খুলনায় শিশু রাকিব হত্যা মামলার রায়ে শরীফ ও মিন্টুর মৃত্যুদন্ড : একজন খালাস


268 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
খুলনায় শিশু রাকিব হত্যা মামলার রায়ে শরীফ ও মিন্টুর মৃত্যুদন্ড : একজন খালাস
নভেম্বর ৮, ২০১৫ খুলনা বিভাগ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

খুলনা প্রতিনিধি :
খুলনার আলোচিত শিশু রাকিব হত্যা মামলার রায়ে মো. শরীফ এবং তার সহযোগী মো. মিন্টু খানকে মৃত্যুদ-াদেশ দেয়া হয়েছে।  রোববার দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিটে খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক (ভারপ্রাপ্ত) দিলরুবা সুলতানা আলোচিত এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ফাঁসির আদেশ প্রাপ্ত আসামি শরীফের মা বিউটি বেগমকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়।
এদিকে, রায়ে সন্তোষ ও উল্লাশ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্র ও বাদি পক্ষের আইনজীবীরা। তারা বলেছেন, এ রায় নতুন কোন অপরাধ সংগঠন না হওয়ার  ক্ষেত্রে উজ্জল দৃস্টান্ত বহন করবে। অপরদিকে, আসামি পক্ষের আইনজীবীরা এ রায়কে আবেগতাড়িত বলে মন্তব্য করে রায়ের পর উচ্চ আদালতে যাবেন বলে জানিয়েছেন।
জনাকীর্ণ আদালতে দেয়া রায়ে বিচারক দিলরুবা সুলতানা উল্লেখ করেন, ৩০২ ধারা অনুযায়ী আসামি শরীফ ও মিন্টু খানের বিরুদ্ধে সন্দেহাতীত ভাবে অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় তাদের মৃত্যুদ-ের আদেশ দেয়া হলো। অন্যদিকে শরীফের মা বিউটি বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমানিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস দেয়া হলো। একই সঙ্গে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আসামিদের আগামী সাত দিনের মধ্যে উচ্চ আদালতে আপীল করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। আদালত দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন। এর মাত্র তিন মিনিট পর ১২টা ৪৮ মিনিটে তিনি রায় ঘোষণা শেষ করেন।
রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামি শরীফ ও মিন্টু খানের মাথা নিচু হয়ে যায়। তাদের মুখমন্ডলও কালো হয়ে যায়। তবে তাদের কান্নাকাটি করতে দেখা যায়নি। অপরদিকে, শরীফের মা নিজে খালাস পেলেও ছেলের মৃত্যুদ-ের আদেশের কারণে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এদিকে, রায় শোনার সঙ্গে সঙ্গে আদালতের বাইরে থাকা বাদিপক্ষ ও উৎসুক জনতা উল্লাসে ফেঁটে পড়েন। বিশেষ করে নিহত রাকিবের বাবা-মা ও বোনসহ আত্মীয়-স্বজনরা আসামিদের দ্রুত ফাঁসির দাবি জানিয়ে আদালতের সামনের সড়কে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
রাকিবের বাবা-মা ও বোনের প্রতিক্রিয়া :
রাকিবের বাবা মো. নূরুল আলম এ প্রতিবেদককে জানান, শরীফের মা বিউটি বেগম খালাস পাওয়ায় তারা খুশি হতে পারেন নি। তিনি বলেন, ‘হত্যাকারীদের দ্রুত ফাঁসি হলে রাকিবের আত্মা শান্তি পাবে, আর যেন কোন রাকিবের জীবন এভাবে ঝরে না যায়, এ হত্যার বিচারের শাস্তি দেখে আর কেউ যেন এ ধরণের অপরাধ ঘটানোর সাহস না পায়’। তার মা লাকি বেগম বলেন, এ হত্যার বিচারের শাস্তি দেখে আর কেউ যেন এ ধরণের অপরাধ ঘটানোর সাহস না পায়- সেজন্য তিনি আসামিদের দ্রুত ফাঁসির দাবি জানান। তবে রাকিবের স্বজনরা বিউটি বেগমেরও শাস্তির দাবি করেছেন। রাকিবের একমাত্র ছোট বোন রিমি আক্তার পারভীন বলেন, তার ভাইকে যেভাবে ছটফট করে হত্যা করা হয়েছে- খুনীদেরও যেন সেভাবে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে মারা হয়।
রায়ে  রাষ্ট্র ও বাদি পক্ষের সন্তোষ প্রকাশ :
রাকিব হত্যা মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্র ও বাদি পক্ষের আইনজীবীরা। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পিপি কাজী আবু শাহিন বলেন, খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যে চাঞ্চল্যকর এ মামলায় রায় ঘোষণা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। আসামিদের উপযুক্ত শাস্তি হয়েছে। এ রায় নতুন কোন অপরাধ সংগঠন না হওয়ার  ক্ষেত্রে উজ্জল দৃস্টান্ত বহন করবে। অপরদিকে, আসামি পক্ষের আইনজীবী তৌহিদুর রহমান চৌধুরী তুষার এ রায়কে আবেগতাড়িত বলে মন্তব্য করে বলেন, স্বাক্ষ্য প্রমান অনুযায়ী সকল আসামির খালাস পাওয়ার কথা। কিন্তু আদালত সে অনুযায়ী রায় দেন নি। ন্যায় বিচারের জন্য আইনী প্রক্রিয়ায় আসামি পক্ষ উচ্চ আদালতে যাবে।
মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার প্রতিক্রিয়া :
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা, খুলনা ইউনিটের সমন্বয়কারী এ্যাড. মোমিনুল ইসলাম জানান, চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি মাত্র ৩ মাস ৫ দিন অর্থ্যাৎ ৯৭ দিনে রায় ঘোষণা হয়েছে। তবে আদালতের বিচারিক কার্যদিবস ছিল মাত্র ১১টি। এত স্বল্প সময়ের মামলার রায় ঘোষণা বাংলাদেশের ইতিহাসে নেই।
ফ্লাস ব্যাক :
গত ৩ আগস্ট সন্ধ্যায় নগরীর টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের শরীফ মোটর্স’র মালিক ওমর শরীফ ও তার সহযোগী কথিত চাচা মিন্টু খান মোটর সাইকেল গ্যারেজের ভেতর নিয়ে শিশু রাকিবের পায়ুপথে মোটরসাইকেলের চাকায় হাওয়া দেয়ার মেশিন দিয়ে বাতাস ঢুকিয়ে দেয়। এতে রাকিবের নাড়ি ভুড়ে ছিড়ে গিয়ে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাত পৌঁনে ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় রাকিবের বাবা আলম হাওলাদার তিনজনকে আসামী করে পরদিন খুলনা সদর থানায় ঘাতক শরীফ মটরস’র মালিক মো. শরীফ ও সহযোগী মো. মিন্টু খান ও শরীফের মা বিউটি বেগমের নামে হত্যা মামলা দায়ের করেন। রাকিবের মৃত্যুর খবর পেয়ে ওইদিন রাতে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিক্ষুব্ধ জনতা শরীফ ও মিন্টুকে গণপিটুনী দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ ও পরে পুলিশ শরীফের মাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার হওয়া তিন জনই হত্যায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বলে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। এছাড়া প্রত্যক্ষদর্শী তিন সাক্ষীও একই ধারায় আদালতে জবানবন্দি প্রদান করেন।
আদালতের সূত্র জানান, গত ২৫ আগস্ট আলোচিত এ হত্যা মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা ও খুলনা সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) কাজী মোস্তাক আহম্মেদ মুখ্য মহানগর হাকিম মেজবাহ উদ্দিন আহমদের আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। এতে এজাহারভুক্ত তিন আসামি নগরীর টুটপাড়া কবরখানা মোড়ের শরীফ মোটর্সের মালিক ওমর শরীফ, তার সহযোগী কথিত চাচা মিন্টু খান ও শরীফের মা বিউটি বেগমকে অভিযুক্ত করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী তিনজনসহ চার্জশিটে মোট ৪০ জনকে সাক্ষী করা হয়। গত ৬ সেপ্টেম্বর মুখ্য মহানগর হাকিম মো. ফারুক ইকবালের আদালত এ চার্জশিট গ্রহণ করেন। একই দিন আদালত মামলাটি মহানগর দায়রা জজ আদালতে প্রেরণ করেন। গত ১ অক্টোবর মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ দিলরুবা সুলতানা মামলার নির্ধারিত দিনে চার্জশিট আমলে নেন। গত ৫ অক্টোবর অভিযোগ গঠন (চার্জ) পূর্বক আদালত সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেন। চার্জশিটভুক্ত ৪০ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩৮ জন আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন। আদালত গত ১১ অক্টোবর থেকে ১৫ অক্টোবর টানা পাঁচদিন ও গত ২২ অক্টোবর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। ২৮ অক্টোবর আসামিদের ৩৪২ ধারায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়। ১ নভেম্বর উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত ৮ নভেম্বর মামলার রায়ের দিন ঘোষণা করেন।
পৈশাচিক এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় খুলনাসহ সারাদেশের মানুষ ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ক্ষোভে ফুঁসে উঠে। বিচারের দাবিতে শিশু সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন পিপি কাজী আবু শাহিন, অতিরিক্ত পিপি সুলতানা রহমান শিল্পী, বাদিপক্ষের আনজীবী এ্যাড. মোমিনুল ইসলাম এবং আসামি পক্ষে তৌহিদুর রহমান চৌধূরী তুষার। #