অসুস্থ্য মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত কেবিন, হেলথ্ এডুকেশন কর্ণার, ফুল বাগান, রোগিদের বসার স্থান, বিষ খাওয়া রোগিদের ওয়াশিং প্লেজ, সিসি ক্যামেরা, ইন্টারকম, বায়োমেট্রিক হাজিরা, বিভিন্ন নির্দেশনা মূলক সাইনেজ বোর্ড স্থাপন, রোগিদের খাওয়ার জন্য ডাইনিং রুম, বইয়ের আলমারি, হাসপাতালে ভর্তি রোগিদের পত্রিকা পড়ার জন্য টেবিলের ব্যবস্থা, সুসর্জ্জিত কনফারেন্সরুম, প্রত্যেক ওয়ার্ডে রোগিদের তাৎক্ষনিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নার্সদের নিদিষ্ট বসার স্থান, রোগিদের গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য বেডের চারিপাশে পর্দার ব্যবস্থা, বর্জ্য অপসরণ প্লান চালু করণসহ বিভিন্ন ধরণের কার্যক্রম গ্রহন করেছে। এছাড়াও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় হাসপাতাল চত্ত্বরে সাইকেল গ্যারেজও নির্মাণ করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০ সালের ২৪ ডিসেম্বর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নতি করা হয়। বর্তমানে ৫০ শয্যার বেডে রোগিদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না দেওয়ায় চিকিৎসা সেবা পেতে ব্যহত হচ্ছে।
স্থানীয় গ্রামবাসি বিশিষ্ঠ সাহিত্যিক অধ্যাপক গাজী আজিজুর রহমান, এ্যাডঃ জাফরুল্লাহ ইব্রাহিম, ডাঃ আব্দুর নূর বলেন, তৎকালিন পূর্ব-পাকিস্থানের যোগাযোগ মন্ত্রী খান-এ সবুর ষাটের দশকের প্রথম দিকে গ্রাম অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার উপর গুরুত্ব দিয়ে উপজেলা সদরের নারায়নপুর গ্রামে ১৮ বিঘা জমি অধিগ্রহন করে একটি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেন। সেই থেকে এ অবহেলিত এলাকার অসহায়, হতদরিদ্র গরীব মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয়ে আসছে।
এদিকে মহাপারিচালক স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রনালয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-১ বাংলাদেশ সচিবলায় ঢাকা ৪৫,১৫৫,১১৪,০০,০০,০০৯,২০১৫-১৫৭ নং স্বারকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠণের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশ দিলেও অদ্যবধি কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোন ধরণের ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়নি। তদারকী না থাকার ফলে হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীরা খামখেয়ালী ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে একাধিক ব্যক্তি এ জানান।
ডাক্তার সংকটসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্বিক বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ শেখ তৈয়েবুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধনের জন্য উর্দ্ধোতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। কিন্ত আজও পর্যন্ত সমস্যা গুলোর সমাধান হয়নি।
এবিষয়ে সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ডাঃ আ.ফ.ম রুহুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ব্যস্ত আছি সাতক্ষীরার মিটিংয়ে যাবো পরে কথা বলো।

সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য এসএম, জগলুল হায়দারের সাথে কথা বললে তিনি জানান, চিকিৎসকও জনবল সংকটের বিষয়টি নিরসনে দ্রুত সরকারের সংশ্লিষ্ঠ বিভাগের দৃস্টি আকর্ষণ করছি।
এ ব্যাপারে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদী বলেন, যেহেতু আমার দপ্তরের আওতায় পড়ে না। অসহায়,দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জরুরী ভিত্তিতে হাসপাতালে ডাক্তার ও জনবল নিয়োগ দেওয়ার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

#