খালেদা জিয়া জেলে ‘রাজার হালে’ আছেন : প্রধানমন্ত্রী


152 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
খালেদা জিয়া জেলে ‘রাজার হালে’ আছেন : প্রধানমন্ত্রী
ডিসেম্বর ৪, ২০১৯ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

বিএনপি-জামায়াত জোটের কঠোর সমালোচনা করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদাকে ‘সন্ত্রাসের গডমাদার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, এরপরও বলব খালেদা জিয়া যে জেলে আছেন, সেখানে অনেক ভালো আছেন। রাজার হালে আছেন।

বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সভার সূচনা বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এই সন্ত্রাসের গডমাদার হচ্ছেন খালেদা জিয়া। যিনি সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে মানুষ খুন করেন, ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করতে পারেন- তার চেয়ে বড় সন্ত্রাসী আর কে হতে পারে?

তিনি বলেন, আর যেন কোনো সুদখোর, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, জঙ্গীবাদী, অগ্নিসন্ত্রাসী, মানুষ পুড়িয়ে হত্যাকারী ও এতিমের টাকা আত্মসাতকারী দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসতে না পারে, দেশকে ধ্বংসের দিকে নিতে না পারে- দেশবাসীর প্রতি সেই আহ্বানই থাকবে।

দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, এতিমের টাকা আত্মসাৎ করে যিনি কারাগারে গেছেন, তার এত মায়াকান্না কেন? খালেদা জিয়া মানুষকে অত্যাচার-নির্যাতন করেছেন, পুড়িয়ে হত্যা করেছেন- সেটা তো সত্য।

তিনি বলেন, এই দরদ যারা দেখান, তারা খালেদা জিয়া ও বিএনপি-জামায়াত জোটের হাতে অগ্নিদগ্ধ মানুষগুলোর কষ্টের চেহারা দেখে আসা উচিত! এরপরও বলবো খালেদা জিয়া যে জেলে আছেন, সেখানে অনেক ভালো আছেন। রাজার হালে আছেন।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, বুকের রক্ত দিয়ে আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছি। আমরা বিজয়ী জাতি। বিজয়ী জাতি হিসেবেই আমরা মাথা উঁচু করে থাকব। কারো কাছে মাথানত করবো না। বাংলাদেশে এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। এই উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাকে ধরে রাখতে হবে।

জিয়া পরিবারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান খুনি, তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও খুনি। আর তার ছেলে আরেকটা খুনি। এরা খুনির পরিবার। সন্ত্রাস-দুর্নীতি আর মানুষ খুন করা ছাড়া এরা আর কিছুই বোঝে না।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে বিএনপি অনেক কথাই বলে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, ২০০৮ এর নির্বাচনে তারা মাত্র ২৯টি সিট পেয়েছিল। আর এবারের নির্বাচনে তারা জিততে পারবে না জেনেই মনোনয়ন বাণিজ্য করেছে।

তিনি বলেন, একটি আসনের জন্য তিনজন করে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আর এই মনোনয়নের জন্য প্রার্থীদের তিন জায়গায় টাকার ভাগ দিতে হয়েছে। এক ভাগ দিতে হয়েছে লন্ডনে আর দুই ভাগ দিতে হয়েছে বাংলাদেশে। একজনকে লন্ডন ছাড়াও গুলশান আর নয়াপল্টন অফিসে ভাগ দিতে হয়েছে। যিনি দিতে পারেননি- তিনি মনোনয়ন পাননি। এমনও হয়েছে একজনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, পরে আরেকজন বেশি টাকা দেওয়ায় তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশি ও আন্তর্জাতিকভাবে করা জরিপগুলোতে বিএনপি দেখেছে, তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না। তাই তারা নির্বাচনকে বাণিজ্য হিসেবে নেয়। তারপরও তাদের যে সাতজন নির্বাচিত হয়েছেন, তারা সংসদেও গেছেন। এজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই।

পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং পরবর্তী সামরিক স্বৈরশাসকদের দুঃশাসন ও অত্যাচার-নির্যাতনের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি শক্তি এদেশের স্বাধীনতাকে মেনে নেয়নি। তাই স্বাধীনতার পর দেশটা যখন এগিয়ে যাচ্ছিল- তখনই ১৫ আগষ্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড চালানো হলো। ১৫ আগষ্টের হত্যাকাণ্ডে যে জিয়াউর রহমান একেবারেই জড়িত- সেটা তো খুনি ফারুক-রশিদের স্বীকারোক্তিতেই স্পষ্ট।

তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের আমলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ওপর এত অত্যাচার- নির্যাতন হয়েছে। হাজার হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। তারপরও তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই আওয়ামী লীগকে ধরে রেখেছেন। তারা সব সময় সঠিক সিদ্ধান্তই নেন।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের বিবরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান যেভাবে অত্যাচার-নির্যাতন করেছেন, একই কাজ খালেদা জিয়াও করেছেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যেভাবে গণহত্যা চালিয়েছে, খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে ঠিক একইভাবে মানুষকে হত্যা করেছেন। অত্যাচার-নির্যাতন করেছেন। অপারেশন ক্লিনহাটের নামে মানুষকে অত্যাচার-নির্যাতন করে হত্যা করেছেন, আবার তার যাতে বিচার না হয় সেজন্য সংসদে দায়মুক্তির আইনও পাস করিয়েছেন। অর্থাৎ খালেদা জিয়া হত্যার রাজনীতিকে বৈধতা দিয়েছেন।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা ও সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তার কারাগারে যাওয়ার প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এতিমের টাকা আত্মসাৎ করে জেলে গেছেন। এই মামলা তো করেছিল তার পছন্দের তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এখানে আওয়ামী লীগ কী করেছে? আওয়ামী লীগ তো এই মামলা করেনি। বরং খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকতেই আমার বিরুদ্ধে ১২টা মামলা দিয়েছিলেন। একটা মামলায়ও দুর্নীতির কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি।

তিনি বলেন, হরতাল-অবরোধ দিয়ে খালেদা জিয়া মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। সেই অবরোধ-হরতাল এখনও তোলেননি। তার হুকুমে কত মায়ের কোল খালি হয়েছে, কত বোন বিধবা হয়েছে! তার জন্য আবার কারও কারও মায়াকান্নাও দেখি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া তো জেলে আছেন, এখন জেল থেকে হাসপাতালে। তিনি তো রাজার হালেই আছেন। জেলে তার জন্য মেইড সার্ভেন্টও দেওয়া হয়েছে। কোথাও কিন্তু এটি নেই যে, একজন জেল খাটছেন আর তার দেখাশোনার জন্য আরেকজন কাজের লোক রয়েছেন- বিনা অপরাধে যে নিজেও জেল খাটছে। পৃথিবীর কোনো দেশে এই দৃষ্টান্ত দেখাতে পারবে না জেলে সাজাপ্রাপ্ত আসামির সেবার জন্য কোনো কাজের বুয়া যায়। তারপরও খালেদা জিয়াকে এই সুবিধাটা দেওয়া হয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো প্রতিহিংসার মনোভাব নেই।

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়ার এই অসুস্থতা তো পুরনো। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পরই আমেরিকায় তার হাঁটু রিপ্লেস করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সৌদি আরবেও তার হাঁটুর অপারেশন হয়েছিল। আর বিদেশে যাওয়ার পরে খালেদা জিয়া যখন শপিং করেন, তখনও হুইল চেয়ারে শপিং করতেন। ফালু হুইল চেয়ার ঠেলতেন, আর তিনি গিয়ে শপিং করতেন। তিনি যখন হজ করেন, সেখানেও ফালু হুইল চেয়ার ঠেলতেন। তার হুইল চেয়ারে বসা, সেটা নতুন কিছু হয়। এটা তো বহু যুগ ধরেই দেখে আসছি।

তিনি বলেন, আর খালেদা জিয়ার এই জেলে থাকা আর অসুস্থতার কথা বলেই কিছু লোকের এত হাহাকার কেন? এত দরদ, এত মায়াকান্না কেন? এতিমের টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলেই তো তিনি জেলে গেছেন। আল্লাহ তায়ালাই তো বলে দিয়েছেন, এতিমের টাকা আত্মসাৎ করলে তিনিই তার ব্যবস্থা নেবেন।

সরকারের সমালোচনা করে এক শ্রেণির সুশীল সমাজ ও বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারই এতগুলো টিভি চ্যানেলের অনুমোদন দিয়েছে। খালেদা জিয়া তো দেননি। আর সেই টিভি চ্যানেলের টকশোগুলোতে টক ঝাল কত কথাই তারা বলে যাচ্ছেন! এত কথা বলার পরও আবার বলছেন, এই সরকারের আমলে কথা বলার পরিবেশ নেই। সেটি বড় কথা নয়। আওয়ামী লীগ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে নেবে।

টানা ১০ বছরে দেশ ও জাতির কল্যাণে তার সরকারের পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের সরকার। আওয়ামী লীগ জনগণের জন্য কাজ করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসা মানেই মানুষের উন্নয়ন, দেশের উন্নয়ন। বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তখনই দেশকে ধ্বংস করেছে, বিশ্বে দেশের সম্মান নষ্ট করেছে, মর্যাদা ধূলিস্মাৎ করেছে। আওয়ামী লীগ আজ সেই পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে চলছে, মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। সেজন্য সরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ কোথায় যাবে- সেই পরিকল্পনাও আগে থেকেই করা হয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধ হবে। ২১০০ সালের মধ্যে প্রতিটি মানুষকে উন্নত ও সমৃদ্ধ জীবন দিতে শতবর্ষের ডেল্টা প্লান করা হয়েছে। এদেশ জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সূচনা বক্তব্যের পর তার সভাপতিত্বে জাতীয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দলের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পরিচালনায় সভায় শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ।

রুদ্বদ্বার বৈঠকে দলের বার্ষিক আয়-ব্যয় ও আগামী বাজেট অনুমোদন ছাড়াও আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় দলের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।