কয়রায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তান্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি


437 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
কয়রায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তান্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
নভেম্বর ১২, ২০১৯ খুলনা বিভাগ দুুর্যোগ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

শেখ মনিরুজ্জামান মনু ::

রাস্তায় মাঝে পড়ে আছে সারি সারি গাছ। গৃহহারা মানুষেরা নির্বাক তাকিয়ে আছে বিধ্বস্ত গৃহের দিকে। বিলের ধান গুলো সব লুটিয়ে পড়ে আছে পানিতে। থই থই পানিতে একাকার হয়ে গেছে মৎস ঘের। এই চিত্র ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তান্ডবে লন্ডভন্ড উপকূলীয় উপজেলা কয়রার। ঘুর্ণিঝড়ের কবলে বিদ্যুতের লাইন ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে এলাকার জনসাধারণ। প্রলয়ংকারী এই ঝড়ে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব মানুষগুলো এখন সরকারি সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে আছে। ক্ষতিগ্রস্থদের সবধরণের সহযোগীতার আশ্বাসও দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

বুলবুলের তান্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে কয়রা উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের প্রায় দুই হাজার তিন শত বাড়ি সম্পুর্ন বিধবস্ত হয়েছে,আাংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে চার হাজার আট শত বাড়ি, উপড়ে পড়েছে হাজার হাজার গাছপালা, ভেসে গেছে ছোট বড় এক হাজারের মতো মৎস ঘের ,বিষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে শত শত একর ফসলি জমি এবং স্কুল,কলেজ,মাদরাসা সহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্টানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
জানা গেছে,গত ৮ নভেম্বর শুক্রবারের থেকেই মূলত উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করে। এরপর শনিবার (৯ নভেম্বর) সকাল থেকে থেমে থেমে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত শুরু হয়, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের গতিবেগও বাড়তে থাকে। আবহাওয়া অফিস থেকে ঘোষনা আসে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে দিনভর বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের গতিবেগ বাড়বে।। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ৫ থেকে ৭ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস হতে পারে যে কারণে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি উপকূলীয় উপজেলা কয়রাও ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। এমন ঘোষনা শুনে আতঙ্কিত হয় এই উপজেলার বাসিন্দারা কারণ এই অঞ্চলের নদীর বেড়ীবাঁধ গুলি প্রচন্ড ঝুঁকিপূর্ণ।
সরেজমিনে শনিবার সকালে হরিণখোলা এলাকায় গিয়ে দেখাযায় গ্রামটির বহু মানুষ উৎকন্ঠায় নিয়ে বেড়ীবাঁেেধর রাস্তার উপর দাড়িয়ে আছে । তাঁরা আশঙ্কা করছেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আঘাত হানলে গ্রামের সামনের বেড়িবাঁধটি ভেঙে যাবে। এতে লোনা পানিতে পুরো এলাকা ভেসে যাবে। এসময় দেখাযায় অনেকে দড়ি দিয়ে শক্ত করে ঘর-বাড়ি বেঁধে রাখার চেষ্টা করছেন। অনেকে গরু ছাগল নিয়ে নিরাপদ জায়গায় চলে যাচ্ছেন।
সে সময় হরিণখোলা এলাকার ৬০ উদ্ধ বয়সের বৃদ্ধ আব্দুল হাকিম শেখের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ‘চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি। সত্যি সত্যি যদি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, তবে পুরো এলাকা ভেসে যাবে। এ এলাকায় প্রায় ১২ হাজার মানুষ বসবাস করে।’

হরিণখোলা এলাকাটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৩-১৪ / ২ পোল্ডারের আওতায়। ১০ বছর আগে ঘূর্ণিঝড় আইলায় এখানে ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছিল। সে স্মৃতি এখনো মানুষের মনে গেঁথে আছে। তাই ঘূণিঝড়ের নাম শুনলেই প্রতিতটি মানুষ আতঙ্কিত হয়।
শনিবার বিকেল থেকেই আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে যাওয়া শুরু করে মানুষ যা শ্রতের আকার ধারণ করে সন্ধা হবার সাথে সাথে। একটু রাত বাড়তেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় আশ্রয় কেন্দ্রগুলো। গবাদি পশু আর মানুষের ঠাশাঠাশি অবস্থান যেন ভয়ঙ্কর কিছুর পূর্বাভাষ দিচ্ছিল।
রাত সাড়ে তিনটা থেকেই শুরু হয় বুলবুলের তান্ডব লিলা, টানা ৪ ঘন্টা চলার পর শেষ হয় সকাল সাড়ে সাতটার দিকে। এতেই পাল্টে গেছে কয়রা উপজেলার চেহারা। সকালে বাতাসের গতি একটু কমে আসলে দেখাযায় মহারাজপুর ইউনিয়নের মঠবাড়ি এলাকার আজিজুল শেখের ঘরের টিনের চাল উড়ে গিয়ে পড়ে আছে প্রায় ২০০ ফুট দূরে। রান্না ঘরের টিনের চাল উড়ে গিয়ে আটকে আছে দূরের একটি গাছের ডালে। বুলবুলের তান্ডবে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের একটি বিদ্যুতের খুঁটি তার সহ উপড়ে পড়ে আছে।।
কয়রা সদর ইউনিয়নের গোবরা গ্রামের আঃ জলিল জানান, পরিবার নিয়ে রাতে ছিলেন নিকটস্থ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয় কেন্দ্রে। সকালে ঝড় থেমে গেলে বাড়ি ফিরে দেখেন বসত ঘরের পাশের সিরিস গাছটির নিচে চাপা পড়ে আছে ঘরের চাল ও দেয়ালের একাংশ। গাছটি কেটে আবার পুনরায় ঘর তৈরী করতে হবে তিনি।
এদিকে ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থদের সব ধরণের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ।
ক্ষয়ক্ষতি খতিয়ে দেখতে পথে নেমেছিলেন কয়রা উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব এস এম শফিকুল ইসলাম। কয়রা সদরের তিন রাস্তার মোড়ে ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থদের সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি। তিনি বলেন,কয়রা উপজেলার সাত টি ইউনিয়নে মানুষের ঘর বাড়ি,গাছ পালা,মৎস্য ঘের,শিক্ষাপ্রতিষ্টান,ফসলি জমি,ধর্মীয় প্রতিষ্টান ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সর্বাথক সহযোগিতা করা হবে বলে তিনি জানান।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিমুল কুমার সাহা বলেন, সকাল থেকে উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিসসহ স্থানীয় ভলেন্টিয়ারদের সমন্বয়ে রাস্তা থেকে গাছ অপসারনের কাজ করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থদের পুনঃবাসনের কাজ অব্যহত রয়েছে। তবে ভয়াবহ এ ঝড়ের কবলে পড়া জনসাধারণের পাশে দ্রুত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে সরকার, এমনটাই প্রত্যাশা কয়রাবাসীর।

#