কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী,দূর হোক সকল অঞ্জতা, কুসংস্কার


306 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী,দূর হোক সকল অঞ্জতা, কুসংস্কার
আগস্ট ১০, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

সচ্চিদানন্দদে সদয়

জন্মাষ্টমী হল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মতিথি। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রোহিণী লক্ষত্র যোগে কৃষ্ণ মধুরায় কংসের কারাগারে মাতা দেবকীর অষ্টম সন্তান রূপে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর এই জন্মদিনকে জন্মাষ্টমী বলা হয়।১৪২৭ বাংলার (২০২০ সাল) জন্মাষ্টমী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৫২৪৬তম জন্মাষ্টমী। কারণ, বিভিন্ন পুরাণ ও প্রাচীন গ্রন্থ মতে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ১২৫ বছর প্রকট লীলাবিলাস করেন। ১২৫ বছর ধরাধামে অবস্থান করে বৈকুন্ঠে গমন করেন। মাঘ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে তিনি ইহধাম ত্যাগ করে অন্তর্ধান করেন। সেই দিনই কলি প্রবেশ করে। সেই দিন ছিল শুক্রবার। খ্রিস্টপূর্ব ৩১০১ সালে কলিযুগ আরম্ভ হয়। বর্তমান ২০২০ খ্রিস্টাব্দ। তা হলে কলির বয়স ৩১০১+২০২০=৫১২১ বছর। শ্রীকৃষ্ণের অর্ন্তধানের দিন কলির আবির্ভাব। শ্রীকৃষ্ণ ১২৫ বছর প্রকট লীলা করেছেন। তা হলে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ৫১২১+১২৫=৫২৪৬ বছর পূর্বে হয়েছিল।কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী হিন্দু ধর্মের একটি প্রবিত্র উৎসব যা কৃষ্ণের ( বিষ্ণুর অষ্টম অবতার ) জন্মদিন হিসাবে পালন করা হয়। এই উৎসব বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন জন্মাষ্টমী, গোকুলাষ্টামি, অষ্টমী রোহিণী, শ্রীকৃষ্ণ জয়ন্তী।শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন দেবকি ও বাসুদেব এর সন্তান এবং হিন্দু ধর্মাম্বলীরা তাঁর জন্মদিন জন্মাষ্টমী হিসেবে পালন করে। শ্রীকৃষ্ণের জন্মের সময় চারিদিকে অরাজকতা, নিপীড়ণ, অত্যাচার চরম পর্যায়ে ছিল। সেই সময় মানুষের স্বাধীনতা বলে কিছু ছিল না। সর্বত্র ছিল অশুভ শক্তির বিস্তার।শ্রীকৃষ্ণের মামা কংস ছিলেন তাঁর জীবনের শত্রু। মথুরাতে শ্রীকৃষ্ণের জন্মের সাথে সাথে সেই রাতে তাঁর বাবা বাসুদেব তাঁকে যমুনা নদী পার করে গোকুলে পালক মাতা পিতা যশোদা ও নন্দ র কাছে রেখে আসেন।কৃষ্ণ নামের অর্থ-সংক্রান্ত একাধিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মহাভারতের উদ্যোগপর্বে (৫।৭১।৪)বলা হয়ছে কৃষ্ণ শব্দটি কৃষ এবং ণ এই দুটি মূল থেকে উৎপন্ন। কৃষ শব্দের অর্থ টেনে আনা বা কর্ষণ করা; সেই সূত্রে শব্দটি ভূ (অর্থাৎ, অস্তিত্ব বা পৃথিবী) শব্দটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ণ শব্দটিকে নিবৃত্তি শব্দের প্রতিভূ ধরা হয়। মহাভারতের উক্ত শ্লোকটি চৈতন্য চরিতামৃত ও শ্রীল প্রভুপাদের টীকায় ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে ভূ শব্দটির নিহিত অর্থ আকর্ষণীয় অস্তিত্ব; অর্থাৎ কৃষ্ণ শব্দের অর্থ সকল দিক থেকে আকর্ষণীয় ব্যক্তি। ভাগবত পুরাণের আত্মারাম স্তবে কৃষ্ণের গুণাবলি বর্ণিত হয়েছে। বল্লভ সম্প্রদায়ের ব্রহ্মসম্ভব মন্ত্রে কৃষ্ণ নামের মূল শব্দগুলিকে বস্ত, আত্মা ও দিব্য কারণের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পাপের বিনাশশক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ র্ক হয়েছে।শাস্ত্রীয় বিবরণ ও জ্যোতিষ গণনার ভিত্তিতে লোকবিশ্বাস অনুযায়ী কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল ১৮ অথবা ২১ আগষ্ট বুধবার। কৃষ্ণের জন্মদিনটি কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী বা জন্মাষ্টমী নামে পালিত হয়। কৃষ্ণ যাদব-রাজধানী মথুরার রাজপরিবারের সন্তান। তিনি বসুদেব ও দেবকীর অষ্টম পুত্র। তাঁর পিতামাতা উভয়ে যাদব বংশীয়। দেবকীর দাদা কংস তাঁদের পিতা উগ্রসেনকে বন্দী করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। একটি দৈববাণীর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের হাতে তাঁর মৃত্যু হবে। এই কথা শুনে তিনি দেবকী ও বসুদেবকে কারারুদ্ধ করেন এবং তাঁদের প্রথম ছয় পুত্রকে হত্যা করেন। দেবকী তাঁর সপ্তম গর্ভ রোহিণীকে প্রদান করলে, বলরামের জন্ম হয়। এরপরই কৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন।
কৃষ্ণের জীবন বিপন্ন জেনে জন্মরাত্রেই দৈবসহায়তায় কারাগার থেকে বসুদেব তাঁকে গোকুলে তাঁর পালক মাতাপিতা যশোদা ও নন্দের কাছে রেখে আসেন। কৃষ্ণ ছাড়া বসুদেবের আরও দুই সন্তানের প্রাণরক্ষা হয়েছিল। প্রথমজন বলরাম (যিনি বসুদেবের প্রথমা স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন) এবং সুভদ্রা (বসুদেব ও রোহিণীর কন্যা, যিনি বলরাম ও কৃষ্ণের অনেক পরে জন্মগ্রহণ করেন)। ভাগবত পুরাণ অনুযায়ী, কোনো প্রকার যৌনসংগম ব্যতিরেকেই কেবলমাত্র “মানসিক যোগের” ফলে কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল। যৌবনে মথুরায় প্রত্যাবর্তন করে কৃষ্ণ তাঁর মামা কংসের অনুগামীদের দ্বারা সংঘটিত বহু হত্যার ষড়যন্ত্র থেকে আত্মরক্ষা করে কংসকে বধ করেন। তিনি কংসের পিতা উগ্রসেনকে পুনরায় যাদবকুলের রাজা হিসেবে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন এবং নিজে সেখানে অন্যতম যুবরাজ হিসেবে অবস্থান করেন। এই সময়ে তাঁর সাথে অর্জুন সহ কুরু রাজ্যের অন্যান্য পান্ডব রাজপুত্রদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে তিনি যাদবদের নিয়ে দ্বারকা নগরীতে (অধুনা গুজরাত) চলে আসেন এবং সেখানেই তাঁর রাজত্ব স্থাপন করেন।কৃষ্ণ বিদর্ভ রাজ্যের রাজকন্যা রুক্সিণীকে তাঁর অনুরোধে শিশুপালের সাথে অনুষ্ঠেয় বিবাহ মন্ডপ থেকে হরণ করে নিয়ে এসে বিবাহ করেন। কৃষ্ণের মহিষীদের মধ্যে আটজন ছিলেন প্রধান, যাদের অষ্টভার্যা নামেও অভিহিত করা হয়। এঁরা হলেন রুক্সিণী, সত্যভামা, জাম্ববতী, কালিন্দি, মিত্রবৃন্দা, নগ্নাজিতি, ভদ্রা এবং লক্ষণা।কৃষ্ণ নরকাসুরকে বধ করে সমস্ত বন্দী নারীদের মুক্ত করেন। তৎকালীন সামাজিক রীতি অনুসারে বন্দী নারীদের সমাজে কোন সম্মান ছিল না এবং তাদের বিবাহের কোন উপায় ছিল না কারণ তারা ইতিপূর্বে নরকাসুরের অধীনে ছিল।বৈষ্ণব মতে কৃষ্ণের সমস্ত মহিষীগণই ছিলেন দেবী লক্ষ্মীর অবতার অথবা সেই সব নারী যারা বহু জন্মের তপস্যাবলে কৃষ্ণের স্ত্রী হওয়ার অধিকার লাভ করেছিলেন। এছাড়া তাঁর এক স্ত্রী সত্যভামা ছিলেন রাধার অংশ। যখন যুধিষ্ঠির সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন তিনি সমস্ত মহান রাজাদের সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান। যখন তিনি তাঁদের প্রত্যেককে একে একে সম্মান জ্ঞাপন করতে আরম্ভ করলেন তখন তিনি সর্বপ্রথম কৃষ্ণকে সম্মান জ্ঞাপন করলেন কারণ তিনি কৃষ্ণকেই সমস্ত রাজাদের মধ্যে মহান হিসেবে গণ্য করেছিলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল রাজারাই তাতে সম্মত হলেও কৃষ্ণের আত্মীয় শিশুপাল তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কৃষ্ণের নিন্দা শুরু করেন। কৃষ্ণ শিশুপালের মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি শিশুপালের একশত অপরাধ ক্ষমা করবেন। তাই যখন শিশুপাল একশত অপরাধ অতিক্রম করলেন তখন তিনি তার বিরাট রূপ ধারণ করে সুদর্শন চক্রের দ্বারা শিশুপালকে বধ করলেন। সেইসময়ে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রও দিব্যদৃষ্টি লাভ করে কৃষ্ণের সেই রূপ দর্শন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পুরাণ অনুসারে শিশুপাল এবং দন্তবক্র নামে অপর এক ব্যক্তি পূর্বজন্মে ছিলেন স্বর্গে দেবতা বিষ্ণুর দ্বাররক্ষক জয় ও বিজয়। তাঁরা অভিশপ্ত হয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং আবার বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের দ্বারাই স্বর্গে প্রত্যাগমন করেন। শুক্রবার জন্মাষ্টমী । এদিন দেশজুড়ে মহা সমারোহে জন্মষ্টমী পালন করা হচ্ছে। কৃষ্ণের ননী চুরি -র গল্প তো কারওই অজানা নয়। তাই তো কৃষ্ণ ননী চোরা , মাখন চোর প্রভৃতি নামে বিখ্যাত। এখনও জন্মাষ্টমীর দিনে দেশের নানা প্রান্তে কৃষ্ণের ননী চুরির কায়দায় উঁচুতে উঠে হাঁড়ি ভাঙার প্রচলন রয়েছে। কৃষ্ণের ননী চুরির অর্থ পূরাণে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন প্রকার দেওয়া রয়েছে। এক জায়গায় বলা হচ্ছে, কৃষ্ণ সবসময় সাদা বা নির্ভেজাল হৃদয় চুরি করত। মাখন বা ননী –র রঙ যেমন সাদা বা শুভ্র, আমাদের হৃদয়ও তেমনই দাগহীন, নির্ভেজাল, স্বচ্ছ্ব হওয়া প্রয়োজন। হৃদয় থেকে রাগ, অহঙ্কার, ঘৃনা, হিংসা, লোভ, অহং প্রভৃতি দূর করা উচিত ্আর এক জায়গায় বলা আছে যে, আমাদের মন ননীর থেকেও হালকা হওয়া উচিত্। ননী যেমন জলে ভাসে, আমাদের মনও ততটাই হালকা হওয়া উচিত। আমাদের চিন্তা চেতনা তেমন হওয়া উচিত।শুভ দিনে পৃথিবীর সকল প্রানী সুস্থ ও শান্তিতে থাকুক ।

(সচ্চিদানন্দদে সদয়,সাংবাদিক)