‘ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে কৃষি ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে হবে’


513 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
‘ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে কৃষি ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে হবে’
অক্টোবর ১৭, ২০১৫ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

বিশেষ প্রতিনিধি :
ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বিশ্ব গড়ে তুলতে  খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই কৃষি উন্নয়ন নিশ্চিত করা দরকার।  বাংলাদেশ এরই মধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ন হয়ে উঠতে শুরু করেছে।বিদেশে বহু ধরনের খাদ্য পন্য  রফতানি করে বংলাদেশ নিজেকে আরও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাচ্ছে। এই ধারা চলতে থাকলে  একদিন বাংলাদেশ হবে দারিদ্র ও ক্ষুধামুক্ত এবং একটি স্বয়ংসম্পুর্ন দেশ। আর  এই লক্ষ্য অর্জনে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।

শনিবার সকালে সাতক্ষীরায় আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে একথা বলেছেন বক্তারা। এ প্রসঙ্গে তারা কৃষিব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে আরও বলেন কৃষির উন্নয়নই হতে পারে খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম চাবিকাঠি।

বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে গোলটেবিল আলোচনায় ‘গ্রামীন দারিদ্র বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষায় কৃষি’ শীর্ষক এক ধারনা পত্র পাঠ করে  শোনান দৈনিক দক্ষিনের মশাল পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হাফিজুর রহমান মাসুম।সাতক্ষীরা সদর উপজেলা ডিজিটাল হলরুমে জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসানের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন সাতক্ষীরা সদর আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মীর মোস্তাক আহমেদ রবি, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম, জেলা জাতীয় পার্টি সভাপতি শেখ আজহার হোসেন, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান বাবু, ভাইস চেয়ারম্যান কোহিনুর ইসলাম, দৈনিক দক্ষিনের মশাল সম্পাদক অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহি, বেসরকারি সংস্থা বংলাদেশ  ভিশন এর নির্বাহী পরিচালক অপরেশ পাল, এড. ফাহিমুল হক কিসলু,  মকসুমুল হাকিম , এড. শাহনাজ পারভিন মিলি, সাংবাদিক সুভাষ চৌধুরী , কল্যাণ ব্যানার্জি, এম. কামরুজ্জামান, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জ্বল, গোলাম সরোয়ার, উত্তরনের সেলিম রেজা স্বপন, জেলা প্রাণি সম্পদ অফিসার, জেলা কৃষি সম্প্রসারন সহকারি উপপরিচালক, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রমুখ।বেসরকারি সংস্থা প্রগতি , অক্সফাম ও গ্রো এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় এই গোলটেবিল বৈঠক।

ধারনাপত্রে বলা হয়  বিশ্বে প্রতিদিন ১৭ হাজার শিশুর মৃত্যু ঘটছে খাদ্যের অভাবে।   জাতিসংঘের এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয় ১৯৬০ সালে পৃথিবীতে মাথাপিছু গড়পড়তা প্রতিদিনের খাদ্যের যোগান ছিল ২ হাজার ২২০ কিলোক্যালরি। ২০০৮ সালে তা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৯০ কিলোক্যালরিতে।  এতে স্পষ্ট হয় যে খাদ্যের যোগান বেড়েছে । কিন্তু  সুসম বন্টনের অভাবে মানুষ ক্ষুধার্ত থাকছে।  এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তাহীন দেশের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে উল্লেখ করে ধারনাপত্রে বলা হয় ২০১৩ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী দেশের ১৫ কোটি ৩৬ লাখ জনগোষ্ঠীর সাড়ে ৩১ শতাংশ এখনও দারিদ্র সীমার নিচে রয়েছে।

ধারনাপত্রের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার এড়িয়ে জৈব সার ব্যবহার এবং দেশি পদ্ধতি ব্যবহার করে ফসলকে বালাইমুক্ত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। ভূমি বিপন্নতা রোধ করে প্রতিদিন অকৃষিতে জমি চলে যাওয়ার প্রবনতা  রোধ করতে হবে।  উপকূলীয় এলাকায় লবনাক্ততারোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই জমিতে ধান ও মাছ চাষে আরও উদ্যোগী হতে হবে। দেশে গবাদি পশু ও অন্যান্য প্রাণি সম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।  ফসলের বীজ সংরক্ষনের উপযোগী ব্যবস্থা নিতে হবে এবং  মাটির স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে।  চর এলাকায় ভূমিবৃদ্ধিকে কাজে আনতে হবে।  জলাবদ্ধতা রোধে ছোট ছোট খাল, জলাভূমি ,পুকুর ডোবা খননে উদ্যোগী হতে হবে।  বিষমুক্ত ফল ও সবজি উৎপাদনে কৃষি বিভাগকে উদ্যোগী হতে হবে। অপরিকল্পিত  চিংড়ি চাষ রোধ এবং লোকালয়ে বিশেষ করে কৃষি জমি নষ্ট করে ইটভাটা তৈরির অনুমতি দেওয়া চলবে না।  নারীর শ্রমকে বৈষম্যের কবল থেকে বের করে এনে  তাদেরকে পুরুষের সমান মজুরি দিতে হবে।  নদী ভরাট বন্ধে কাজ করতে হবে। সাথে সাথে নদী খনন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে।  দুধের উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং সমাজে পুষ্টি দুরীকরনে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।  সাদাজাতের মাছের উৎপাদন বাড়াতে হবে। চিংড়ি খামারে পোলট্রি ফীড ব্যবহার করা যাবে না। খাসজমি জবর দখলমুক্ত করে তা কৃষিতে ব্যবহার করতে হবে।

খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে এসব সুপারিশের পাশাপাশি বক্তারা  সাতক্ষীরার উদ্বৃত্ত খাদ্য ফসলের কথা তুলে ধরেন। এতে বলা হয় সাতক্ষীরায় বিষমুক্ত আম উৎপাদন হচ্ছে এবং বিদেশে বাজার তৈরি হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি স্থিতিশীলতার পর্যায়ে রয়েছে উল্লেখ করে তারা বলেন সাতক্ষীরায় ছয় লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে ।  এর চার লাখ টন সাতক্ষীরায় ব্যবহৃত হলেও বাকি দুই লাখ টন দেশের ঘাটতি এলাকায় চলে যাচ্ছে। মাছের উৎপাদন বার্ষিক এক লাখ টন হলেও এই জেলায় ব্যবহৃত হচ্ছে ৩০ হাজার মেট্রিক টন।  এছাড়া সবজি ১ লাখ ৪৪ হাজার টন উৎপাদন হচ্ছে। তার বিপরীতে সাতক্ষীরায় ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র ৭০ হাজার টন । দৈনিক এক লাখ লিটার দুধ উৎপাদিত হলেও  এই জেলায় ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র ১২ হাজার লিটার । এ প্রসঙ্গে তারা ভেজালমুক্ত খাদ্য ও  ননীযুক্ত দুধ বিপননের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন । সাগর পারের জেলা হওয়ায় সাতক্ষীরায়  কৃষিতে ঝুঁকি রয়েছে উল্লেখ করে তারা আরও বলেন আইলা ও সিডরের আঘাত খেয়েও জেলার লবনাক্ত জোনে এখন সবুজ ফসল ফলছে । একই সাথে সুপেয় পানির সংকটও হ্রাস পাচ্ছে।

খাদ্যে উদ্বৃত্ত সাতক্ষীরা জেলার এই প্রেক্ষাপটে কৃষি ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজিয়ে তা আরও জোরদার করা গেলে নিরাপদ খাদ্য লাভ এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব ।