কৃষকের কান্না হয়ে ঝরেছে বৃষ্টি


97 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
কৃষকের কান্না হয়ে ঝরেছে বৃষ্টি
ডিসেম্বর ৭, ২০২১ কৃষি দুুর্যোগ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

বিদায় বেলায় ভোগাল জাওয়াদ

অনলাইন ডেস্ক ::

অগ্রহায়ণের অকাল বর্ষণ ছিল দিনভর। টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে সোমবার নগরবাসীকে সারতে হয় প্রয়োজনীয় কাজ। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর এলাকার ছবি- মাহবুব হোসেন নবীন
আম্ম্ফান ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল, তারপর ইয়াসের প্রভাবও কম পড়েনি। এবার অসময়ে ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ আছড়ে না পড়লেও সারাদেশে দফায় দফায় বৃষ্টি হয়েছে। সেই বৃষ্টি যেন কৃষকের কান্না হয়ে ঝরেছে। আমন ধান কেটে ঘরে তোলার আগ মুহূর্তে হঠাৎ এ দুর্যোগে কৃষক পড়েছেন মহাদুশ্চিন্তায়। ক্ষতি হয়েছে রবিশস্যের। পচে গেছে ক্ষেতের পেঁয়াজ, গম, খেসারি ও আলু। সুন্দরবনের দুবলার চরে কয়েক কোটি টাকার শুঁটকি ক্ষতির মুখে পড়েছে। শীতকালীন সবজি অনেক জায়গায় পানির নিচে চলে গেছে। নড়াইল, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর ও বরগুনায় ফসলের বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ উপকূলে আসার আগেই শক্তি হারিয়ে পরিণত হয়েছে লঘুচাপে। গতকাল সোমবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় ঢাকায় ৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের অধিকাংশ এলাকায় গুঁড়ি গুঁড়ি অথবা হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জানান, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিম মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত নিম্নচাপটি আরও উত্তর-উত্তর/পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে সুস্পষ্ট লঘুচাপে রূপ নিয়েছে। বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বৃষ্টি ঝরিয়ে এটি ধীরে ধীরে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। তবে উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া অব্যাহত থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মঙ্গলবার (আজ) পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। বৃষ্টি সরে গিয়ে রোদেলা আবহাওয়ার আভাস রয়েছে। এখন ক্রমান্বয়ে রাতের তাপমাত্রা কমতে থাকবে। মেঘলা আবহাওয়া কেটে যাওয়ার পর উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বেশ শীত অনুভূত হবে। পৌষের শুরুতে শীত জেঁকে বসবে বলে আভাস দেন এ আবহাওয়াবিদ।
২০১৯ সালের অক্টোবরে দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় কৃষি খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত বছরও কয়েক দফা বন্যায় কৃষকের মাথায় হাত পড়ে। এবার বৃষ্টিতে ফসলের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিক জানাতে পারেনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সারাদেশ থেকে তথ্য এলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত হিসাব দেওয়া যাবে বলে জানায় তারা।
তবে স্থানীয় কৃষক ও সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তাৎক্ষণিকভাবে যে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে, তাতেই উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কৃষকরা বলছেন, এই ক্ষতি পোষাতে সরকারিভাবে তাদের সহায়তা প্রয়োজন।
নড়াইলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে ১৮ হাজার ৬৩২ হেক্টর জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এক হাজার ৪৫ হেক্টর জমির শীতকালীন ফসল, ১৬২ হেক্টর জমির বোরো বীজতলা, ৫০ হেক্টর জমির মরিচ, সাত হাজার ৭৩০ হেক্টর জমির সরিষা, সাত হাজার ৫৪৫ হেক্টর জমির মসুর ডাল এবং দুই হাজার ১০০ হেক্টর জমির গম।
দেশের সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদনকারী অঞ্চল খ্যাত মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানের কৃষকরা জানান, দু’দিনের টানা বৃষ্টিতে এ উপজেলার অন্তত ১০ হাজার চাষির আলু তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন গজারিয়ার আলুচাষিরাও। ইমামপুর গ্রামের কৃষক মোস্তাফিজুর বলেন, ১০ বিঘা জমিতে আলু ছিল। বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেল।
বরগুনার বেতাগী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, একটি পৌরসভাসহ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ১০ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমিতে রোপা আমন রয়েছে। এর মধ্যে সাত হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ধানগাছ মাটিতে মিশে গেছে। সবজি ক্ষেতেরও ক্ষতি হয়েছে।
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, পেঁয়াজ চাষে প্রসিদ্ধ এই উপজেলায় এ বছর আট হাজার পাঁচ হেক্টর জমিতে আবাদের কথা ছিল। এ জন্য চাষিরা বীজতলা তৈরি করেন ৪২০ হেক্টর জমিতে। অতিবৃষ্টিতে এসব বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। বোরো বীজতলারও একই অবস্থা।
বরিশাল কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণাঞ্চলে আমন ধান আধাপাকা হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি কৃষক খেসারি ও মসুর ডাল এবং গোলআলু বপন করেছেন। বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে এসব ফসলের বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
লক্ষ্মীপুরেও শীতকালীন সবজি ও পাকা ধান ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার কৃষকরা। এ ছাড়া বৃষ্টির পানিতে অর্ধশত ইটভাটার কাঁচা ইট গলে নষ্ট হয়ে গেছে। একইভাবে ঝিনাইদহের শৈলকূপায়ও নষ্ট হয়েছে লাখ লাখ কাঁচা ইট। যশোর জেলায় গতকাল দুপুর ২টা পর্যন্ত দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এ ছাড়া ফেরি সংকটের পাশাপাশি বৈরী আবহাওয়ায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে যানবাহন পারাপার ব্যাহত হয়েছে। ফলে গতকাল সড়কে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। জাওয়াদের প্রভাবে নোয়াখালীর মেঘনা নদী উত্তাল হয়ে পড়ে। ফলে হাতিয়ার সঙ্গে নোয়াখালীর মূল ভূখণ্ডে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম-ভোলা নৌপথে চলাচলকারী সব নৌযান বন্ধ করে দেয় উপজেলা প্রশাসন।
দুর্যোগে কৃষকের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কথা হয় খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের (খানি) সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম মাসুদের সঙ্গে। তিনি বলেন, দুর্যোগ থেকে মুক্ত হতে পারছেন না কৃষক। একের পর এক দুর্যোগ লেগেই আছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে বিশেষ সুরক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্নিষ্ট এলাকার ব্যুরো, অফিস ও প্রতিনিধিরা)