কয়রায় আইলার ক্ষতি ৮ বছরেও কাটিয়ে উঠতে পারেনি উপকূলীয় অঞ্চল !


580 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
কয়রায় আইলার ক্ষতি ৮ বছরেও কাটিয়ে উঠতে পারেনি উপকূলীয় অঞ্চল !
মে ২৪, ২০১৭ খুলনা বিভাগ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

শেখ মনিরুজ্জামান মনু ::
আজ ২৫ মে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলার ৮ বছর। ২০০৯ সালের এই দিনে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে লন্ড ভন্ড হয়ে যায় দক্ষিণ জনপদের উপকূলীয় অঞ্চল। এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকা খুলনার কয়রা।

দেখতে দেখতে আইলার ৮ বছর পার হচ্ছে। কিন্তু এখনও ক্ষতিগ্রস্থ অনেক পরিবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। কয়রার  অনেক পরিবার এখনও সরকারি তহবিলের সহায়তা না পেয়ে বাঁধের ওপর বসবাস করছে। অভিশপ্ত এই দিনটির কথা মনে হলে আজও ভয়ে শিউরে ওঠেন উপকূলবাসী। কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে আজও টিকে আছে এ অঞ্চলের অসহায় মানুষ।

আইলার কারণে কয়রা উপজেলার অনেক এলাকায় দির্ঘ দিন কৃষি জমিতে ফসল ফলাতে পারেনী। তবে দুই বছর হলো কৃষকরা তাদের জমিতে ফসল উৎপাদন করতে পেরেছে। তবে এ জনপদের মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনও ব্যবস্থা না থাকায় অভাব অনটন বেড়েই চলেছে।

শুধু ঘর-বাড়ি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা খাদ্য, সুপেয় পানি আর চিকিৎসা সেবাসহ নানা সমস্যায় এখনও জর্জরিত। পাউবোর আমাদীর উপ-বিভাগীয় শাখার  কর্মকর্তা মোঃ খায়রুল আলম বলেন,সম্প্রতি পাউবোর ৪ টি পয়েন্টের বড়িবাধ সংস্কারের টেন্ডার হয়েছে খুব তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করা হবে।

এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কিছু বাঁধে মাটি দেওয়ার কাজ চলছে।তাছাড়া ভাঙন কবলিত বাঁধে ডাম্পিং ব্লক ফেলা হয়েছে। এছাড়া,ভাঙনের কবলে থাকা বাঁধগুলো মেরামতের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি, উত্তর বেদকাশি, কয়রা সদর ও মহারাজপুর ইউনিয়নের পাউবোর বেড়িবাঁধের ওপর মানুষ এখনও সেই ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন। মাথা গোজার ঠাঁই না পেয়ে কষ্টের মধ্যে বেড়িবাঁধ আকড়ে আছেন তারা। আইলার পর ভেঙে যাওয়া পবনা বাঁধ, হারেজখালি, পদ্মপুকুর, শিকারিবাড়ি, পাথরখালি মেরামত হয়েছে।

কিন্তু কয়রার ক্ষতিগ্রস্ত ৬টি ইউনিয়নের কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর  প্রায় ৬০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধে পর্যাপ্ত মাটি নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় মাটি দেওয়ার উদ্যোগ না নেওয়ায় বাঁধগুলো ঝুঁকির মুখে রয়েছে। দক্ষিণ বেদকাশি

ইউনিয়নের আংটিহারা, খাসিটানা, জোড়শিং, মাটিয়াভাঙ্গা, উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের গাতিরঘেরি, গাববুনিয়া, গাজিপাড়া, কাটকাটা, কয়রা সদর ইউনিয়নের ৬নং কয়রা, ৪নং কয়রার পুরাতন লঞ্চঘাট সংলগ্ন এলাকা, ঘাটাখালি, হরিণখোলা, মহারাজপুর

ইউনিয়নের উত্তর মঠবাড়ি, দশালিয়া, লোকা, মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের কালিবাড়ি, নয়ানি, শেখেরটেক এলাকার বেড়িবাঁধগুলো অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ সকল বাঁধ সংস্কার করা হয়নি। ফলে এসব বাঁধ ভেঙে আবারো গোটা উপজেলা লোনা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইলার জলোচ্ছ্াসে খাবার পানির উৎস নষ্ট হয়ে যায়। গত ৮ বছরেও বিকল্প ব্যবস্থা না হওয়ায় বিশুদ্ধ পানির জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠী দারুন কষ্টে রয়েছেন। তারা ১০/১২ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করছেন।

পরিকল্পনা মাফিক গভীর নলকূপ স্থাপন ও পুকুর সংস্কার করে পিএসএফ স্থাপন করা যায়নি এখনও। আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আজও সংস্কার হয়নি।

প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষকে দুর্যোগকালীন নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র নেই। উপজেলার অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলো এখনও পুরোপুরি সংস্কার সম্ভব হয়নি।


কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ বদিউজ্জামান জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় উপকূলবাসীর আশ্রয়ের জন্য সরকারের তত্ত্ববধানে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রস্তাব পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, উপকূলবর্তী কয়রা উপজেলাবাসীর জন্য  ২ শতাধিক আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ জরুরী। পর্যায় ক্রমে আইলা ক্ষতিগ্রস্ত কয়রার উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। আইলা বিধবস্ত কয়রা এলাকার মানুষের পুনর্বাসনে সরকারিভাবে সহায়তা করা হচ্ছে।

কয়রাকে আইলার পূর্ব অবস্থায় ফিরে যেতে সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করা হবে বলে  জানান তিনি।কয়রা উপজেলা চেয়ারম্যান আ খ ম তমিজ উদ্দীন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কয়রাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে পরিকল্পনা মাফিক বেড়িবাধ নিমার্নের জন্য তিনি জোর দাবি জানিয়েছে।

কপোতাক্ষ কলেজের অধ্যাপক আবম আঃ মালেক বলেন, ৮ বছর কেটে গেলেও এখনও কয়রার দক্ষিন বেদকাশি,উত্তর বেদকাশি,কয়রা সদর ও মহারাজপুর এবং মহারাজপুর ইউনিয়নের অনেক মানুষ বেড়িবাঁধের ওপর বসবাস করছেন।

আইলায় তাদের ঘর-বাড়ি, জমি-জমা সব বিলীন হয়ে গেছে নদীতে। নিজস্ব কোনও জমি না থাকায় তারা সরকারের গৃহনির্মাণ তহবিলের সহায়তা পাননি।

এমনকি আজ পর্যন্ত তাদের কোনও খাস জমিও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। আইলার পর জরুরী ভিত্তিতে যেসব বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল, সেগুলো জোয়ারের চাপ বা ভারী বর্ষণে বাঁধগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাতেও আবার কাজ করা প্রয়োজন।

কয়রার পরিবেশবিদ সানা মিজানুর রহমান বলেন, পৃথিবীর বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। আর দেশের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে দক্ষিণ উপকূলীয় বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী সুন্দরবন কোলঘেষা কয়রা।

কয়রা উপেজলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার রায় বলেন, দুর্যোগ মোকাবেলায় সার্বিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে পাøাবিত হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন উপকূলীয় অঞ্চলের কয়রার প্রায় ৩ লাখ মানুষ।

যে জন্য দুর্যোগে হাইরিক্স জোন হিসেবে কয়রা এলাকায় পর্যাপ্ত সাইক্লোন সেন্টারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি। কয়রা সদর ইউপি চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলাম জানান, কয়রাবাসী প্রাকৃৃতিক দুর্যোগের সময় অসহায় হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হলো গোলখালী, জোড়শিং, আংটিহারা, ৪নং কয়রা, ৬নং কয়রা, গোবরা, ঘাটাখালী, হরিণখোলা, কাটকাটা, নয়ানী, তেতুলতলার চর, পাথরখালী, হরিহরপুর, ঘড়িলাল,লোকা,গীলাবাড়ি ও হড্ডা।

এসব এলাকার মানুষ দুর্যোগকালে শিক্ষা  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে,ঘুর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে, ধর্মীয়  প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় গ্রহন করে থাকেন। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর ধারণ ক্ষমতা অত্যন্ত কম।

তিনি সরকারি  প্রাথমিক ও মাদরাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি করে আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। কয়রা উপজেলা প্রকৌশলী অধিদফতরের প্রকৌশলী নিরাপদ পাল জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আমাদী ইউনিয়ন ছাড়া বাকি ৬টি ইউনিয়নের

কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, কয়রা, মহারাজপুর, মহেশ্বরীপুর, বাগালী ইউনিয়নে যে সাইক্লোন সেন্টার রয়েছে তা যথেষ্ট। কিন্তু দক্ষিণ ও উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নে আরও সাইক্লোন সেন্টারের প্রয়াজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

উপজেলা কৃষি অফিসার এস এম মিজান মাহমুদ জানান, প্রকৃতিক দুর্যোগে ও নদী ভাঙনের কারণে জমির পরিমাণ কমছে। আইলার আগে ৭ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমিতে আমন চাষাবাদ হতো। আইলায় পর তার একটু কম চাষাবাদ হয় বলে তিািন জানান।।

সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কয়রাবাসি আইলার ক্ষত কাটিয়ে উঠতে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতা কামনা করছেন।