কেশবপুরে আইসক্রীমের আঁটি বেঁধে জীবিকা নির্বাহ করছে গৃহবধুরা


145 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
কেশবপুরে আইসক্রীমের আঁটি বেঁধে জীবিকা নির্বাহ করছে গৃহবধুরা
জানুয়ারি ১১, ২০১৯ খুলনা বিভাগ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ ::

কেশবপুর উপজেলার পাঁজিয়া ইউনিয়নের একটি গ্রাম ইমাননগর । ইমাননগর ও পার্শ্ববর্তী মুজগুন্নী গ্রামের প্রায় ৩ শতাধিক গৃহিনী বাড়ির বারান্দাসহ আঙ্গীনায় বসে আইসক্রীমের কাঠি ও দই খাওয়া চামচের আঁটি বেঁধে অর্থ উপার্জন করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছেন। পরিবারের পুরুষ সদস্যরাও মাঠের কাজ শেষে বাড়িতে এসে আঠি বাঁধার কাজও করছে। নারী-পুরুষের পাশাপাশি পরিবারের স্কুল পড়–য়া ছেলে মেয়েরাও পড়া লেখার ফাঁকে কাজ করে মা-বাবাকে সহযোগিতা করে থাকে। কেশবপুর-মণিরামপুর সিমান্ত গ্রাম গুলোর নারী-পুরুষ, শিশু কিশোরসহ সকল শ্রেণির মানুষের মুখে মুখে কাঠি ও চামচের কথা উঠে আসায় ইমাননগর গ্রামটি এখন মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। উপজেলা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে ইমাননগর গ্রামটি অবস্থিত। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ শ্রমজীবী। শ্রমের উপরই তাঁদের নির্ভর করতে হয়। গ্রামের উদ্যোমী যুবক জাহাঙ্গীর আলম এলাকায় মাহি স্টিক এন্ড স্পুন প্রোডাক্টসের একটি কারখানা স্থাপন করে মানুষের কাজের সুযোগ করে দিয়েছেন।
সরেজমিন ইমাননগর গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, প্রায় পরিবারেই গৃহিনীরা বাড়ির বারান্দা ও আঙ্গীনায় বসে আইসক্রীমের কাঠি ও দইয়ের চামচের কাঠি আঁটি বাঁধার কাজ করছেন। বাড়ির আঙ্গীনায় আইসক্রীমের কাঠির আটি বাঁধার সময় কথা হয় ইমাননগর গ্রামের খাদিজা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন গত আট বছর ধরে এ কাজ করছেন। সাড়ে ৮ থেকে ৯০০ কাঠির একটি আটি বাঁধতে পারলে ২ টাকা পাওয়া যায়। সংসারের কাজের ফাঁকে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০টি আটি বাঁধা যায়। এ কাজ করে তিনি সংসারে সহযোগিতার পাশাপাশি নবম শ্রেণিতে পড়–য়া মেয়ে সুমাইয়া ও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়–য়া ছেলে হারুণ-অর রশিদের পড়া লেখার পেছনেও ব্যয় করে থাকেন। প্রতিদিন কারখানায় শ্রমিকরা নরম জাতীয় কাঠ মেশিন দ্বারা কেটে আইসক্রীমের কাঠি ও দইয়ের চামচ তৈরি করে। রোদে শুকিয়ে ফিনিশিং ম্যাশিনে দিয়ে এ কাঠি ও চামচ ঝকঝকে করা হয়। এরপর কাঠি ও চামচ বস্তা বন্দি (ডোব) করে উপজেলার ইমাননগর ও পার্শ্ববর্তী মুজগুন্নি গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে আঁটি বেঁধে প্যাকেটজাত করার জন্য পৌঁছে দেওয়া হয়। সাড়ে ৮ থেকে ৯০০ কাঠির একটি আটি বাবদ ২ টাকা এবং ১ হাজার চামচের একটি আঁটি বেঁধে একটি প্যাকেট করে এক একজন গৃহিনী পান ২ টাকা থেকে সাড়ে ৪ টাকা পর্যন্ত। এভাবে আঁটি বেঁধে প্যাকেটজাত করে নারী পুরুষ ও শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ টাকা আয় করে থাকেন। মাহি স্টিক এন্ড স্পুন প্রোডাক্টসের মালিক জাহাঙ্গীর আলম এ আইস ক্রীমের কাঠি ও দইয়ের চামচ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করে থাকেন। তিনি আইসক্রীমের কাঠি ও দইয়ের চামচ তৈরির কাঁচা মাল হিসেবে নরম জাতীয় কাঠও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আমদানি করে থাকেন। ইমাননগর গ্রামে ফিনিশিং ম্যাশিনে কাজ করা কালে তাসলিমা খাতুন বলেন, তিনি ৫ বছর ধরে এখানে হাজিরা হিসাবে কাজ করছেন। হাজিরা হিসাবে ১৬০ টাকা পান প্রতিদিন। ওই টাকা দিয়ে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি যশোর এমএম কলেজে অনার্সে পড়–য়া ছেলে বিল্লাল কে পড়া লেখা করাচ্ছেন। মুজগুন্নী গ্রামের জাহিদুল ইসলাম বলেন, জাহাঙ্গীর আলমের কারখানায় শ্রমিকরা কাঠি ও চামচ তৈরির কাজ করে এক জন শ্রমিক ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় করে থাকে। নূরজাহান ও লাভলী বেগম বলেন, তারা প্রতিদিন সাংসারিক কাজ কর্মের ফাঁকে এ আয়ের টাকা দিয়ে গরু ছাগল হাঁস মুরগী কিনে পালন করছে। গৃহিনী জোহরা ও ফতেমা খাতুন জানান, তারা কাজ করে তাদের সংসারে সুখ শান্তি ফিরে এসেছে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়–য়া শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান জানায়, প্রতিদিন সে স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে পিতা মাতাকে সহযোগিতার জন্য আইসক্রীমের কাঠি ও চামচের আঁটি বেঁধে প্যাকেটজাত করার কাজ করে থাকে। বৃদ্ধ কৃষক আব্দুর রহিম (৭০) বলেন, এ কাজটি করার কারণে ইমাননগর গ্রামটি ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে।
মাহি স্টিক এন্ড স্পুন প্রোডাক্টসের মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, তিনি এক সময় আবুল খায়ের গ্রুপের মার্কেটিং বিভাগে কাজ করতেন। ওই সময় তার ভেতর মানুষিকতা তৈরি হয় গ্রামে কিছু করার। চাকরি ছেড়ে বাড়িতে এসে ২০০৯ সালে আইসক্রীমের কাঠি ও দইয়ের চামচ তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। প্রতিবছর তাঁর ২০০ বস্তা চামচ ও ২০০০ বস্তা কাঠি সরবরাহের চাহিদা পান। তিনি আরও জানান, গ্রামের নারীরা সাড়ে ৮ থেকে ৯০০ কাঠির একটি আটি বাবদ ২ টাকা এবং ১ হাজার চামচের একটি প্যাকেট করে পান সাড়ে ৪ টাকা। তাছাড়া পুরুষ শ্রমিকরাও কারখানা ও কাঠি শোকানোর কাজ করে উপার্জন করছেন। তাঁর কারখানার আইসক্রীমের কাঠি ও দইয়ের চামচ রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়। কেশবপুর উপজেলার পাঁজিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, তাঁর ইউনিয়নের ইমাননগর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের আইসক্রীমের কাঠি ও দইয়ের চামচ তৈরির কারখানায় শ্রমিকসহ গ্রামের নারী ও স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা কাঠি ও চামচের আঁটি বেঁধে প্যাকেটজাত করে অর্থ উপার্জন করছে। গ্রামটি এখন মডেল হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।