খবরে ‘ঝাল’ পছন্দ করেন সাকিব


122 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
খবরে ‘ঝাল’ পছন্দ করেন সাকিব
জুন ১৩, ২০২১ খেলা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

স্ট্রেইট ড্রাইভ

সঞ্জয় সাহা পিয়াল ::

খাবারে খুব বেশি ঝাল পছন্দ করেন কি তিনি? কখনও শোনা হয়নি। তবে খবরে যে তিনি প্রচণ্ড ঝাল পছন্দ করেন, সেটা নিজ মুখেই বলেছেন। কলম্বোয় নিদাহাস ট্রফিতে লঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে উত্তেজিত হয়ে মাঠের বাইরে থেকে দলকে বেরিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেদিন ড্রেসিংরুমের কাচও ভেঙেছিলেন। সাকিবের অমন আচরণের পর ভারত ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে হাসিচ্ছলে বলেছিলেন- ‘ক্রিকেট মাঠেও স্পাইস দরকার, খবর স্পাইসি না হলে আপনারা কী লিখবেন?’ সেদিন তার ওই বক্তব্য শুনে পাশে বসা এক ভারতীয় সাংবাদিকের কৌতূহলী প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারিনি- ‘সাকিব কি সত্যিই ইচ্ছা করে এসব করেন, এটাও কি তার খেলারই কৌশল…।’ শুক্রবার মিরপুর শেরেবাংলায় যে বিতর্কে তিনি জড়িয়েছেন, সেটিও কি ‘ইচ্ছা করে’?

আমাদের এখন কোনো ঘটনার পক্ষ-বিপক্ষে জনমত মাপার একটা সহজ ট্রেন্ড হচ্ছে ‘পপ (পপুলার) কালচার’ যাচাই করে নেওয়া। সেখানে ফেসবুকের দেয়ালে কিন্তু ওই ঘটনার পর ঘরোয়া ক্রিকেটে পক্ষপাতিত্ব আম্পায়ারিংয়ের বিপক্ষে সাকিবের প্রতিবাদী একটি রূপ ভেসে উঠেছে। তার সঙ্গে সাকিব-পত্নীর আমেরিকা থেকে ফেসবুকের স্ট্যাটাসে ‘ষড়যন্ত্র’-তত্ত্ব চিত্রনাট্যে ছাইয়ে আগুন ঢেলেছে! আবারও সেই ‘বিসিবি বনাম সাকিব’ মচমচে তেলেভাজায় বুঁদ হয়ে আছে ফেসবুকীয় জনতা। ব্যাপারটি আসলেই কি এত সরল। ওই ঘটনার পরপরই ম্যাচ শেষে সাকিব আবাহনীর ড্রেসিংরুমে গিয়েছেন, মুশফিকের সঙ্গে হাত মেলানোর চেষ্টা করেছেন, নিজের ভুল স্বীকার করে ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছেন। বিসিবিতে এমন একটা কথা চালু আছে যে, সাকিব যতবারই ঝামেলায় জড়িয়েছেন ক্যামেরার সামনে আর ক্যামেরার পেছনে ততবারই ‘সরি’ বলেছেন। তা কখনও বিসিবি সাবেক সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে, কখনও বা বর্তমান সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের কাছে, কখনও বা বিসিবির কোনো পরিচালকের কাছে এবং প্রতিবারই বলেছেন- ‘এসব কিছু না, আমরা আমরাই তো…।’ সাকিবের এই ‘আমরা আমরাই তো’ খেলার সঙ্গে বিসিবি পরিচালক থেকে শুরু করে অনেক সাবেক খেলোয়াড়ই পরিচিতি।

সবাই এটাও জানেন যে, ‘বড় ক্রিকেটার’ হওয়ায় সাকিব যতই দোষ করুক না কেন সে অনুযায়ী তার শাস্তি হবে না। কিছুদিন আগেই যেমন মিরপুরে বায়ো-বাবলের মধ্যে থেকেও বাইরে থেকে নেট বোলার আনিয়েছেন, সমর্থকের সঙ্গে সেলফি তুলেছেন। ওই ঘটনার তদন্ত করেও কোনো শাস্তি তাকে দেয়নি বিসিবি। তবে এবার বোধহয় শাস্তিটা তার প্রয়োজনই ছিল। হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। এ মাসের ১৫ তারিখ তার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা পরিবারের কাছে। এ কথা তিনি ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ক্রিকেটারের কাছে আগেই বলে রেখেছিলেন। যেটা তার ক্লাব মোহামেডানকেও জানাননি। লিগের পুরোটা খেলে জিম্বাবুয়ে সফরে যেতে হলে তার আমেরিকা যাওয়া হবে না। সেই আইপিএল থেকে ডিপিএল- বিরতিহীনভাবে ক্রিকেট খেলতে খেলতে মানসিকভাবেও অনেকটা ক্লান্ত। বিরতিটা তার সত্যিই দরকার। ম্যাচ রেফারির রিপোর্টের পর সিসিডিএম থেকে ৫ লাখ টাকা জরিমানাসহ তিন ম্যাচ নিষিদ্ধ করা হয়েছে সাকিবকে। এখন তার আমেরিকা যেতে বাধা নেই। বিশেষ দ্রষ্টব্য :সেপ্টেম্বরে আইপিএল খেলার জন্যও তার ছুটি দরকার। সেপ্টেম্বরের আগে আগে আরও একটি- ‘বিসিবি বনাম সাকিব’ হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

ঢাকা লিগে আম্পায়ারিং যে শতভাগ স্বচ্ছ, তা কেউ বলতে পারবে না। প্রভাবশালী বড় ক্লাবগুলোর প্রতি আম্পায়ারদের সুদৃষ্টি দেওয়ার অভিযোগও বেশ পুরোনো। এমনও দেখা গেছে, সাবেক কোনো মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ এখন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের দায়িত্ব পালন করছেন। এসবই যেমন সত্যি, তেমনি এটাও সত্যি যে, সাকিব তার ক্যারিয়ারজুড়ে এসব বড় ক্লাবের হয়েই খেলে এসেছেন। কখনও খেলাঘর সমাজ কল্যাণের মতো ক্লাব তাকে দলে ভেড়ানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য দেখাতে পারেনি। এর আগে কখনও তো সাকিবকে এতটা তথাকথিত প্রতিবাদী হতে দেখা যায়নি। তাহলে এবার এমন কী হলো? এবার সাকিব যে মোহামেডানে খেলছেন সেই ক্লাবেরই সদস্য তিনি, তার মতো বিসিবিপ্রধান নাজমুল হাসান পাপনও মোহামেডান ক্লাবের সদস্য। কিছুদিন আগে সাকিব নিজেও এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন- বিসিবিতে পাপন ভাই আর সুজন ভাই (খালেদ মাহমুদ সুজন) ছাড়া কেউ কাজ করে না। তাহলে সেই সুজন ভাইয়ের সঙ্গেই কেন এবার সাকিবের দ্বন্দ্ব লাগল? তাহলে কি এবারও সেই ‘আমরা আমরাই তো..’। মাঝখানে ফেসবুকের এক প্রবল জনগোষ্ঠী দুটি পক্ষ দাঁড় করিয়ে ‘কর্তৃপক্ষেরই সব দোষ’ জাতীয় ভার্চুয়াল আন্দোলন শুরু করেছেন!
বিশ্বকাপের পর পর সাকিব যখন বিসিবির বিপক্ষে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তার পরই জানা গেল যে, জুয়াড়ির সঙ্গে যোগাযোগের বিষয় গোপন করেছিলেন তিনি। তার আগেও ‘বিসিবি বনাম সাকিব’ একটা হাওয়া উঠেছিল। সেই আন্দোলনের ফসল কিন্তু সাধারণ ক্রিকেটাররা পাননি। বরং সাধারণ ক্রিকেটারদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সাকিব নিজেকে কুইট করে নিয়েছিলেন। তাই প্রতিবাদ ও আন্দোলন যাই বলা হোক না কেন, তার সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থই যে বেশি জড়িত, সেটা সদ্য অতীতে প্রমাণ হয়েছে। বিশ্বকাপের পর মাঠের পারফরম্যান্স বলতে বলার মতো কিছু নেই সাকিবের। আইপিএল, ডিপিএল এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচ মিলিয়ে টানা এগারো ম্যাচে চল্লিশের ওপরও কোনো রান নেই। এই পারফরম্যান্স তারকা ক্রিকেটারদের কারও না হয়ে অন্য কারও হতো- ভাবা যায় কী হতো? সাকিব খুব ভালোভাবেই জানেন, পারফরম্যান্সের কারণে দল থেকে বাদ যাওয়ার প্রশ্ন নেই তার। তার প্রবল ফেসবুকীয় ভক্তকুল, সেখানেও স্ট্যাটাস আর ভিডিও বার্তায় নায়ক হওয়া যান। এর বাইরে ক্যামেরার পেছনে আছেন যারা, তাদের সঙ্গে ‘আমরা আমরাই তো…’ সম্পর্কতেই সব কিছু ঠান্ডা। কোটি কোটি টাকার স্পন্সর মাথায় নিয়ে খবরের শিরোনামে থাকতে হয়, সেটা যখন মাঠের পারফরম্যান্সের দ্বারা সম্ভব না হয়ে ওঠে, তখন খবরে সত্যিই ‘ঝাল’টা দরকার হয়।