কালের আর্বতনে নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে কপোতাক্ষ নদসহ ৮০টি সংযোগ খালের নিশানা


432 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
কালের আর্বতনে নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে কপোতাক্ষ নদসহ ৮০টি সংযোগ খালের নিশানা
সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৫ তালা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

মাহফুজুর রহমান মধু ,পাটকেলঘাটা :
মহাকবি মাইকেল মধুসুধন দত্ত ও স্যার পিসিরায়সহ বহু গুণিজনের স্মৃতিবিজোড়িত কপোতাক্ষ নদসহ অসংখ্য খাল আজ সমতল ভূমিতে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তালা এলাকার ৮০টি খালের কোন নিশানা নেই। ফলে কৃষি নির্ভর পাটকেলঘাটাসহ নদের তীরবর্তী সকল শ্রেণী বা পেশার মানুষেরা দীর্ঘ এক যুগেরও বেশী সময় ধরে চাতক পাখির ন্যায় চেয়ে আছে তাদের প্রাণের দাবী কপোতাক্ষ নদ যেন তার হারানো যৌবন ফিরে পায়।

তথ্যানুসন্ধানে জানা য়ায় , পনি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিত বেঁড়িবাধ, সুইস গেট নির্মাণ এবং অবৈধ দখলদারদের সীমাহীন অত্যাচারে কপোতাক্ষ তার গতিপথ পাল্টেও রক্ষা পায়নি। সেই সাথে মৃত্য ঘটেছে কপোতাক্ষ তীরবর্তী প্রায় ৮০টি সংযোগ খালের।

আনুমানিক ৪০বছরের ব্যাবধানে কপোতাক্ষ নদসহ ৮০টি সংযোগ খাল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় বর্ষা মৌসুমে  জলাবদ্ধতা আর শুষ্ক মৌসুমে পানি শূন্যতা হয়ে পড়ে। ফলে প্রতি বছর তীরবর্তী অঞ্চল গুলোতে কোটি কোটি টাকার ফসল ও সম্পদহানী  ঘটেছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি শূন্যতার কারণে সেচ প্রকল্পগুলো বিকল হয়ে পড়ে। অপর দিকে বর্ষা মৌসুমে পানি বদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে রাস্তা-ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্ষেতের ফসল, পুকুর, মৎস্য ঘের তলিয়ে পানিতে একাকার হয়ে যায়। সে সময় কপোতাক্ষ তীরবর্তী বসবাসরত কয়েক লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করে থাকে। বর্তমান অভিশপ্ত কপোতাক্ষ অববাহিকার পাটকেলঘাটা,তালাসহ ৯টি উপজেলার বিভিন্ন শ্রেনী ও পেশার মানুষ ৫০ হাজার জেলে ও মৎস্যজীবি পরিবারের ভাগ্যে নেমে  এসেছে চরম দূর্দশা। নদটির নাব্যতা হ্রাস, সেই সাথে সংযুক্ত প্রায় ৮০টি খাল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তাদের মাছ শিকার বন্ধ হয়ে গেছে। এক সময় নদের তীরবর্তী বসবাসকারী জেলে ও মৎস্যজীবী পরিবারগুলো নৌ-পথে পণ্য ও মৎস্য শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। বর্তমানে নদটির নাব্যতা হ্রাসের কারণে সেটি আর হচ্ছে না।

বেসরকারী একটি সংস্থার জরীপ সূত্রে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের আর্শিবাদ দুগ্ধরূপী এ কপোতাক্ষ নদটির বিচ্ছিন্ন ৮২কিলোমিটার অংশসহ ২৫৭কিলোমিটার অর্থাৎ যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার তাহেরপুর থেকে তালা উপজেলার বুক চিরে প্রবাহিত হয়ে খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাড়–লি, বেদকাশির মধ্য দিয়ে সুন্দরবন পর্যন্ত এ নদের অবস্থান। এখান থেকে ২৫-৩০ বছর পূর্বে পাইকগাছার রাড়–লি থেকে বেদকাশি সুন্দরবন পর্যন্ত ৮২ কিলোমিটার অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ষাটের দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ড নদের দু’পাশে অপরিকল্পিতভাবে বেড়ি বাঁধ, সংযোগ খালের মুখে স্লুইস গেট নির্মাণ ও পোল্ডার ব্যবস্থার কারনে নদটির সাথে প্রায় ৮০টি খালের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যার ফলে  নদের তলদেশ পলিভরাট হয়ে সেখানে এখন চলছে চাষাবাদ। খালগুলোর নাম নিশানা পর্যন্ত মানুষের মন থেকে মুছে যাচ্ছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন।

কপোতাক্ষ এককালে এ অঞ্চলের মানুষের অর্শিবাদ হলেও বর্তমানে অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। সুষ্ঠ পরিকল্পনা আর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দ্রত না করা হলে ভারী বৃষ্টিপাত দেখা দিলেই জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ ধারন করবে বলে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন এনজিও, পানি কমিটি, কপোতাক্ষ বাাঁচাও আন্দোলন কমিটি বরাবর আন্দোলন সংগ্রাম করলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোন সাড়া মেলেনি।

বিগত সরকার গুলো নদটি খনন ও সংস্কার কাজ দ্রত করার নির্দেশ দিয়েও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই দেশের নদ নদীর নাব্যতা রক্ষার ব্যাপক ভিত্তিক খননের মহাপরিল্পনা ঘোষনা দিয়ে যত দ্রত সম্ভব কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশে ২৬২ কোটি টাকার কাজ কপোতাক্ষ খননের কাজ শুরু হলেও পানি নিস্কাশনের জন্য খালখননের  কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না ।

জলবায়ুর পরিবর্তন আর পলিতে জমে নদের নাব্যতা এত পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে যে জোয়ার ভাটা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। এই সুযোগে ক্ষীণ কপোতাক্ষের চর রাতারাতি প্রভারশালী দখলবাজরা বাড়ী ঘর ও দোকান পাট নির্মাণ, মৎস্য ঘের, ধানচাষ সহ ইটভাটা নির্মাণ অব্যাহত চালিয়ে যাচ্ছে তহসীলদারেরা কৌশলে বড় অংকের উৎকোচের বিনিময়ে কয়েক বছর পিছন থেকে একাধিক বছরের বন্দোবস্ত দিচ্ছে। এছাড়া সংযোগ খাল গুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বদ্ধ জলাশয় দেখিয়ে বাধ দিয়ে মাছ চাষের জন্য বন্দোবস্ত অব্যহত রয়েছে। এভাবেই চলতে থাকলে আগামী বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টিপাত হলেই পানিতে তলিয়ে কয়েক লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে।

কপোতাক্ষ যদি সুষ্ঠ পরিকল্পনায় খনন বাস্তবায়ন না হয় এবং খালগুলো যদি খননে উদ্যোগ গ্রহন না করে ।  তাহলে  খুব শীঘ্রই দেশের ভূ-খন্ড থেকে কপোতাক্ষসহ খাল গুলো  বিলীন হয়ে সমতল ভূমিতে পরিণত হবে।